পুঁজিবাজারে কারসাজি বন্ধে বিশেষ কমিটি হচ্ছে

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

বিশেষ প্রতিনিধি

সোমবার শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ছবি: সংগৃহীত

পুঁজিবাজারে কারসাজি বন্ধে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ ছাড়া বাজার চাঙ্গা করতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়া হবে বলে জানান তিনি। সোমবার শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। 

দ্রুত শিল্পায়ন বিকাশে দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, যেভাবেই হোক এই বাজারকে শক্তিশালী করতেই হবে। এ জন্য যা কিছু করা দরকার সরকারের পক্ষ থেকে তা করা হবে। বৈঠকে এ বিষয়ে সবাই ঐকমত্য পোষণ করেছেন বলে জানান তিনি। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার ম্যারাথন এ বৈঠকে পুঁজিবাজার উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ড. খায়রুল হোসেনসহ পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ভালো কোম্পানির শেয়ার ছাড়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আরও সক্রিয় হওয়ার দাবি জানান অংশীজন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অনেক কোম্পানির শেয়ার অতিমূল্যায়িত। আবার দেখা গেছে, ফ্যাক্টরি বন্ধ হলেও শেয়ার কেনাবেচা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, যে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকে সেই কোম্পানির শেয়ার লেনদেন কীভাবে হয়। মন্ত্রী আরও বলেন, বিশেষ কমিটির কাজ হবে কারা অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করে লেনদেন করছে, তাদের খুঁজে বের করা। এসব অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্তদের শনাক্ত করা। এর পর আইন অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুস্তফা কামাল আরও বলেন, অনেক কোম্পানির ব্যালান্স শিটে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে। এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখবে কমিটি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএসইসির একটি অভ্যন্তরীণ অডিট বিভাগ গঠনের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) সহযোগিতায় বিএসইসিতে এটি চালু করা হবে। 

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএসইসি প্রস্তাবিত কমিটি গঠন করবে। তবে ওই কমিটিতে কারা থাকবেন সে বিষয়টি পরিস্কার করেননি তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সবাই বলেছেন বাজারে ভালো কোম্পানির ঘাটতি আছে। তাদের সঙ্গে একমত। এ জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে ভালো কোম্পানির শেয়ার ছাড়া হবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়া হবে। এসব পদক্ষেপ নিলে বাজারে গতি ফিরে আসবে। মুস্তফা কামাল কঠোর ভাষায় বলেন, যারা কারসাজি করে শেয়ারের দাম বাড়াবে, তাদের ক্ষমা করা হবে না। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। ন্যায্য বিচার হলে বাজারে আস্থার যে সংকট চলছে তা দূর হবে।

শেয়ারবাজারকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক এলাকা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা এই বাজারকে অবহেলা করতে পারি না। কারণ এর সঙ্গে সমাজের উঁচু থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণ জড়িত। তাদের রক্ষা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। এ জন্য শেয়ারবাজার উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে বর্তমান সরকার। তিনি জানান, এর মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

বৈঠক শেষে এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, শেয়ারবাজার চাঙ্গা করার লক্ষ্যে অনেক কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও দেওয়া হবে। বিদেশি কোম্পানি দেশ থেকে যাবে না বলে মনে করেন তিনি। তাদের জন্য আরও সুবিধা দেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি আজিজুল ইসলাম বলেন, বাজারে ভালো দেশি-বিদেশি কোম্পানির শেয়ার ছাড়তে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, শেয়ারবাজার পরিচালনায় সর্বত্র সুশাসনের অভাব আছে। যেসব কোম্পানি বাজারে আসছে, সেগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারসাজিরও অভিযোগ বিস্তর। দু-একটি ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যার কারণে দোষীরা আরও কারসাজিতে উৎসাহিত হয়। এসব ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে বাজার কখনও স্থিতিশীল হবে না। অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও এ বাজার খুব বেশি অবদান রাখতে পারবে না। ভালো শেয়ার আনা নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে সরকারকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান শেয়ারবাজারের পক্ষে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ব্যাসেস থ্রি বাস্তবায়ন হলে তা শেয়ারবাজারে কোনো সংকট তৈরি করবে না। শেয়ারবাজারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কী করবেন- গভর্নরের প্রতি অর্থমন্ত্রীর এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিডিবিএল বন্ড ছাড়লে তা কিনে অর্থ দেওয়া হবে, যাতে শেয়ারবাজারে নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারে।

বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, ২০১১ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বাজারকে সুষ্ঠু ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। প্রয়োজন অনুযায়ী বহু আইনের সংশোধন করা হয়েছে। যে কোনো সংকটে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে বাজার পরিচালনা করছেন তিনি।

ঢাকা স্টক এপচেঞ্জের (ডিএসইর) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, নানা কারণে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তীব্র। বিনিয়োগকারীরা দেখেন, আইপিওতে আসা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনই ঠিক নেই, তখন তারা বিনিয়োগ ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েন। বিষয়টির সুরাহা না করে শেয়ারবাজারের চলমান সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না।

সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধি ও রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সিইও হাসান ইমাম বলেন, অনেকে বর্তমানের শেয়ারবাজারের দরপতনের জন্য আইপিওকে দায়ী করেন। বাস্তবে বাজারের খারাপ অবস্থার জন্য আইপিও এক শতাংশও দায়ী নয়। বড় মূলধনি কোম্পানিগুলোর বাজার খারাপ। গ্রামীণফোনের কাছে বিইআরসির কর দাবি, পিপলস লিজিংয়ের অবসায়নের খবর বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

আইপিওতে আসা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে জানিয়ে নিরীক্ষকদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফআরসির চেয়ারম্যান সিকিউকে মুস্তাক আহমেদ বলেন, আইপিওর মাধ্যমে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হলে শেয়ারবাজার নিয়ে ভালো কিছু আশা করা যাবে না।

চট্টগ্রাম স্টক এপচেঞ্জের (সিএসই) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়ালি-উল মারুফ মতিন বলেন, গ্রামীণফোনের কাছে সাম্প্রতিক সময়ে টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির বড় অঙ্কের কর দাবি করার পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটি থেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন। এজন্য অর্থমন্ত্রীকে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানান তিনি।

বিএসইসির কমিশনার হেলাল উদ্দিন নিজামী বলেন, আইপিও নিয়ে অনেক কথা হলেও বাস্তবতা হচ্ছে কমিশন কোনো আইপিওর আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যের সত্যতার নিশ্চয়তা দেয় না, পৃথিবীর কোনো দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাই এ দায়িত্ব নেয় না। এখানে ডিসক্লোজার ব্যাসিস (প্রকাশিত তথ্য) আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিশন কাউকে আইপিও কিনতে বাধ্য করে না। আইপিও নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও আইপিও শেয়ার কিনতে বহুগুণ বেশি আবেদন জমা পড়ছে, অর্থাৎ আইপিওতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও আগ্রহ আছে। আইপিও শেয়ার কিনে এখন পর্যন্ত কেউ লোকসান করেনি।

এক বক্তা বন্ধ ও অস্তিত্বহীন কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অর্থমন্ত্রী বিএসইসিকে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন। ওই কমিটি জেড গ্রুপের ও বন্ধ কোম্পানির প্রকৃত অবস্থা জেনে প্রতিবেদন দিলে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেছেন মন্ত্রী।

বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুর রহমান পাটোয়ারি বলেন, অতালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া বহুজাতিক মেটলাইফকে শেয়ারবাজারে আনতে চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএ সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, ব্যাংকগুলো যতদিন স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণ করবে, ততদিন খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ হবে না। দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য শেয়ারবাজারে আসার উদ্যোগ নিতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, ভালো শেয়ারের সরবরাহ নিশ্চিত না করে কখনোই কোনো শেয়ারবাজার ঠিক করা সম্ভব নয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। এ সময় অর্থমন্ত্রী জানতে চান, আপনি যদি অর্থমন্ত্রী হতেন, তাহলে আগামীকাল কী করতেন- এমন প্রশ্নে আবু আহমেদ বলেন, আগামীকালই আমি সরকারি লাভজনক কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আনতাম। এগুলো কেন আসছে না, ওইসব কোম্পানির এমডিদের নিয়ে বসতাম। ওইসব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতাম।