দুই গোষ্ঠীর সংঘাতে ভয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে প্রায় দুইশ শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক অভিভাবকদের অভয় দিলেও ভরসা পাচ্ছেন না তাঁরা। বরং উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাঁদের।

ঘটনাটি নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের গোয়ালনগর গ্রামের। বিদ্যালয়টির নাম গোয়ালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার নদীর পাড় থেকে মাটি কেটে স্থানীয় রফিক মিয়ার পক্ষের লোকজন ইউপি সদস্য মাসুকের পক্ষের লোকজনের বাড়ির ওপর দিয়ে যায়। এতে মাসুকের পক্ষের লোকজন বাধা দেয়। এ নিয়ে দুই পক্ষে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়। হাতাহাতির খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে দুই পক্ষের লোকজন লাঠিসোটা, টেঁটা-বল্লম নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। এতে উভয় পক্ষের ২৫ জন আহত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং চার ব্যক্তিকে আটক করে।

বুধবার বেলা ১১টার দিকে স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, তৃতীয় শ্রেণির কক্ষে ২০ শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন একজন শিক্ষক। শ্রেণিশিক্ষক জানান, তৃতীয় শ্রেণিতে শিক্ষার্থী আছে ১০৬ জন। মারামারির কারণে ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত। তবে যারা আসছে, তারা বাড়ি ফেরার সময় থাকে আতঙ্কে।

আরও জানা গেছে, সংঘর্ষের দিন থেকে আশানগর ও গোয়ালনগর মধ্যপাড়ার শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে রয়েছে। চার দিন ধরে সংঘর্ষকবলিত এলাকায় পুলিশ মোতায়েন
করা হয়েছে। এর পরও ভয়ে শিশুরা ঘর থেকে বের হচ্ছে না।

আশানগর গ্রামে গিয়ে কথা হয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী শ্যামল দাসের অভিভাবক সুমিত্রা রানীর সঙ্গে। যেখানে মারামারি হয়েছে, এর পাশেই তাঁদের বাড়ি। তিনি বলেন, 'আমরা আতঙ্কে থাকি কখন যে আবার মারামারি শুরু হয়! ভয়ে বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাই না।'

দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জুঁই সরকারের মা সাবিত্রী সরকার বলেন, 'আমরা জীবনেও এমন মারামারি দেখি নাই। আমার মাইয়াডা মারামারি দেইখ্যা খুব ভয়ে আছে। স্কুলে যেতে চায় না।'

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী পল্লব সরকার বলে, 'রাইতের বেলা স্বপ্নে শুধু মারামারি দেহি, ইশকুলে যাইতেও ভয় লাগে।'

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোয়ালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয় শিক্ষকসহ শিক্ষার্থী রয়েছে ৪৪৬ জন। এর মধ্যে গোয়ালনগর পূর্বপাড়া ও আশানগর গ্রামের শিক্ষার্থীই আছে ২০০, যাদের অধিকাংশই মারামারির ভয়ে স্কুলে আসা বন্ধ রে দিয়েছে।

গোয়ালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনির মিয়া জানান, গত সোমবার গোয়ালনগর মধ্যপাড়ায় পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে গোষ্ঠীগত মারামারি হয়। সে জন্য আশানগর ও মধ্যপাড়ার প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী স্কুলে আসে না। স্কুলে আসার জন্য তিনি মাইকিংও করছেন, এরপরও তারা আসছে না। কিছুদিন পরই বার্ষিক পরীক্ষা। শিক্ষার্থীরা স্কুলে না এলে পড়ালেখার খুবই ক্ষতি হবে বলে তিনি জানান।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইকবাল মিয়া বলেন, মারামারির ঘটনা শুনেছেন। প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নির্ভয়ে স্কুলে আসার উদ্যোগ নিয়েছেন। স্থানীয়দের নিয়ে মা সমাবেশ করে শিশুদের স্কুলমুখী করতে তাঁরা উদ্যোগ নেবেন বলে জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফকরুল ইসলাম বলেন, মারামারির ঘটনা জেনেছেন। দুই গ্রামের শিশু শিক্ষার্থীরা কেন স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে- খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।