বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সংকট মেটাতে প্রচুর ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যার বিপরীতে বাজার থেকে উঠে আসছে টাকা। এর মধ্যে আবার সরকারি-বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা বেড়েছে। যে কারণে টাকারও কিছুটা টানাটানি শুরু হয়েছে। যার প্রভাবে সুদহার বাড়ছে। ব্যাংক খাতে কমছে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ। এ রকম পরিস্থিতিতে মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে আজ নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দুয়ের মধ্যে সমন্বয়ের লক্ষ্যে ঋণে বিদ্যমান ৯ শতাংশ সুদহারের সীমা শিথিল করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
সাধারণত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মুদ্রানীতি কিছুটা আগেই ঘোষণা করতে যাচ্ছেন গভর্নর ফজলে কবির। আগামী ৩ জুলাই গভর্নর হিসেবে তাঁর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন গভর্নর হিসেবে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
জানা গেছে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে শেষ সময়ে এসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রচুর ঋণ নিচ্ছে সরকার। নিলাম ক্যালেন্ডারের বাইরে গতকাল ৯১ দিন মেয়াদি বিলের বিপরীতে ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা এবং ১৮০ দিন মেয়াদি বিলের বিপরীতে ৪ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়। আগের দিন মঙ্গলবারের নিলাম ক্যালেন্ডারে ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকার বিপরীতে তোলা হয় ৪ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ সুদে এ অর্থ নেয় সরকার। যদিও পুরো অর্থবছরে সরকারের ঋণের পরিমাণ নির্ধারিত ৮৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকার নিচে থাকবে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ম্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে সীমিত রাখা এবং ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। এরই মধ্যে গত মে মাসে মূল্যস্ম্ফীতি উঠেছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশে। এ রকম প্রেক্ষাপটে ঋণ কিছুটা ব্যয়বহুল করতে সুদহারের বিদ্যমান সীমা ৯ শতাংশের পরিবর্তে কিছুটা বাড়ানো হতে পারে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণী সুদহার বাড়ানো হতে পারে। এ উপায়ে গুণগত মানের ঋণ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হবে। বেসরকারি খাতে ঋণ জোগানের লক্ষ্যমাত্রা আগের প্রক্ষেপণের মতোই থাকছে।
চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা হয় ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত এপ্রিল পর্যন্ত ঋণ বেড়েছে ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এই ঋণ প্রবৃদ্ধির বড় অংশই হয়েছে আমদানি মূল্য বৃদ্ধিজনিত কারণে। এ ক্ষেত্রে গুণগত মানের ঋণ বাড়াতে তদারকি ব্যবস্থায় জোর দেওয়া হবে। এ ছাড়া সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে, তা জোগানের ব্যবস্থা রাখা হবে।
সংশ্নিষ্টরা জানান, করোনা-পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতিতে
যখন চাহিদা বাড়ছিল, এর মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অধিকাংশ পণ্যের দর বেড়েছে। বিলাসবহুল ও কম
গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানি কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগের পরও এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি বেড়েছে ৪১ শতাংশের বেশি। একই সময় পর্যন্ত যেখানে রপ্তানি বেড়েছে ৩৫ শতাংশ, আবার রেমিট্যান্স কমেছে ১৬ শতাংশ। পরিস্থিতি সামলাতে চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ৭৪৯ কোটি ২৭ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এতে বাজার থেকে উঠে এসেছে ৬৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এভাবে টাকা উঠে আসা এবং ঋণ বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকগুলোতে কিছুটা টাকার টানাটানি তৈরি হয়েছে। গত এপ্রিল শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত টাকা কমে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায় নেমেছে। গত বছরের জুনে যা ২ লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রচুর ডলার বিক্রির পরও ডলারের দর বাড়ছেই। ব্যাংকগুলোতে এখন ডলার ১০০ টাকা ছুঁইছুঁই। বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত প্রতি ডলারে ৮ টাকা ৬৫ পয়সা বাড়িয়ে ৯৩ টাকা ৪৫ পয়সা নির্ধারণ করেছে। এর মানে, এক অর্থবছরে দর বেড়েছে ১০ দশমিক ২০ শতাংশ।