আবারও বড় সুযোগ পাচ্ছেন ঋণখেলাপিরা!

নীতিমালায় পরিবর্তন আসছে

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ওবায়দুল্লাহ রনি

মুখে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও ঋণখেলাপিদের জন্য আবারও বড় সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বিশেষ সুবিধায় পুনর্গঠিত ঋণও যাতে নতুন করে পুনঃতফসিল সুবিধা পায়, তার আয়োজন চলছে। খেলাপি ঋণের হিসাবায়নে শিথিলতা এবং পুনঃতফসিলে ডাউন পেমেন্ট কমানোর প্রস্তাবও বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে নানান ছাড় দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন করা হলেও খেলাপি ঋণ আদায় তেমন হয়নি, বরং বেড়েছে। নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে ঋণখেলাপিদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

সূত্র জানায়, খেলাপি ঋণ কমাতে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখতের নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে শিগগিরই এ-সংক্রান্ত নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি কাজ করছে। জায়েদ বখত কমিটির সুপারিশের ওপর অর্থ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামত নিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে কোনো নির্দেশনা দেবে, নাকি সামগ্রিক ব্যাংক খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দিতে বলা হবে, তা এখনও আলোচনার পর্যায়ে। আর এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ সমকালকে বলেন, ঋণখেলাপিরা সমাজ এবং সরকারে একটা শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। এখন তাদের ঠেকানো বেশ কঠিন। এসব খেলাপি অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রভাবিত করে সুবিধা নেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে। এ অবস্থায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে, পুনর্গঠিত ঋণ ১৫ বছর পর্যন্ত পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার জন্য একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ইব্রাহীম খালেদ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, এর মানে ঋণখেলাপিদের আমৃত্যু ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে হবে না।

নতুন সরকারে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয় নিয়ে সরব আ হ ম মুস্তফা কামাল। বিভিন্ন বৈঠকে তিনি বলেছেন, আগামীতে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না, বরং কমবে। এ ছাড়া ইচ্ছাকৃত খেলাপি হওয়া অসাধু ব্যবসায়ীদের সাবধান করেছেন তিনি। সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রীর এই হুঁশিয়ারির মধ্যেও ঋণখেলাপিদের সুযোগ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা আসতে যাচ্ছে পুনর্গঠিত ঋণসহ যে কোনো ঋণ পুনঃতফসিল এবং খেলাপি ঋণ হিসাবায়নে। এ ছাড়া ডাউন পেমেন্টের বর্তমান হারও কমানো হতে পারে। বর্তমানে কোনো ঋণ তিন মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ছয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সন্দেহজনক এবং নয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে মন্দমানে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়। প্রতি পর্যায়ে সময় বাড়িয়ে ছয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ১২ মাস মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ সন্দেহজনক এবং দেড় বছর মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তা মন্দমানে শ্রেণিকরণের প্রস্তাব করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি। এটি কার্যকর হলে খেলাপিরা বাড়তি সুবিধা পাবেন। ব্যাংকগুলো নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে বাড়তি সময় পাবে। এর আগে এক সময় এমন বিধান ছিল। তবে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইএমএফের পরামর্শে ২০১২ সালে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়।

নীতিমালা পরিবর্তনের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের দায়িত্বে ছিলেন এসকে সুর চৌধুরী। বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শক। জানতে চাইলে গতকাল তিনি সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খেলাপি ঋণ হিসাবায়ন ও পুনঃতফসিলের বিদ্যমান নীতিমালা বেশ কঠিন। খেলাপি হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ কমাতে নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।

সূত্র জানিয়েছে, ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালায় শিথিলতা এনে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার একটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে। বর্তমানে সব মিলিয়ে একটি মেয়াদি ঋণ সর্বোচ্চ তিনবারে ৩৬ মাসের জন্য পুনঃতফসিল করতে পারে ব্যাংকগুলো। আর প্রথমবার পুনঃতফসিলের জন্য ডাউন পেমেন্ট হিসেবে মোট বকেয়ার ১০ শতাংশ, দ্বিতীয়বার ২০ শতাংশ এবং তৃতীয়বার ৩০ শতাংশ দিতে হয়। তবে পুনঃতফসিলের মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতি পর্যায়ে ডাউন পেমেন্টের পরিমাণ কমানোর বিষয়ে ভাবছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে বিশেষ বিবেচনায় ডাউন মেপেন্ট ও মেয়াদের শর্ত শিথিল করে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৯৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। শুধু গত বছর পুনঃতফসিল করা হয় ২২ হাজার কোটি টাকার ঋণ। এর মধ্যে শেষ তিন মাসেই পুনঃতফসিল হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। এত পুনঃতফসিল হলেও ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যা এক বছর আগের চেয়ে ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা বেশি।

বিশেষ সুবিধা নিয়ে পুনঃতফসিলের পর জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণ দেখিয়ে নির্বাচনের পরপরই বড় ঋণ পুনর্গঠনের বিশেষ সুযোগ দিয়ে একটি নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে জারি করা নীতিমালায় ব্যাংক খাতে পাচশ' কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এমন ১১টি ব্যবসায়ী গ্রুপ ১২ বছরের জন্য ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ পায়। সুদহার কমানো, পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধি, ডাউন পেমেন্টের শর্ত শিথিলসহ নানা সুবিধা নিয়ে ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করে এসব প্রতিষ্ঠান। তবে দু-একটি ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠিত ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়ায় সুদে-আসলে পুনর্গঠিত ঋণে ব্যাংকগুলোর পাওনার পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এখন এসব ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে নতুন করে আবার সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

২০১৫ সালে পুনর্গঠন সুবিধা নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা পুনর্গঠন করে বেক্সিমকো গ্রুপ। এ ছাড়া সিকদার গ্রুপের এক হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা, যমুনা গ্রুপের এক হাজার ৬৮৫ কোটি, এননটেক্সের এক হাজার ৯৪ কোটি, এসএ গ্রুপের ৯২৮ কোটি, কেয়া গ্রুপের ৮৭৯ কোটি, রতনপুর গ্রুপের ৮১২ কোটি, থারমেক্স গ্রুপের ৬৬৬ কোটি, আবদুল মোনেমের ৫৭৭ কোটি, বিআর স্পিনিংয়ের ৫৭২ কোটি ও রাইজিং স্টিলের ৫২২ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালায় বলা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে পুনর্গঠন করতে হবে। আর পুনর্গঠন সুবিধা নেওয়া কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ নতুন করে পুনঃতফসিল করা যাবে না। যে কারণে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে পুনর্গঠিত ঋণ পুনঃতফসিলের একটি প্রস্তাব উঠলে তা নাকচ হয়ে যায়। অথচ সরকার এখন নতুন করে এসব ঋণ আবার দীর্ঘ মেয়াদে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবছে।

জানতে চাইলে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, নীতিমালায় কিছুটা শিথিলতা আনা হলে ঋণ আদায় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ আদালতে রিট দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।