নির্বাচনের বছরে বিদেশে টাকা পাচারের শঙ্কা সিপিডির

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০১৮      

সমকাল প্রতিবেদক

ছবি: সমকাল

আমদানি প্রক্রিয়ায় মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালাগ-সিপিডি। সংস্থার সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আমদানির আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। সাধারণত নির্বাচনের আগেই অর্থ পাচারের প্রবণতা দেখা যায়। এর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না হলে অর্থনীতির চিত্র বিকৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা তার। 

সার্বিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নে ড. দেবপ্রিয় বলেন, প্রায় এক দশক ধরে স্থিতিশীল থাকার পর এখন অর্থনীতিতে চিড় ধরেছে। এ কারণে আগামীতে অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ থাকবে। 

চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা তুলে ধরতে রোববার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্র্যাক সেন্টার ইন-এ সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সংস্থার সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। প্রতিবেদেন চলতি অর্থবছরে সার্বিক অর্থনীতির মূল সূচকগুলোর ওঠানামা বিশ্নেষণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরের জন্য কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তাও বিশ্নেষণ করা হয়। 

ড. দেবপ্রিয় ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, নিত্যপণ্যের দরে কারসাজি, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দের অপব্যবহার বিষয়ে কথা বলেন। সংকট থেকে উত্তরণে ব্যাপক সংস্কার পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। ব্যাংকিং খাত সংস্কারে কমিশন গঠনসহ বিভিন্ন খাতভিত্তিক কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, নির্বাচনের বছর হওয়ায় আগামী বাজেটে সরকার বড় ধরনের কোনো সংস্কারে হাত দেবে না বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে বিষয়গুলোকে নির্বাচনী বিতর্কের মধ্যে রাখতে হবে। 

ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় বলেন, এ খাতে সব সংকটের পেছনে রয়েছে সুশাসনের ঘাটতি। এটাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট রাজনীতির অর্থনীতি কিংবা নষ্ট লক্ষ্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি বলা যায়। যাদের ওপর ব্যাংকিং খাতের দেখভালের দায়িত্ব, তারা তা করছেন না। যারা কারসাজি করছে, তাদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সক্ষমতা নেই এ সংক্রান্ত আইনের। সরকারি ব্যাংকে সংকট সবচেয়ে বেশি। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংকিং কমিশন গঠন এবং আইন যুগোপযোগী করার পরমার্শ দেন তিনি।

নিত্যপণ্যের মূল্য কারসাজি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যের তুলনায় দেশে নিত্যপণ্যের মূল্য অনেক বেশি। আমদানি শুল্ক্ক হ্রাস সত্ত্বেও দাম বাড়ছে। খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ের দরে বড় ব্যবধান রয়েছে। তার মানে, কেউ বাজার অপনিয়ন্ত্রণ করছে। যখন আমদানি করা প্রয়োজন তখন আমদানি করা হয়নি। যখন প্রয়োজন নেই তখন আমদানি করা হয়েছে। অন্যদিকে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দর পাচ্ছে না। বাজার অর্থনীতির মধ্যে দুর্নীতি ঢুকে পড়ার কারণে এগুলো হচ্ছে। 

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায় ও লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকবে ৫০ হাজার কোটি টাকা। সক্ষমতার ঘাটতির কারণেই এটা হচ্ছে। করপোরেট কর কমানোর দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, করপোরেট কর কমলেই যে বিনিয়োগ বাড়বে- এমন নিশ্চয়তা নেই। বিনিয়োগ বাড়বে যদি সহায়ক পরিবেশ থাকে। করপোরেট কর কতটা কমলে কী সুফল পাওয়া যাবে তা খতিয়ে দেখা দরকার। আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত রাখার প্রস্তাব করেন তিনি। 

ব্যাংক খাত প্রসঙ্গে পর্যালোচনায় বলা হয়, এ খাতের বিদ্যমান সমস্যা সমাধান না করে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া কিছুতেই উচিত নয়। গ্রাহকের অনুপাতে ব্যাংকের সংখ্যা কম নয়। প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের জন্য বরং মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বাড়ানো প্রয়োজন। পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে পর্যালোচনায় বলা হয়, বাজার ওঠা-নামার পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা আছে। তারা যখন কোনো শেয়ার কেনে তখন দাম বাড়ে; যখন বিক্রি করে তখন দর কমে যায়। আইনের আলোকে এসব বিনিয়োগকারীর ওপর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজর বাড়ানো দরকার। 

উন্নয়ন ব্যয়ে দুর্নীতি প্রসঙ্গে পর্যালোচনায় সিপিডি বলেছে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি হচ্ছে। এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, এ দেশে তার চেয়েও বেশি হচ্ছে। প্রকল্প ব্যয় অতিমূল্যায়িত হয় কি-না, ভেবে দেখতে হবে। তবে আর্থিক মূল্যের চেয়েও গুণগত মানের দিকটি বড় করে ভাবতে হবে। 

বাজেট প্রসঙ্গে পর্যালোচনায় বলা হয়, আগামী বাজেটে ভর্তুকির চাপ বাড়বে। কারণ, তরলীকৃত গ্যাস (এলএনজি) বাবদ ভর্তুকি বাড়বে। আবার গ্যাসের মূল্যের প্রভাবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্যের মূল্য বেড়ে তা ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়াবে। আগামী বাজেটে বিলাসী পণ্যে বেশি হারে শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে সিপিডি। 

পর্যালোচনায় বলা হয়, চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর বিভিন্ন খাতে বাস্তবায়ন না হওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে সিপিডি যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তার প্রায় সবই বাস্তবায়িত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সংলাপ বিভাগের পরিচালক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফ, ঊর্ধ্বতন গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খানসহ গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।

বিষয় : সিপিডি অর্থনীতি