ভ্যাটের জাল বিস্তৃত হবে

হার হবে পাঁচটি

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০১৯     আপডেট: ০৮ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবু কাওসার

নতুন আইনে ভ্যাটের (মূল্য সংযোজন কর) হার করা হচ্ছে ৫টি। অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে ভ্যাটের জালও বিস্তৃত হবে। স্পর্শকাতর ও অত্যাবশকীয় পণ্যে নূ্যনতম হার নির্ধারণ করে ভ্যাট আইন সংশোধনের কাজ চূড়ান্ত করেছে সরকার। এ আইনে জনজীবনে প্রভাব ফেলে যেমন- ওষুধ, জ্বালানিপণ্য পেট্রোলিয়াম ও নির্মাণসামগ্রীর অন্যতম উপকরণ রড, বিভিন্ন জাতের মসলা, কাগজসহ বেশ কিছু পণ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় কম হারে ভ্যাট হার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। যাতে দাম সহনীয় থাকে। এতে সর্বনিম্ন ২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশসহ মোট ভ্যাটের হার হচ্ছে পাঁচটি। তবে ভ্যাটের আদর্শ বা স্ট্যান্ডার্ড রেট ১৫ শতাংশই বহাল থাকবে। বড় কোনো পরিবর্তন না করে বর্তমান ১৯৯১ সালের আইনের আদলেই নতুন আইনটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া কোন খাতে কত ভ্যাট বসবে সেটিও চূড়ান্ত হয়েছে। এখন শুধু বাস্তবায়নের অপেক্ষা। দুই বছর স্থগিত থাকার পর আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার কথা। ১৩ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, নতুন অর্থমন্ত্রীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নতুন আইনে ভ্যাটের জাল আরও বিস্তৃত হবে। বর্তমানে ১৯৯১ সালের আইনে নির্দিষ্ট খাতে (৩৯টি) প্রযোজ্য হারে 'উৎসে' ভ্যাট আদায় করা হয়। নতুন আইনে উৎসে ভ্যাট কর্তনের পরিধি ব্যাপক বাড়ানো হচ্ছে। এখন শুধু আমদানি পর্যায়ে বাণিজ্যিক পণ্যে (কমার্শিয়াল ইমপোর্টার) 'অগ্রিম' ভ্যাট (এটিভি) আদায় করা হয়। নতুন আইনে বাণিজ্যিকসহ সকল পণ্যে অগ্রিম ভ্যাট দিতে হবে। ফলে ভ্যাটের আওতা ব্যাপক বাড়বে। ভ্যাট বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আইনে যে রেটগুলো নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে দেখা যায়, মোট কর-ভার পণ্য ও সেবার মূল্যে গড়ে ২৭ শতাংশ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে, যা এখন আছে ২০ শতাংশ। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে ভ্যাট আহরণের ক্ষেত্রে করের ওপর কর বা 'দ্বৈত কর' ব্যবস্থা চালু হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তখন পণ্য ও সেবার খরচ বাড়বে। ফলে জনগণের ওপর করের বোঝা চাপবে বেশি।

ভ্যাট বিশেষজ্ঞরা এ আইনের সমালোচনা করে বলেন, অটোমেশনের পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়া এই আইন কার্যকর করা ঠিক হবে না। এখন পর্যন্ত ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের যে চিত্র, তাতে অটোমেশনের কাজ শেষ হতে অনেক সময় লাগবে, যা হয়েছে তাকে 'হাইব্রিড' সিস্টেম বলা যায়। কারণ, না অটোমেশন না ম্যানুয়াল- এমন পরিবেশের মধ্য দিয়ে আইনটি কার্যকর করতে যাচ্ছে সরকার, যা রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য উপযোগী নয়। যদিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া দাবি করছেন, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হলে জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়বে না।

সূত্র জানায়, নতুন আইনে ২, ৫, সাড়ে ৭, ১০ এবং ১৫ শতাংশ- এই পাঁচটি রেট নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। এনবিআর পর্যালোচনা করে দেখেছে ওষুধ, পেট্রোলিয়ামসহ বেশ কিছু পণ্য আছে, নতুন আইনে কার্যকর হলে ওই সব পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এসব পণ্যের দাম জনগণের ক্রয়ক্ষমতার  মধ্যে রাখতে নতুন করে বিশেষ ছাড় দিয়ে নূ্যনতম ২ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে।

এনবিআর সূত্র বলেছে, আগের মতোই বেশির ভাগ ভ্যাট আসবে ১৫ শতাংশ স্তর থেকে। ফলে আদায় কমবে না। বর্তমানে যারা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেন, রেয়াত বা ক্রেডিট পান তারা। নতুন আইনে একই নিয়মে ভ্যাট আহরণ করা হবে। এ স্তরে সাধারণত বড় ব্যবসায়ীরা ভ্যাট দেন এবং তারা রেয়াত পেয়ে আসছেন। ১৫ শতাংশের নিচের রেট বা স্তরে যারা ভ্যাট দেবেন, তাদের ক্ষেত্রে রেয়াত সুবিধা থাকবে না। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ভ্যাট আদায়ের এ পদ্ধতির তীব্র বিরোধিতা করে একে 'জগাখিচুড়ি' হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এ নিয়ম কার্যকর হলে পণ্য ও সেবায় অনেক ক্ষেত্রে করভার বাড়বে। কিছু ক্ষেত্রে কর আদায় কঠিন হবে। সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আয় ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

যোগাযোগ করা হলে ভ্যাট বিশেষজ্ঞ আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ও বেসরকারি সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সমকালকে বলেন, যারা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেবেন, শুধু তারাই রেয়াত পাবেন। এই শ্রেণি সাধারণত বড় ব্যবসায়ী। ফলে তারা প্রকৃত ভ্যাট সিস্টেমে থাকবেন। অপরদিকে, ১৫ শতাংশের নিচে অর্থাৎ ৫, সাড়ে ৭ ও ১০ শতাংশ হারে যারা ভ্যাট দেবেন তারা রেয়াত সুবিধা পাবেন না। আহসান মনসুরের মতে, এ পদ্ধতি প্রকারান্তরে আবগারি প্রথা চালু করার শামিল, যা ভ্যাট আইনের পরিপন্থী। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, এক পক্ষ রেয়াত পাবে, অন্য পক্ষ রেয়াত পাবে না। একই আইনে দুই পদ্ধতি চালু করা হলে ট্যাক্স অন ট্যাক্স বা করের ওপর কর (দ্বৈত কর) আরোপ করা হবে। তখন পণ্য ও সেবার খরচ বাড়বে, যা ভোক্তার ঘাড়ে এসে পড়বে। দুনিয়ার কোথাও এমন আইন নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। একজন ভ্যাট কমিশনার বলেন, আমরা এখন মধ্যম রাস্তায় আছি। যাওয়ার কথা মহাসড়কে। যাচ্ছি গলিতে। নতুন আইনের পরিবর্তে বর্তমান আইনকে আরও আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার কথা বলেন তিনি।

সূত্র জানায়, নতুন আইনে সেবার বেশির ভাগ খাত ১০ শতাংশ রেটে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। তবে সেবার অন্যতম খাত হোটেল ও রেস্টুরেন্টকে সাড়ে ৭ শতাংশে রাখা হতে পারে। এ ছাড়া উৎপাদনমুখী পণ্যগুলোকে ৫ শতাংশ স্তরে রাখা হতে পারে। বর্তমানে এসব পণ্যে ট্যারিফ ভ্যালু (নির্ধারিত) ভিত্তিতে এবং যতটুক মূল্য সংযোজন হয় তার ওপর (সংকুচিত) ভিত্তি করে বিশেষ ছাড় দিয়ে ভ্যাট আহরণ করা হয়। নতুন আইনে প্রচলিত প্রথা উঠিয়ে দিয়ে তার পরিবর্তে বাজার মূল্যের ওপর উল্লিখিত হারে ভ্যাট আহরণের প্রস্তাব করা হয়। নতুন আইনে ভ্যাটমুক্ত সীমা বার্ষিক ৫০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ৫০ লাখ ১ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের ৪ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দিতে হবে। এ ছাড়া আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ এবং স্থানীয় পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায়ের নিয়ম আগের মতো বহাল রাখা হয়। একই সঙ্গে সম্পূরক শুল্ক্ক এগারোটি স্তরের পরিবর্তে আটটি স্তর নির্ধারণ করা হয়। ভ্যাট কর্মকর্তারা সমকালকে জানান, নতুন আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে অব্যাহতি সীমা নির্ধারণ করা। কারণ কে ৫০ লাখ টাকা বিক্রি করবে, আর কে করবে না, তা নির্ধারণের কোনো মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। ফলে সৎ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অসৎরা আরও লাভবান হবেন।

জানা গেছে, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে এখন পর্যন্ত এনবিআর থেকে কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। অনলাইনে পরীক্ষামূলকভাবে রিটার্ন জমা দেওয়া শুরু হলেও বেশির ভাগই এ প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত নন। কারণ রিটার্নে কমপক্ষে ৬৪ ধরনের তথ্য দিতে হয়। এত বেশি তথ্য দিয়ে রিটার্ন পূরণ করতে ইচ্ছুক নন অনেকেই।

বিষয় : মূল্য সংযোজন কর ভ্যাট আইন বাজেট ভ্যাট