ক্রিপ্টোগ্রাফিক কয়েন ভার্চুয়াল মুদ্রা বিট কয়েনের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, জার্মানি ও ভারতের মতো বিশ্বের বেশ কিছু দেশে বিকেন্দ্রীকরণ পদ্ধতির এই ডিজিটাল মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়েছে। 

অনলাইনে পণ্যমূল্য পরিশোধ করে বিট কয়েনের মতো লাইট কয়েন, পিয়ার কয়েন, রিপল, ড্রাক কয়েন, ডগ কয়েন, নেম কয়েন- এমন অন্তত ডজনখানেক ভার্চুয়াল কয়েন দিয়ে কেনা যাচ্ছে প্রয়োজনীয় পণ্যও। অনলাইন থেকে পণ্য ক্রয়ে এই মুদ্রার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বাংলাদেশেও। 

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে অনলাইন বিশ্বে বিটকয়েনের আবির্ভাব ঘটে। ২০০৮ সালে সাতোশি নাকামোতো নামের জনৈক সফটওয়্যার ডেভেলপার এই বিটকয়েন আবিষ্কার করেন। এটিই বিশ্বের প্রথম ভার্চুয়াল কারেন্সি। 

ইলেকট্রনিক উপায়ে সৃষ্ট এই বিনিময় মাধ্যমটি পিয়ার টু পিয়ারের মাধ্যমে আদান-প্রদান হয়। বর্তমানে কানাডা, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও ডেনমার্কে বিটকয়েনের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। 

তবে এখনও বৈধ বা আনুষ্ঠানিক মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। কেবল নিরাপত্তা ও বিকেন্দ্রীকরণ সুবিধায় জনপ্রিয়তার বিচারে বিস্তৃতি লাভ করছে।

বিট কয়েন আসলে কোনো কয়েন নয়। এটি একটি ভার্চুয়াল মুদ্রা, যা কম্পিউটারের মাধ্যমে আদানপ্রদান করা হয়। বিট কয়েনের সাংকেতিক প্রতীক হল BTC, এবং এর ক্ষুদ্র একক হল সাতোশি। ১ বিট কয়েন সমান ১০০০ মিলি বিটয়েন এবং সাতোশি ১ বিটকয়েন সমান ১ কোটি সাতোশি।

বিট কয়েন কোনো ক্যাশবাক্স বা ব্যাংকে রাখা যায় না। এই মুদ্রার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাও নেই।এটি অনলাইনের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়।

যেহেতু এটি একটি ক্রিপ্টোক্রারেন্সি সিস্টেম তাই অনলাইনে সকল প্রকার বৈধ ও অবৈধ কাজে এটি ব্যবহার করা হয় এবং যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা নেই তাই বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেন করলে কে বা কারা করছে এটি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

কোন কোন কাজে বিট কয়েন 

সাধারণত আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজেই বিট কয়েন ব্যবহার করা হয়। মাদক কেনাবেচা, অস্ত্র ব্যবসা এমনকি খুন খারাবির কাজেও বিট কয়েন ব্যবহার করা হচ্ছে।

২০০৯ সালে বিটকয়েনের উদ্ভাবন হয়। সাতোশি নাম ব্যবহার করে এক ব্যক্তি এই মুদ্রার উদ্ভাবন করেন। পরে ওই বছরই একটি সফটওয়্যার চালুর মাধ্যমে এটি আত্মপ্রকাশ করে। 

প্রথম দিকে বিট কয়েনের বাজার মূল্য খুব কম ছিল। ১৩০৯ বিট কয়েন সমান ছিল ১ ডলার। পরে নানা রকম অবৈধ কাজে বিটকয়েনের ব্যবহার বাড়লে এর বাজার মূল্যও বাড়তে থাকে।

বর্তমান ১ বিটকয়েনের মূল্যমান ৯ হাজার ৯৯৯ ডলারের সমান যা বাংলাদেশি টাকায় ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৯১৫ টাকা।

ড্রাক-অয়েবে বিট কয়েনের মাধ্যমে সব লেনদেন করা হয়। ড্রাক-অয়েব ইন্টারনেটের একটি গোপন অন্ধকার জগৎ।

বিট কয়েনের জনপ্রিয়তা ও দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকে বিট কয়েন সংগ্রহ করে রাখছেন। 

বিট কয়েন সংগ্রহ করে রাখার জন্য কোনো ব্যক্তির অবশ্যই একটি অনলাইন ওয়ালেটের বিপরীতে একটি ইউনিক আইডি বা অ্যাকাউন্ট নাম্বার দেওয়া হয়, যেখান থেকে গ্রাহক বিটকয়েন খরচ বা জমা করতে পারেন। অনেক উপায়ে বিটকয়েন উপার্জন করা যায়, যেমন কিছু ওয়েবসাইটের কাজ করে, কোনো মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যমে, কোনো কিছু বিক্রয়ের মাধ্যমে। তবে বিটকয়েন উপার্জনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে বিটকয়েন মাইনিং করা। 

ভার্চুয়াল মুদ্রার ব্যবহার ইন্টারনেটের জগতে অনেকটা শেয়ার বা মুদ্রার মতো লেনদেন হয় বিটকয়েন নামের এই ভার্চুয়াল কারেন্সিটি। নিয়মিত এর দর বা বিনিময়মূল্য ওঠানামা করে। এটি নিজেই ডলার বা ইউরো_ এসব আন্তর্জাতিক মুদ্রাগুলোর মতো বিনিময়মাধ্যম। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে সীমিত পরিসরে বিটকয়েনকে ব্যবহার করা হয় নিজস্ব মুদ্রার মতো। বিট কয়েনের লেনদেনটি বিটকয়েন ইউজারদের পিসিতেই সংরক্ষিত থাকে। পিয়ার টু পিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত থাকা একাধিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেন হলে এর ইউজার রেফারেন্স অনুযায়ী লেজার হালনাগাদ করে দেয়। অর্থাৎ কোনো ক্লিয়ারিং হাউসের খবরদারি নেই এখানে। ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রক্রিয়ায় বিটকয়েনের লেনদেন সম্পন্ন হয়।

বিটকয়েনের বাজার

আমাদের দেশে এখনও বিটকয়েনের ব্যবহার চালু হয়নি। বিশ্বে এখন ৭০২ কোটি ডলারের ওপর ভার্চুয়াল মুদ্রাবাজার রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৩৭টিরও বেশি দেশে বিটকয়েন ভার্চুয়াল মুদ্রাটির ব্যবহৃত হচ্ছে। এখনও তৈরি হচ্ছে বিটকয়েন মুদ্রা। প্রতিদিন মাইনিংয়ের মাধ্যমে এই মুদ্রা উৎপাদন করা হচ্ছে। নেটওয়ার্কের মধ্যে প্রতি দশ মিনিটে অ্যালগরিদম সমস্যার সমাধান করায় ২৫ মাইনারকে দেওয়া হচ্ছে বিটকয়েন। বর্তমানে এক কোটি ২৪ লাখ বিটকয়েন প্রচলিত আছে। এর মোট বাজারদর এখন ৬২০ কোটি ডলার। ২১৪০ সাল পর্যন্ত নতুন সৃষ্টি হওয়া বিট কয়েনগুলো প্রতি চার বছর পরপর অর্ধেকে নেমে আসবে। ২১৪০ সালের পর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরি হয়ে গেলে আর কোনো নতুন বিটকয়েন তৈরি করা হবে না। তাই চাইলে বাংলাদেশ থেকেও যোগ্য কম্পিউটার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা এই ভার্চুয়াল মুদ্রাটি উৎপাদনে অংশ নিতে পারেন। একটি বিটকয়েনের বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী তিনিও দশ মিনিটে আয় করতে পারেন ৫০৮ ডলার বা ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা।