দরপতন: ব্যাংকগুলোকে শেয়ার কেনার পরামর্শ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০১৯     আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

শেয়ারবাজারের লাগাতার দরপতন ঠেকাতে এবার এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে শেয়ার কিনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে অর্থ বাজারের মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সূত্র জানায়, সোমবার থেকে এ পরামর্শ দেওয়া শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় দিনের লেনদেনের শুরুর আগেই এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর দায়িত্বশীল শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এর প্রভাবও দেখা যাচ্ছে আজকের শেয়ারবাজার লেনদেনে। যেখানে সোমবার লেনদেনের প্রথম ঘণ্টায় প্রধান সূচক ১০০ পয়েন্ট হারিয়েছিল, মঙ্গলবার লেনদেনের প্রথম ঘণ্টায়ই সূচক প্রায় ৬৫ বেড়েছে। লেনদেন হওয়া প্রায় ৩০০ শেয়ারের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশের দর বেড়েছে।

সোমবার অধিকাংশ শেয়ারের দরপতনে সূচকটি ৬৭ পয়েন্ট হারিয়ে ৪ হাজার ৯৬৬ পয়েন্টে নেমেছিল। এর আগে চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার সূচকটি প্রায় ৯৭ পয়েন্ট হারিয়েছিল।

নতুন করে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে দরপতন শুরু হয়েছে। এ সময়ে তালিকাভুক্ত ৯০ শতাংশের বেশি শেয়ার দর হারিয়েছে। এতে বাজার সূচক ১০০০ পয়েন্টের অধিক হারিয়েছে। সূচকের পতন হয়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। এমন দরপতনে অনেক শেয়ারের দর অর্ধেকে বা তিন ভাগের একভাগে নেমে এসেছে।

২০১০ সালের শেয়ারবাজারে ধস নামার পর গত সাড়ে আট বছরে থেমে থেমেই দরপতন চলছে। দরপতনের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কখনোই স্বস্তিতে ছিল না। দরপতনের বড় কারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ বাজারের প্রতি আস্থা নেই। কারসাজিসহ শেয়ারবাজারে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই এ অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অনাস্থা সৃষ্টির জন্য শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকেই দায়ী করছেন বিনিয়োগকারীরা।

তবে আর্থিক খাতের নানা সংকটের কারণেও শেয়ারবাজারে অর্থের প্রবাহ কমেছে। বড় বিনিয়োগকারীরা নিষ্ক্রিয়। বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে নেই।

২০১০ সালের ধসের পর ড. এম খায়রুল হোসেনকে চেয়ারম্যান করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি পুনর্গঠন করেছিল সরকার। কিন্তু গত আট বছরে সংস্থাটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো বিএসইসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই অনিয়মের অভিযোগ আছে। বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি বিএসইসির নাগালের বাইরে। দিনে দিনে দরপতন যে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, তা সামাল দিতে এ সংস্থা কোনোই ভূমিকা রাখতে পারবে না, তা প্রমাণিত।

রাষ্ট্রিয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি শেয়ার কিনে দরপতন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু একা এক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পুরো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তার সামর্থের সীমাবন্ধতা আছে, অঢেল টাকা নেই।

বাংলাদেশের ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, অন্তত ১৮টি ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর চাইলে বড় অংকের বিনিয়োগ করতে পারে।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন করে শুরু হওয়া দরপতনের প্রেক্ষাপটে শেয়ারবাজারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সুবিধা বাড়াতে আইন কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল। শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সীমায় ছাড় দেওয়ার ফলে অন্তত ১৮টি ব্যাংকের বাড়তি দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সুযোগ দেওয়ার পরও গত কয়েক মাসে ব্যাংকগুলো থেকে কোনো বিনিয়োগ আসেনি।

বাংলাদেশের ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, এতদিন ব্যাংকগুলো বলে আসছিল, তারা শেয়ারে বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু আইনের কারণে বিনিয়োগ করতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক আইনি ছাড় দিয়ে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে, অথচ এখন তারা কেন সুযোগটি নিচ্ছে না তা বোধগম্য নয়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি এমনও নয়, শেয়ারদর অতিমূল্যায়িত। বরং গত কয়েক মাসের লাগাতার দরপতনে অনেক শেয়ার যৌক্তিক মূল্যের অনেক নিচে। এখনই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার সময়, বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের সেই পরামর্শই দিচ্ছে।

শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, বাজারে ব্যাপক তারল্য সংকট রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে নতুন করে বিনিয়োগের অর্থ নেই। যাদের কিছু এখনও যৎসামান্য অর্থ আছে, তারা বিনিয়োগ করে আস্থা পাচ্ছেন না। অনেক শেয়ারের দর তলানিতে নামলেও পর্যাপ্ত ক্রেতা নেই। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ বেশ ফল দেবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কিছুটা আশ্বস্ত করবে।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান জানান, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে এমন কিছু হয়নি যাতে দরপতন মাত্রা ছাড়াতে পারে। এখনকার দরপতন অযৌক্তিক, স্রেফ গুজবে বা দরপতনের ভীতি থেকে একজনকে শেয়ার বিক্রি করতে দেখে অন্যরাও বিক্রি করছে। লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে নিজের ক্ষতি না করার এবং ধৈর্য ধারণের জন্য বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দেন তিনি।