কারখানা মালিক সিন্ডিকেটের কারণে পঞ্চগড়ে এবার নির্ধারিত মূল্যেও চা পাতা দিতে পারছেন না চাষি ও বাগান মালিকরা। সময়মতো চায়ের কাঁচা পাতা দিতে না পেরে তাঁরা চরম বিপাকে রয়েছেন। নির্দিষ্ট সময়ে বাগান থেকে পাতা উত্তোলন করতে না পেরে চা গাছ বড় হয়ে বাগান নষ্ট হচ্ছে।

শনিবার জেলার বিভিন্ন এলাকার চা বাগান ঘুরে দেখা যায়, নির্ধারিত সময়ে চা পাতা তুলতে না পারায় গাছ বড় হয়ে গেছে। কমিটি নির্ধারিত ১৮ টাকা কেজিদর সিন্ডিকেট করে কারখানার মালিকরা কমিয়ে দেওয়ায় ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত হচ্ছেন চাষিরা। এ কারণে ভরা মৌসুমে তাঁরা কাঁচা পাতা অর্ধেক দামেও বিক্রি করতে পারছেন না। বিভিন্ন কারখানার সামনে চা পাতা নিয়ে ধরনা দিচ্ছেন চা চাষিরা। স্থানীয় সাজেদা রফিক চা কারখানা, নর্থ বেঙ্গল টি ইন্ডাস্ট্রিসহ কয়েকটি চা কারখানা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন কারখানায় চাহিদার তুলনায় পাতা সরবরাহ বেশি বলে তাঁরা আর চা পাতা কিনছেন না। কারখানা মালিকদের দাবি, কাঁচা পাতার উৎপাদন ও সরবরাহ বেশি হওয়ায় আপাতত কৃষকদের কাছ থেকে পাতা কেনা হচ্ছে না। পাশাপাশি ভালো মানের পাতা না পাওয়ায় তাঁরা মানসম্পন্ন চা উৎপাদন করতে পারছেন না। এ জন্য অকশন মার্কেটে ভালো দাম না পাওয়ায় তাঁরাও চাষিদের চাহিদামতো দাম দিতে পারছেন না।

স্থানীয় চা বোর্ড সূত্র জানায়, জেলায় প্রতিনিয়িত চা চাষের পরিধি বাড়ছে। পাশাপাশি কাঁচা পাতা ও তৈরীকৃত চা উৎপাদনও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত উৎপাদন মৌসুমে জেলায় ৭ কোটি ৩৫ লাখ ৬৮ হাজার কেজি কাঁচা চা পাতা থেকে ২০টি কারখানায় এক কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়। এবার আরও বেশি চা উৎপাদনের আশা করছে চা বোর্ড।

স্থানীয় চা চাষি ও বাগান মালিকদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চা প্রক্রিয়াজাত কারখানার মালিকরা তাঁদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করছেন। উৎপাদিত ভালো মানের তৈরীকৃত চা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তাঁরা কালোবাজারে বিক্রি করেন। আর নিম্নমানের তৈরীকৃত চা অকশন মার্কেটে দেওয়ার ফলে ভালো দাম পাওয়া যায় না। অকশন মার্কেটের মূল্যের অজুহাত দেখিয়ে তাঁরা চা চাষিদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করছেন। গত বছর একই সময়ে চা প্রক্রিয়াজাত কারখানাগুলো প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা ২২ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত কেজিদরে কিনলেও এবার ১৩ থেকে ১৪ টাকায় কিনছে। এর বাইরে ভেজা ও বড় ডালসহ পাতা দেওয়ার অজুহাতে কেজিপ্রতি মূল্য আরও ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে টাকা দিচ্ছে। এ নিয়ে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভাসহ জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন চা চাষিরা।

পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শামীম আল মামুন বলেন, আমাদের হিসাবমতে, ক্ষুদ্র চা চাষিদের কেজিপ্রতি কাঁচা পাতার উৎপাদন খরচ ১৬ থেকে ১৭ টাকা। চা চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে মূল্য নির্ধারণ কমিটির মিটিং করা হয়েছে। সকলের সম্মতিতে কাঁচা পাতার কেজিপ্রতি ১৮ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়।

মরগেন টি ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী নিয়াজ আলী চিশতী বলেন, সরবরাহ বেশি থাকার কারণে আমরা কাঁচা পাতা কিনতে হিমশিম খাচ্ছি। তার পরও পাতা ক্রয় করা হচ্ছে। তবে এখনই চা চাষিদের মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে না। মান ঠিক রেখে চা পাতা সরবরাহ করলে সরকার নির্ধারিত মূল্যেই চা চাষিদের মূল্য পরিশোধ করা হবে।

নর্থ বেঙ্গল টি ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক আমিনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কারখানা চালু আছে। আমরা ধারণক্ষমতার বেশি কাঁচা পাতা ক্রয় করে ফেলেছি। আমাদের কারখানাতেই কাঁচা পাতা নষ্ট হচ্ছে। এ জন্য আপাতত চা চাষিদের কাছ থেকে পাতা ক্রয় করছি না। মূল্যবৃদ্ধির আশায় চা চাষিরা সময়মতো পাতা না দেওয়ায় বাগানে পাতা বড় ও বেশি হয়ে গেছে বলে মনে করেন তিনি। কমিটির মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে দ্বিতীয় রাউন্ডের পাতা সংগ্রহ চলছে। আগামী ২৫ তারিখের মধ্যে চলতি রাউন্ড শেষ হলে কমিটি নির্ধারিত মূল্যেই পাতার মূল্য দেওয়া হবে।

পঞ্চগড় চা পাতা মূল্য নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, চা বোর্ড, চা বাগান মালিক, ক্ষুদ্র চা চাষি প্রতিনিধিসহ কমিটির সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করা হয়। সবার মতামতের ভিত্তিতে কাঁচা চা পাতার কেজি ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কারখানাগুলো আপাতত চাহিদা অনুযায়ী পাতা সংগ্রহ করছেন। তাঁরা নির্ধারিত ১৮ টাকা করেই চা চাষিদের মূল্য পরিশোধ করবেন। চায়ের মান বজায় রেখে পাতা উত্তোলন ও কারখানায় সরবরাহসহ সার্বিক বিষয় দেখভাল করতে একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে।