বিতর্কিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাসেল ও চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন গ্রেপ্তারের পর কোম্পানির কাছে লাখ লাখ গ্রাহকের পাওনা ফেরত নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ইভ্যালির কাছে দেশের ২ লাখের বেশি ক্রেতা এবং কয়েক হাজার পণ্য সরবরাহকারী বা মার্চেন্টের টাকা প্রাপ্য। এ ছাড়া অফিস ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, ইন্টারনেট বিল, কর্মীদের বেতন বাবদ কয়েক কোটি টাকা পাওনা রয়েছে কোম্পানিটির কাছে। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা দেনার দায়ে থাকা কোম্পানির গ্রাহকদের সামনে অনিশ্চয়তা ছাড়া অন্য কিছু দেখছেন না বিশ্নেষকরা।
বাণিজ্য বিশ্নেষকরা বলছেন, ইভ্যালির গ্রাহকদের টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। যতদূর তথ্য পাওয়া গেছে, দেনা পরিশোধের মতো সম্পদ এ প্রতিষ্ঠানের নেই। বেশ কিছুদিন ধরে এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। গ্রাহকদের মধ্যে এ কারণে উদ্বেগ রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ৬ মাসের মধ্যে দেনা শোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানটির এমডি, কিন্তু বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দেননি। গ্রেপ্তার হওয়ার পর এখন তিনি কীভাবে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন, তা এখন সময়ই বলে দেবে।
২০১৮ সালে ব্যবসা শুরু করলেও দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর জনপ্রিয়তা পায় ইভ্যালি। ব্যাপক ছাড় দিয়ে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে কোম্পানিটি। ছাড় ও অফারের মাধ্যমে ক্রেতাদের পণ্য কিনতে প্রলুব্ধ করে ইভ্যালি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখ লাখ গ্রাহক সস্তায় পণ্য কিনতে কোটি কোটি টাকা আগাম পরিশোধ করেন। শুরুর দিকে গ্রাহকদের সময়মতো পণ্য সরবরাহ করলেও এ বছরের বেশ কয়েক মাস ধরে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারছিল না। এর পরই দেখা দেয় বিপত্তি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে হাজার হাজার গ্রাহক অভিযোগ করেন। এ রকম পরিস্থিতিতে কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে ইভ্যালিতে তদন্ত করারও অনুরোধ জানায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক তদন্তে ইভ্যালিতে ক্রেতাদের ২১৪ কোটি টাকা এবং মার্চেন্টদের ১৮৯ কোটি টাকা পাওনার তথ্য উঠে আসে। আর ইভ্যালির সম্পদ প্রায় ৬৫ কোটি টাকা, যার অধিকাংশই স্থাবর। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে নগদ অর্থ পেয়েছে মাত্র ২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানায়, তদন্তে ইভ্যালি সহযোগিতা করেনি। যে কারণে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এর পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইভ্যালির কাছে তাদের সম্পদ, দায়-দেনা এবং গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের পরিকল্পনা তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়। এর পর তিন দফায় ইভ্যালি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে তথ্য দিয়েছে। ইভ্যালির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের কাছে বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রাহকদের পাওনা রয়েছে ৫৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্রেতারা পাবেন ৩১১ কোটি টাকা। ২ লাখ ৭ হাজার ৭৪১ জন ক্রেতা এ অর্থ পান। আর পণ্য সরবরাহকারী মার্চেন্টরা পান ২০৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া বাকি ২৬ কোটি টাকা পান অন্যান্য খাতের গ্রাহকরা।
ইভালির তথ্য নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি বৈঠক করে গত ১৪ আগস্ট। ওই বৈঠকে কমিটি ইভ্যালির তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়- ইভ্যালির ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়ার সুপারিশ করে কমিটি। কারণ হিসেবে কমিটির সদস্যরা জানান, প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনসহ বিভিন্ন আইন তারা ভঙ্গ করেছে। এ অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপই হবে যথাযথ উদ্যোগ।
গতকাল ইভ্যালির এমডি ও চেয়ারম্যান গ্রেপ্তারের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কমার্স সেলের প্রধান হাফিজুর রহমানের কাছে সমকালের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল- কোম্পানির গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের কী হবে এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ নেবে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, কোনো কোম্পানির চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্রেপ্তার হলে সে কোম্পানি পরিচালনার দায়-দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেবে- এ রকম কোনো নিয়ম নেই। সেটা ই-কমার্স বা অন্য যে কোম্পানিই হোক। ইভ্যালির দায়দায়িত্বও মন্ত্রণালয় নেবে না। এমনকি ই-কমার্স নীতিমালা ও নির্দেশিকাতেও চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্রেপ্তারের পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানি অধিগ্রহণের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ইভ্যালির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিষয়ে এখন আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন। আদালত তাদেরকে (চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক) জামিন দিলে নিজেরাই কোম্পানি পরিচালনা করবেন এবং গ্রাহকদের পাওনা পণ্য ও অর্থ পরিশোধ করবেন। নতুবা আদালত জনস্বার্থে এ কোম্পানিতে কাস্টডিয়ান দিতে পারেন। যেমন ডেসটিনি, যুবকের ক্ষেত্রে হয়েছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আজকের ডিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম ফাহিম মাশরুর সমকালকে বলেন, ইভ্যালির গ্রাহকদের টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ টাকা আগেই হাওয়া হয়ে গেছে। তবে এখন তদন্ত করে দেখা উচিত ইভ্যালির মালিকপক্ষ কোথাও টাকা সরিয়েছে কিনা। যদি কোথাও কোনো গোপন সম্পদ থাকে বা টাকা গচ্ছিত থাকে সেগুলো উদ্ধার করে পাওনাদারদের দেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, কিছু লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে ই-কমার্স খাতের জন্য তাদের গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক।