দেশের বড় উৎসব ঈদ। স্বাভাবিক সময়ে ঈদকে ঘিরে বেচাকেনা বাড়ে। মানুষ গ্রামে যায়। অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। গত বছর করোনার কারণে ঈদের বাজারে মন্দা গেছে। এবারও একই অবস্থা। কারণ, করোনার সংক্রমণ বেড়ে গেছে। তবে গতবারের তুলনায় এবার ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা ভালো। যদিও তা অন্য স্বাভাবিক সময়ের ঈদ উৎসবের তুলনায় কিছুই নয়।
ঈদ ও রমজানে বাড়তি লেনদেন হয়। প্রচুর মানুষ গ্রামে যান। পরিবহন খাতে আয় বাড়ে। গ্রামের মানুষের আয় বাড়ে। কিন্তু গত বছর থেকে এই লেনদেনে ভাটা পড়েছে। বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের হিসাবে, সারাদেশে দোকানগুলোতে বছরের স্বাভাবিক সময় প্রতিদিন তিন হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হলেও রোজার মাসে তা তিনগুণ বেড়ে হয় ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯ সালের হিসাবে রোজার এক মাসে ঈদের পোশাক থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য এবং বিলাসবহুল গাড়ি, ফ্ল্যাট ও আসবাব, গহনা, প্রসাধনী ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীসহ নানা পণ্যের বিক্রি হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার। কিন্তু এবার বেশিরভাগ সময় দোকান বন্ধ ছিল। শেষ সময়ে এসব দোকান খুললেও এবার ঈদকে ঘিরে সব মিলিয়ে চার ভাগের এক ভাগ লেনদেন হতে পারে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে ৫৩ লাখ ৭২ হাজার ৭০০-এর বেশি ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অন্যান্য ঈদে ২০ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এবার করোনার কারণে শুরুতে বন্ধ ছিল। ঈদের আগে শেষ ১০ থেকে ১২ দিন বেচাকেনা হয়েছে। এতে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, এবার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ঈদের বাজারে লেনদেন হয়নি। এই ঈদে অন্য বছরের তুলনায় চার ভাগের এক ভাগ বেচাকেনা হয়েছে। তিনি বলেন, করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। তারা ঈদবাজারেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি।
ঈদে অন্য অনেক পণ্যের বিক্রি বাড়লেও শীর্ষে থাকে পোশাক। এবারও দোকান ও অনলাইনে পোশাকের বেচাকেনা হয়েছে। অনলাইনে বিক্রি বেড়েছে। তবে সব মিলিয়ে এবার বিক্রি অনেক কম। পুরান ঢাকার ইসলামপুর দেশের বৃহত্তম কাপড়ের বাজার। ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির নিবন্ধিত ছোট-বড় দোকানের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। এর বাইরে আছে আরও দুই হাজার ছোট-মাঝারি দোকান। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ে ইসলামপুরে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার কাপড়ের ব্যবসা হয়। অন্যান্য ঈদে এই লেনদেন শতকোটি টাকায়ও হয়েছে। তবে এবার বিক্রি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হতে পারে। দেশে পাইকারি কাপড়ের আরেক বড় বাজার নরসিংদীর বাবুরহাট, গাউছিয়া, কেরানীগঞ্জের পাইকারি দোকানগুলোতে অন্য ঈদের চেয়ে বেচাকেনা অনেক কম বলে জানান সেখানকার ব্যবসায়ীরা।
সারাদেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো ফ্যাশন হাউস ও বুটিক শপ আছে। এবার ঈদে তাদের আগের চেয়ে বিক্রি কম হচ্ছে। অন্য বছরে ঈদবাজারে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার ব্র্যান্ডের পোশাক বিক্রি হয়েছে। এবার এই বিক্রির পরিমাণ ২ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার হতে পারে। বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির সভাপতি শাহীন আহম্মেদ সমকালকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে রোজার প্রথম ১৫ দিনে ৪০ শতাংশ বিক্রি হয়। শেষ ১৫ দিনে ৬০ শতাংশ বিক্রি হয়। এবার প্রথম ১৫ দিন বিক্রি হয়নি। অন্য বছরের ঈদ উৎসবের চেয়ে এবার অর্ধেকের কম বেচাকেনা হয়েছে।
রোজার আগে অর্থনীতি সচল থাকে ভোগপণ্যকেন্দ্রিক। এ মাসে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল, খেজুর, সেমাই, পেঁয়াজ ও নানা মসলাপণ্যের চাহিদা বাড়ে। রোজা ও ঈদের বাড়তি চাহিদার জন্য পণ্য আমদানি কার্যক্রম অনেক আগেই শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। ঈদে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা খুব একটা কমেনি।
ঈদ আপ্যায়নের অন্যতম অনুষঙ্গ সেমাই। সেমাইয়ের ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদুল ফিতরে দেশে আনুমানিক ৭০ লাখ কেজি সেমাইয়ের চাহিদা থাকে। বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সেমাইয়ের ২০০ গ্রামের প্যাকেট ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সেমাই এবার ৮০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। এ হিসাবে চাহিদা এবার না কমলে ঈদে সেমাই বেচাকেনা শতকোটি টাকা হতে পারে।
দেশে প্রতি বছর আনুমানিক ২০ কোটি জোড়া পাদুকা বিক্রি হয়। পাদুকার স্থানীয় বাজার বছরে আনুমানিক চার হাজার কোটি টাকার। সারা বছর যত পাদুকা বিক্রি হয় তার ৩০ শতাংশ বিক্রি হয় ঈদুল ফিতরে। সে হিসাবে আনুমানিক ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার পাদুকা বিক্রি হয় ঈদে। এবার বিক্রি ৩০ শতাংশ হতে পারে বলে জানান পাদুকা প্রস্তুতকারকরা।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) হিসাবে, সারাদেশে ১০ হাজার জুয়েলারি দোকান আছে। ঈদবাজারে স্বাভাবিক সময়ে স্বর্ণ-ডায়মন্ডের পাঁচ হাজার কোটি টাকা বেচাকেনা হয়। এবার বিক্রি খুবই কম। বাজুসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন সমকালকে বলেন, রোজার ঈদের পর কোরবানির ঈদ পর্যন্ত অনেক বিয়েশাদির অনুষ্ঠান হয়। এবার করোনার কারণে অনুষ্ঠান না থাকায় কার্যাদেশ পাননি ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়ায় জুয়েলারি ব্যবসায় মন্দা চলছে। সব মিলিয়ে ১০ শতাংশ বিক্রি নেই। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া স্বর্ণ কিনছেন না কেউ।
স্বাভাবিক সময় ঈদবাজারে প্রসাধনীর হাজার কোটি টাকা বিক্রি হয়। এবার এ পণ্যের বিক্রি কমেছে। এই বিক্রির পরিমাণ অন্য ঈদের তুলনায় মাত্র ২০ শতাংশ হতে পারে। ইলেকট্রনিকসে চার হাজার কোটি টাকার ঈদবাজার। এই বাজারে এবার ঈদে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বিক্রি হতে পারে বলে জানান এ খাতের ব্যবসায়ীরা। ফ্ল্যাট ও প্লটসহ স্থায়ী সম্পদ ক্রয় এক হাজার কোটি টাকার বেশি হয়। ঈদের আগেই কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগের কারণে এ খাতের অবস্থার উন্নতি হয়। তবে ঈদ ঘিরে তেমন বিক্রি বাড়েনি বলে জানান রিহ্যাবের সহসভাপতি কামাল মাহমুদ। এ ছাড়া অর্থনীতির আরও অনেক খাত রয়েছে যেখানে ঈদকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বাণিজ্য হয়ে থাকে। বিশেষ করে ফার্নিচার ও গাড়ি বড় ধরনের কেনাকাটা হয়ে থাকে। এই বেচাকেনা স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও কম বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
রোজার শুরু থেকে সব ধরনের যোগাযোগ (সড়ক, রেল, নৌ এবং আকাশপথ), পর্যটন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, আবাসনসহ সকল প্রকার সেবা একেবারেই বন্ধ ছিল। সব মিলিয়ে সেবা খাতে প্রতিদিন ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। অন্য বছরগুলোতে ঈদে পরিবহন খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এবার ঈদে লঞ্চ, দূরপাল্লা-আন্তঃজেলা বাস ও ট্রেন বন্ধ আছে। তবে নানাভাবে বাড়তি ভাড়া ব্যয় করে গ্রামে ছুটছেন মানুষ। অনেকে যাচ্ছেন গাড়ি ভাড়া করে। আবার অনেকে পথে যে বাহন পাচ্ছেন তাতেই। তাছাড়া মহানগরীর মধ্যে বাস চলাচল শুরু হয়েছে। এতে ঈদের আগে কিছুটা লেনদেন হচ্ছে।

মন্তব্য করুন