ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

খামারিরা ধুঁকছেন, ভোক্তা ঠকছেন

খামারিরা ধুঁকছেন, ভোক্তা ঠকছেন

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ২০:২৯

আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ। হঠাৎ ডিমের দামে 'রকেটগতি'। দেশের খুচরা বাজারে তখন দামের রেকর্ড। প্রতি ডজন বেচাকেনা ১৬০ টাকায়। অস্থির ডিমের বাজারের লাগাম টানতে সে সময় মাঠে নামে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এরপর কিছুটা কমে দামের পারদ। মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, দফায় দফায় বৈঠক, অভিযানের পরও প্রতি ডজন ডিমের দাম এখনও ঘুরছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকার ঘরে। অথচ গেল জুলাইয়েও ডিমের ডজন ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকা।

এ পরিস্থিতিতেও খামারি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা আড়তদার- কোনো পক্ষই দাম বাড়ানোর দায় নিচ্ছে না। সব পক্ষের এককথা- ডলার, প্রাণিজ খাদ্য ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে এ খাত টালমাটাল। এ জন্য কেউ কেউ মধ্যস্বত্বভোগী ও পরিবহন-সংশ্নিষ্টদেরও দুষছেন। এ অবস্থায় গরিবের আমিষের চাহিদা মেটানো এখন আর সহজলভ্য নয়, ফলে ঠকছেন ভোক্তা। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধুঁকছেন খামারিরা।

খাত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ডিমের উৎপাদন বাড়ানো ও ক্রেতার ক্রয়সীমার মধ্যে আনতে প্রয়োজন সরকারের সহায়তা। বিদ্যুৎ বিল কমানো, প্রাণিজ খাদ্য আমদানিতে কর মওকুফ, সয়ামিল রপ্তানি বন্ধ ও প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও পোলট্রি খাতকে রক্ষার কথা বলছেন তাঁরা।

এ পটভূমির মধ্যেই আজ শুক্রবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস। দিনটির এবারের প্রতিপাদ্য 'প্রতিদিন একটি ডিম, পুষ্টিময় সারাদিন'।

দিবসটি যৌথভাবে পালন করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এবং ওয়ার্ল্ড'স পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা (ওয়াপসা-বিবি)। দেশের ৬১ জেলা, সব বিভাগীয় শহর এবং চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার, ডিমের পুষ্টিগুণবিষয়ক জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে শোভাযাত্রা, বিদ্যালয় ও এতিমখানায় ডিম বিতরণ কর্মসূচি পালন করা হবে। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে সকাল ৯টায় শোভাযাত্রা ও সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

আমিষ সংকটের শঙ্কা :এক যুগ আগেও সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের মানুষ বছরে গড়ে ৪০টির বেশি ডিম খেতে পারত না। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে মাথাপিছু ডিম খাওয়ার সংখ্যা ১৩৬, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নূ্যনতম চাহিদার চেয়ে বেশি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একজন মানুষের নূ্যনতম পুষ্টি চাহিদা পূরণে খাদ্যতালিকায় বছরে ১০৪টি ডিম থাকা দরকার। তবে দাম বাড়ার পর নিম্ন আয়ের মানুষের পাতে কম উঠছে ডিম।
পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে নাসরিন আক্তারের বাস রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। প্রতি ডজন ডিম এখন তাঁকে কিনতে হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে লাগাম টেনেছেন তিনি। নাসরিন বলেন, 'আগে সপ্তাহে দুই ডজন ডিম লাগত। এখন এক ডজনে নামিয়ে এনেছি।'

পুষ্টিবিদরা বলছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭০ গ্রাম আমিষের প্রয়োজন, যা কম দামে ডিম থেকে মিলত। দাম বাড়ার কারণে মানুষের আমিষ গ্রহণের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে। কারণ, টানাপোড়েনে থাকা পরিবারগুলো খরচ সামলাতে সবার আগে প্রোটিনজাত খাবার কেনা কমিয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিম সহজলভ্য রাখতে কমাতে হবে উৎপাদন খরচ। খামারিদের প্রতি বাড়াতে হবে সরকারের সহায়তার হাত।

সার্বিক পুষ্টি চাহিদার এই ঘাটতি দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ প্রোটিন কমিয়ে খরচ সাশ্রয়ের চেষ্টা করে। এতে পুষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ধুঁকছেন খামারি :প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে রেজিস্টার্ড পোলট্রি খামারের সংখ্যা ৮৬ হাজার ৫৪১। কর্মসংস্থান ৫৪ লাখ ২০ হাজার মানুষের। খামারিরা বলছেন, মুরগির খাবার ও ওষুধের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। লোকসানে পড়ে অনেকে ডিম উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন। খামারিরা জানান, প্রশাসনের নজরদারি ও চাহিদা কমে যাওয়ায় ডিমের দাম কিছুটা কমাতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।

গাজীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্র বলছে, জেলায় লেয়ার মুরগির ৪ হাজার ১৬০টি খামার এখনও টিকে আছে। বন্ধ হয়েছে অন্তত পাঁচ হাজার খামার। প্রান্তিক খামারিরা জানান, মুরগির প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ১০ টাকা ৩৫ পয়সা। খামার থেকে এ ডিম বের হওয়ার পর হাতবদল হয়েই দাম বেড়ে সাধারণ ভোক্তার কাছে যাচ্ছে ২ থেকে ৩ টাকা বেশিতে। একদিকে যেমন খামারি তাঁর উৎপাদিত ডিমের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি প্রতিটি ডিম কিনে ২ থেকে ৩ টাকা করে ঠকছেন সাধারণ ক্রেতারা।

বগুড়া সদরের এরুলিয়া এলাকার মেসার্স জিএম পোলট্রি খামার মালিক ফিরোজ হোসেন জানান, বগুড়ায় গত দুই বছরে প্রায় সাড়ে তিনশ খামার বন্ধ হয়েছে। যারা টিকে আছে, তারাও নানামুখী সংকটে।

রাজশাহীর পবার পারিলা গ্রামের খামারি ফরমান আলী বলেন, ২০১৭ সালে ৩ টাকা ১০ পয়সা করে তাঁদের ডিম বিক্রি করতে হয়েছিল। তাঁরা ডিম ভেঙে প্রতিবাদ করেছেন, গণমাধ্যমে সেভাবে তা আসেনি। অথচ দাম দুই টাকা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৈচৈ পড়ে গেল।

ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি মো. আহসানুজ্জামান বলেন, একটি গোষ্ঠী প্রচারণা চালাচ্ছে, কিছু ব্যবসায়ী নাকি ডিম থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে; যা পুরোপুরি মিথ্যা। এখানে কোনো সিন্ডিকেট হয়নি। আমরা খুবই কষ্টে আছি। প্রাণিজ খাবারের দাম ৯০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন. আমরা সস্তায় নিরাপদ প্রোটিন দিতে চেষ্টা করেছি। সংকটকালে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারসহ সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
খামারিদের সুরক্ষার উদ্যোগ :বিপিআইসিসির হিসাবমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে ডিমকেন্দ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই বড় শিল্পের সুরক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেশের ৬১ জেলায় প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন (এলডিডিপি) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্পের চিফ টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর ড. মো. গোলাম রব্বানী বলেন, দেশের ৬১ জেলার ৪৬৬ উপজেলায় খামার, খামারি এবং পশুভিত্তিক ৫ হাজার ৫০০ প্রোডিউসার গ্রুপ (পিজি) গঠন করা হয়েছে। এতে ১ কোটি ৯০ লাখ খামারিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তালিকাভুক্তদের জন্য থাকবে ফিল্ড স্কুল। যেখানে খামার আধুনিকায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করানো, উৎপাদিত দুধ, মাংস ও ডিমের হাইজিন নিশ্চিত করা, দুধ ও মাংসের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, সচেতনতা এবং খামারে উৎপাদিত পণ্যের বিপণন ব্যবস্থাপনার ওপর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মনজুর মোহাম্মদ শাহজাদা বলেন, 'প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের লক্ষ্য হচ্ছে সবার জন্য নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত প্রাণিজ আমিষ নিশ্চিত করা। আমরা নীতি-সহায়তার পাশাপাশি নিত্যনতুন প্রযুক্তি দিয়ে খামারিদের সহায়তা করছি।'

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বগুড়া ব্যুরোর এস এম কাওসার ও গাজীপুর প্রতিনিধি ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন]

আরও পড়ুন

×