কেলেঙ্কারিতে জড়িতরাই শীর্ষ ঋণখেলাপি

সংসদের তালিকা বিশ্নেষণ

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০১৯     আপডেট: ২৪ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ওবায়দুল্লাহ রনি

জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে কয়েকটি শিল্প গ্রুপ। ঋণের টাকা ফেরত না দিয়ে দেশের বাইরে পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে। গত শনিবার জাতীয় সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকার প্রথম দিকেই রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। সোনালী ব্যাংকের আলোচিত কেলেঙ্কারিতে জড়িত প্রতিষ্ঠান হলমার্ক রয়েছে এ তালিকায়। আরও আছে জনতা ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত এননটেক্স, ক্রিসেন্ট, বিসমিল্লাহ ও রানকা সোহেল গ্রুপ। বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ অনিয়মে অভিযুক্ত এসএ গ্রুপ অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপি। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে জড়িত প্রতিষ্ঠান এমারেল্ড ওয়েল, ডেল্টা সিস্টেমসের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে তালিকায়। বিশ্নেষণে দেখা যায়, ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোতেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সময়কার তদন্তে অসাধু ব্যাংকারদের সঙ্গে যোগসাজশে এসব প্রতিষ্ঠান ঋণের নামে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি আনিস এ. খান সমকালকে বলেন, ঋণের নামে কয়েকটি গ্রুপ বিপুল পরিমাণের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ায় ব্যাংক খাত ও ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে ব্যাংকের সুদহার, ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সব কিছুর ওপর প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, সংসদে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এটা এখন প্রতিষ্ঠিত বিষয়। এসব খেলাপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া  উচিত।

গতকাল রোববার খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে সরকারি মালিকানাধীন ছয় ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। পৃথক চিঠির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো- জনতা, অগ্রণী, রূপালী, সোনালী, বেসিক ও বিডিবিএল। চিঠিতে এসব ব্যাংকে অতিমাত্রায় খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে এর কারণ চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

গত শনিবার সংসদে প্রকাশিত ৩০০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ৭০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৫০ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা। এসব খেলাপি ঋণের বড় অংশই আটকে আছে কয়েকটি গ্রুপের হাতে। শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় রয়েছে এসএ গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে তালিকার শীর্ষে থাকা সামান্নাজ সুপার অয়েলের খেলাপি ঋণ রয়েছে এক হাজার ৪৯ কোটি টাকা। একই গ্রুপের মালিকানার এসএ অয়েল রিফাইনারি ও সামান্নাজ কনডেন্সড মিল্ক্কের নামে রয়েছে আরও ৮৩৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। চট্টগ্রাম ভিত্তিক এসএ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৪টি ব্যাংকের পাওনা রয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। যার অধিকাংশই এখন খেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, ভুয়া জামানত দিয়ে সক্ষমতার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে এসএ গ্রুপ। তবে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা ঋণের পরিমাণ ৬৮ কোটি টাকার কম হওয়ায় এসএ গ্রুপের অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় আসেনি। ২০১৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধায় দেশের এসএ গ্রুপ ৯২৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করলেও তার এক টাকাও পরিশোধ করেনি। ঋণখেলাপির মামলায় এসএ গ্রুপের কর্ণধার মো. শাহাবুদ্দিন আলমকে গত অক্টোবরে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ব্যাংকার-গ্রাহক যোগসাজশে জনতা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে কয়েকটি গ্রুপ। দেশের আলোচিত ঋণখেলাপি হিসেবে বিবেচিত এননটেক্স, ক্রিসেন্ট, বিসমিল্লাহ, রানকা সোহেল গ্রুপের ২৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায়। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে এননটেক্সের ১৮টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ পাঁচ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। ইউনুস বাদল নামে এক অখ্যাত ব্যবসায়ী এই গ্রুপের মালিক। সংসদে প্রকাশিত খেলাপির তালিকার দুই নম্বরে থাকা এননটেক্স গ্রুপের গ্যালাক্সি সোয়েটার্সের খেলাপি ঋণ ৯৮৪ কোটি টাকা। পর্যায়ক্রমে সুপ্রভ কম্পোজিট নিটের ৬১০ কোটি, সুপ্রভ স্পিনিংয়ের ৫৮২ কোটি, সিমরান কম্পোজিটের ৫৬৪ কোটি, সুপ্রভ রোটর স্পিনিংয়ের ৪৬৫ কোটি, জ্যাকার্ড নিট টেক্সের ৪৩০ কোটি টাকা। তালিকায় আরও আছে এই গ্রুপের এমএইচ গোল্ডেন জুট, লামিসা স্পিনিং, শবমেহের স্পিনিং, সুপ্রভ মেলাঞ্জ স্পিনিং, গ্যাট নিট টেক্স, জেওয়াইবি নিট টেক্স, জারা নিট টেক্স, স্ট্রিজার কম্পোজিট, আলভি নিট টেক্স, শাইনিং নিট টেক্স, সিমি নিট টেক্স ও এম নূর সোয়েটার্স।

ভুয়া রফতানিসহ নানা উপায়ে জনতা ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নেওয়ায় ব্যাংক খাতে আলোচিত ক্রিসেন্ট গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ তিন হাজার ১৫২ কোটি টাকা, যার চারটিই শীর্ষ ৫০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে তিন নম্বরে থাকা রিমেক্স ফুটওয়্যারের খেলাপি ঋণ ৯৭৬ কোটি টাকা। পর্যায়ক্রমে রূপালী কম্পোজিট লেদারের ৭৯৮ কোটি, ক্রিসেন্ট লেদারের ৭৭৬ কোটি, লেক্সকোর ৪৩৯ কোটি এবং ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৬৩ কোটি টাকা। অর্থ পাচারে শুল্ক্ক গোয়েন্দার মামলায় ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদের এখন জেলে। তার ভাই ও বাংলা সিনেমা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার এমএ আজিজ দেশ থেকে পালিয়েছেন।

জনতা ব্যাংকে ঋণ অনিয়মে জড়িত খেলাপি প্রতিষ্ঠান রানকা সোহেল কম্পোজিট টেক্সটাইল রয়েছে তালিকার ২৪ নম্বরে। প্রতিষ্ঠানটির ৪৪৯ কোটি টাকা এখন খেলাপি। একই মালিকের আরেক প্রতিষ্ঠান রানকা ডেনিমের খেলাপি ২২২ কোটি টাকা। এসব ঋণের টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। আর জনতাসহ কয়েকটি ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে দেশ ত্যাগ করা বিসমিল্লাহ গ্রুপের মালিকানাধীন আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস রয়েছে তালিকার ১৬ নম্বরে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা ৫২৩ কোটি টাকা। একই গ্রুপের বিসমিল্লাহর সাহারিশ কম্পোজিট নিটের খেলাপি ৩১৪ কোটি ও বিসমিল্লাহ টাওয়েলসের ২৪৪ কোটি টাকা।

শীর্ষ খেলাপির পাঁচ নম্বরে রয়েছে এবি ব্যাংকের আলোচিত গ্রাহক মাহিন এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮২৫ কোটি টাকা। আশিকুর রহমান লস্কর নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন এ প্রতিষ্ঠান ঋণের টাকা পানামা ও লাইবেরিয়ায় পাচারের অভিযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত করছে। দেশের এক সময়কার সেরা তথ্যপ্রযুক্তি আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার সোর্স রয়েছে তালিকার ১২ নম্বরে। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৭৫ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের গ্রাহক হলমার্কের ম্যাক্স স্পিনিং রয়েছে ১৪ নম্বরে। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ রয়েছে ৫২৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া হলমার্ক ফ্যাশনের খেলাপি ৩৪১ কোটি টাকাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তালিকায়।

বেসিক ব্যাংকের ঋণখেলাপি অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এ তালিকায়। এর মধ্যে সৈয়দ মাহবুবুল গনি ও সৈয়দ হাসিবুল গনি গালিবের মালিকানাধীন চার প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে শীর্ষ খেলাপির তালিকায়। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে- এমারেল্ড অয়েলের ১২১ কোটি, এমারেল্ড অটো ব্রিকসের ৮৫ কোটি, এমারেল্ড স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজ ৮৩ কোটি ও সৈয়দ ট্রেডার্স ৬৯ কোটি টাকার ঋণখেলাপি। বেসিক ব্যাংকের গ্রাহক ওয়াহিদুর রহমানের তিন প্রতিষ্ঠান রয়েছে তালিকায়। এর মধ্যে মা টেক্সের খেলাপি ১১১ কোটি, নিউ অটো ডিফাইন ১০২ কোটি ও ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ ৯৪ কোটি টাকার ঋণখেলাপি। নানা অনিয়মের কারণে ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালক পদ হারানো বাবুল চিশতীর ভাই মাজেদুল হক চিশতীর মালিকানার দ্য ওয়েল টেক্সের খেলাপি ১২৯ কোটি টাকা। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মুরশেদ মুরাদ ইব্রাহীমের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল স্টিলস অ্যান্ড শিপব্রেকিংয়ের খেলাপি ঋণ ১০৫ কোটি টাকা। এ ছাড়াও বেসিক ব্যাংকে অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত ডেল্টা সিস্টেমস, ম্যাপ পেপার বোর্ড মিলস, প্রোফিউশনস টেক্সটাইল, কনফিডেন্স সু, এ আর এস এন্টারপ্রাইজ, আরকে ফুড, টেকনো ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে তালিকায়। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ ঋণ অনুমোদন হয়েছে ভুয়া কাগজপত্রের বিপরীতে।