আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ কর পরিশোধের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনতে অ্যামনেস্টি বা দায়মুক্তি দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সম্ভাব্য এ উদ্যোগের প্রতিক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের এ ধরনের উদ্যোগে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত, বিনিময় হার ও রাজস্ব সংগ্রহে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না। বরং এ ধরনের দায়মুক্তিতে দুর্নীতি ও টাকা পাচার আরও উৎসাহিত হবে।

তাঁরা বলেছেন, বাংলাদেশে যে ধরনের লোকেরা টাকা পাচার করেন বলে ধারণা করা হয়, তাঁদের করের সুবিধা নিতে অর্থ ফেরত আনার প্রয়োজন নেই। ধারণা করা হয়, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং আমলারা টাকা পাচার করেন। তাঁদের কেউ প্রয়োজনে, কেউ অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ লুকানোর জন্য বিদেশে রেখেছেন। বাংলাদেশের অনেকেরই কানাডার বেগম পাড়াখ্যাত এলাকায় বাড়ি রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। গত বছর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে কানাডায় অর্থ পাচারকারীদের একটি তালিকা তিনি পেয়েছেন। যাঁদের বেশিরভাগই আমলা। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম পলিসির সুবিধা নিয়েছেন অনেকে। হংকং, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, ভারতেও বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের আলোচনা আছে। আবার করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের নামে বিনিয়োগের তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জোট আইসিআইজের বিভিন্ন সময়ে ফাঁস করা নথিতে। কিন্তু এসব বিষয়ে দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁর অভিজ্ঞতায় কোনো রাজনীতিবিদকে স্বেচ্ছায় অবৈধ আয় বৈধ করার উদ্যোগ নিতে দেখেননি। কারণ, রাজনীতিবিদরা মনে করেন, এতে তাঁদের ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, সরকারের নথিতে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকিও থাকে। আর ব্যবসায়ীরা পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে চান না। কারণ, তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টাকা এবং বাড়ি গাড়ির মতো স্থাবর সম্পদ রাখেন। তাঁরা মনে করেন, যে অর্থ পাচার হয়ে গেছে তা দেশে আনা মানেই এক ধরনের জটিলতায় পড়া। তবে কিছু লোক আছেন, যারা অবৈধ অর্থ দেশে রাখতে না পেরে বাধ্য হয়ে বিদেশে পাচার করেছেন। কিন্তু এখন সেই অর্থের কোনো সুবিধা ভোগ করতে পারছেন না। এ ধরনের পাচারকারীরা সরকার সুযোগ দিলে অর্থ দেশে আনবেন।

গত বৃহস্পতিবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, বিদেশে স্থায়ী সম্পদ বা নগদ অর্থ আছে, কিন্তু আয়কর ফাইলে প্রদর্শন করা হয়নি, আগামী অর্থবছরের বাজেটে নির্ধারিত হারে কর দিয়ে এ ধরনের সম্পদ প্রদর্শনের সুযোগ রাখা হবে। সম্পদের মালিকদের কোনো প্রশ্ন করা হবে না। পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনা, দেশের নাগরিকদের বিদেশে থাকা সম্পদ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ ও বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ উদ্যোগের পক্ষে যুক্তি দেখাতে তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময় এ ধরনের 'ট্যাক্স অ্যামনেস্টি' দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া এ ধরনের সুযোগ দিয়েছিল। সেখানে অনেক টাকা ফেরত এসেছে। তিনি বলেন, সরকার চাইছে, যেসব টাকা বিভিন্ন সময় দেশ থেকে পাচার হয়েছে, সেগুলো দেশে ফেরত আসুক।

সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ সমর্থন করেন না সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে কে কোন সূত্রে বিদেশে টাকা পাচার করেছে, তা চিহ্নিত করার উদ্যোগ দরকার। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ অন্যান্য আইন জোরালোভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার।

তিনি বলেন, অবৈধ অর্থের মালিকদের এ ধরনের সুবিধা দিয়ে রাষ্ট্রের বিশেষ কোনো লাভ হয় না।

বরং টাকা পাচার বা কর ফাঁকির প্রবণতা বেড়ে যায়। অপরাধীরা মনে করেন, তাঁরা রেয়াতি সুবিধা পাবেন। এতে যারা নায্যভাবে বা আইন অনুযায়ী কর দেন, তাঁরা নিরুৎসাহিত হন। তাঁদের মধ্যেও কর ফাঁকির মানসিকতা তৈরি হয়।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ সমকালকে বলেন, তিনি এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার বিরুদ্ধে। কারণ, এটি আইন ও নৈতিকতাবিরোধী। এতে অর্থ পাচার উৎসাহিত করবে। এনবিআরের দায়িত্বে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুবিধা দিয়ে ভালো সাড়া পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কোনো প্রশ্ন করা ছাড়া বিদেশ রেমিট্যান্স আনতে দেওয়ায় আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে। তবে এতে দেশে যেসব দুর্নীতিবাজ লোকজন আছে, তাদের কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে উৎসাহিত করা হবে। আর যারা আইন অনুযায়ী আয় করেন এবং কর পরিশোধ করেন, তাঁদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান সমকালকে বলেন, সরকার বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব সংগ্রহে চাপের প্রেক্ষিতে হয়তো এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। কিন্তু দেশে যারা নিয়মিত আইন অনুযায়ী কর পরিশোধ করছেন, তাঁদের জন্য সরকারের উদ্যোগ কোথায়। এ ধরনের উদ্যোগে যারা নিয়মিত কর পরিশোধ করেন, দেশে টাকা রাখেন এবং দেশেই বিনিয়োগ করেন তাঁদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হবে। কারণ, দেশে টাকা রেখে ৩০ শতাংশ বা তার বেশিও কর দিতে হচ্ছে। আর যিনি আইন ভঙ্গ করে বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন, তাঁর জন্য আইন করে সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ সৎ করদাতাদের হতাশ করবে। মানুষকে টাকা পাচারে উদ্বুদ্ধ করবে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, সরকার কি মানি লন্ডারিং বা অন্যান্য আইন পরিবর্তন করবে। কারণ, দেশে অনেক মানুষ আছে, যারা তাঁদের বৈধ উপার্জন প্রয়োজনে বিদেশে নিতে চায়। কিন্তু সে সুযোগ নেই। এ ধরনের সুযোগ সরকারের রাখা উচিত।

বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত কী পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালেই বাংলাদেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার পাচার হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ সোয়া ৪ লাখ কোটি টাকা। এ সংস্থার প্রকাশিত পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস ও প্যান্ডোরা পেপারসে বাংলাদেশের বেশ কিছু ব্যক্তির নামে কর স্বর্গ নামে খ্যাত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগের তথ্য উঠে এসেছে। যদিও ওই তথ্যের ভিত্তিতে দেশে কারোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সরকার সাধারণভাবে দেশের ভেতরে থাকা অপ্রদর্শিত আয় প্রদশর্নের যে সুযোগ বিভিন্ন সময়ে দিয়ে আসছে, তাতে করদাতারা বিশেষ সাড়া দেননি। ২০২০-২১ অর্থবছরে অনেকটা প্রণোদনার মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলে কিছু করদাতা এগিয়ে আসেন। ওই অর্থবছরে ১১ হাজার ৮৫৯ জন করদাতা ২০ হাজার ৬৪৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা সাদা করেছেন। এ থেকে সরকার কর পেয়েছে ২ হাজার ৬৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই থেকে মার্চ) মাত্র ২ হাজার ৫৮১ জন করদাতা ৩০০ কোটি কালো টাকা সাদা করেছেন। এ থেকে সরকার ৯৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা রাজস্ব পেয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ইন্দোনেশিয়া অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পাচার অর্থ বিনা প্রশ্নে ফেরত আনার ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি দেশটির সব সমুদ্র, নৌ, বিমান ও স্থল বন্দরে স্ক্যানার বসায়। এতে ইন্দোনেশিয়ার রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ে এবং বিদেশ থেকে অনেক অর্থ ফেরত আসে। ওই বছরের পর আর এ ধরনের সুযোগ দেয়নি ইন্দোনেশিয়া।