নকল ট্যাক্স স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল সিগারেট খাতে বড় কারসাজি

বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাহাদাত হোসেন পরশ

সিগারেটের প্যাকেটে নকল ও পুনর্ব্যবহূত ট্যাক্স স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। দেশি-বিদেশি যেসব প্রতিষ্ঠান রাজস্ব ফাঁকি দিতে এমন কারসাজি ও প্রতারণায় যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। এ ঘটনায় অন্তত সাতজনকে গ্রেফতার করেছে তারা। সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গেছে এসব তথ্য।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো পত্রে বলা হয়, স্থানীয় রাজস্ব আহরণের অন্যতম বৃহৎ একটি খাত হলো সিগারেট। এ খাতে ১৯ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগৃহীত হয়েছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। এই খাত থেকে আরও অধিক পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হলে এ খাতে কোনো রাজস্ব ফাঁকি ও চোরাচালানকৃত সিগারেট বাজারজাত করা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের পত্রে আরও বলা হয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে অবগত হয়েছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেট ও বিদেশ থেকে অবৈধ পথে আসা চোরাচালানকৃত সিগারেটের সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়ে চলেছে। চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ প্রায় ২০টির বেশি দেশ থেকে ৩৫-৪০ ধরনের সিগারেট বিভিন্ন বন্দর দিয়ে চোরাপথে দেশে প্রবেশ করছে। এটি দেশের জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব হুমকির মুখে ফেলছে। এসব সিগারেটের গায়ে বাংলা ভাষায় মুদ্রিত স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা নেই। এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত সচিত্র স্বাস্থ্য সচিত্র বাণীও নেই। বিদেশি সিগারেটের আমদানি শুল্ক্ক প্রতি প্যাকেটে ৫৯৬.৫৮ শতাংশ হলেও অবৈধভাবে বিদেশি সিগারেট বাজারজাত হওয়ার কারণে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব সিগারেটের গায়ে নকল ও পুনঃব্যবহূত ট্যাক্স স্ট্যাম্প থাকে। দামে তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় দেশের যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষ আসক্ত হচ্ছে এ ধরনের সিগারেটে। তা ছাড়া সিগারেটের ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণে সরকার প্রতিবছর এর দাম বৃদ্ধিসহ শুল্ক্ক ও করহার বৃদ্ধি করছে।

মন্ত্রণালয়ের পত্রে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে তামাকের অবৈধ বাণিজ্যের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৮০০-১০০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। দেশের প্রত্যন্ত এলাকার বিভিন্ন কারখানায় গোপনীয়ভাবে সিগারেট তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া ব্র্যান্ডের সংখ্যা ৪০টি।

অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, সিগারেট খাতের রাজস্ব গুরুত্ব বিবেচনায় ও সিগারেটের ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় সিগারেটের গায়ে নকল ও পুনঃব্যবহূত ট্যাক্স স্ট্যাম্প লাগানো বন্ধ করতে বিজিবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও সীমান্তবর্তী জেলা প্রশাসনসহ সকল জেলা প্রশাসনকে যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখতে বলা হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের পত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর হয়ে সিআইডিতে আসে। এর পরই সিগারেটে জালিয়াতি রোধে তৎপর হয় সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াড। সিআইডি রংপুরের গঞ্জীপুর বাজার-সংলগ্ন স্প্যানিশ টোব্যাকো লিমিটেডসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চারটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়।

সিআইডির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, স্প্যানিশ টোব্যাকোতে অভিযান চালিয়ে ৭৫০ পিস নকল স্ট্যাম্প, দুইশ'টি পুনঃব্যবহূত ট্যাক্স স্ট্যাম্প পাওয়া গেছে। যার গায়ে লেখা রয়েছে 'জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, শুল্ক্ককর পরিশোধিত।' ওই প্রতিষ্ঠানে চারটি কার্টনে এক হাজার ৫৫০ প্যাকেট পুনঃব্যবহূত ট্যাক্স স্ট্যাম্পযুক্ত সিগারেট, ১৫০টি নকল ট্যাক্স স্ট্যাম্পযুক্ত সিগারেট পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে রংপুরের গংগাচড়া মডেল থানায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তারা হলেন কোম্পানির কর্ণধার আক্তারুল ইসলাম ভরসা, ডিজিএম রায়হান, রুম ইনচার্জ নুরুল আমিন ও স্টোর ইনচার্জ মো. খায়রুল।

সিআইডির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রংপুরের এসভি টোব্যাকো নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান জালিয়াতি করে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। ওই প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে তিন হাজার ৩৩০টি নকল স্ট্যাম্প, ২৫টি পুনঃব্যবহূত ব্যান্ডরোল ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নকল মনোগ্রাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ জালিয়াতিতে জড়িত থাকায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার সিরাজুল ইসলাম ভরসা ও ম্যানেজার আবুল মখদুমসহ কয়েকজনকে আসামি করে রংপুরের হাজিরহাট থানায় মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া রংপুরের নিউএজ ও নীলফামারীর এসআর টোব্যাকোর বিরুদ্ধে মামলা করেছে সিআইডি।

ঢাকা পশ্চিমের কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনার ড. মইনুল খান সমকালকে বলেন, 'নকল ব্যান্ডরোল ও পুনঃব্যবহূত ট্যাক্স স্ট্যাম্প যারা ব্যবহার করছে, তার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের সব বিভাগকে আরও তৎপর হওয়া জরুরি। কারণ রাজস্ব আয়ের একটি অন্যতম বড় খাত সিগারেট।'

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'সিগারেট খাতে যারা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কাউকে অবৈধভাবে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না।'

বিষয় : সিগারেট খাতে বড় কারসাজি