শেয়ারবাজার বড়ই বেহাল

সংকটের প্রধান কারণ সুশাসনের অভাব

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আনোয়ার ইব্রাহীম

শেয়ারবাজারে থেমে থেমে চলছে দরপতন। অবস্থা বড়ই বেহাল। এক পা এগোচ্ছে তো দুই পা পেছাচ্ছে। মুনাফার আশায় কষ্টার্জিত সঞ্চয় লগ্নি করে মূলধন হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যতই বিনিয়োগ করছেন, দরপতনের কারণে তাদের পুঁজি অতলগহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ভয়াবহ ধস নামার পর থেকে ৯ বছর ধরে বাজার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। বাজার-সংশ্নিষ্ট ও বিনিয়োগকারীদের ভাষায়, শেয়ারবাজার এখন এক বিশাল 'ব্ল্যাক হোল'। কেউ বলতে পারছেন না, বাজারের এই বেহাল পরিস্থিতি কাটবে কবে।

সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া দরপতন গতকাল রোববার পর্যন্ত টানা ছয় দিনে গড়িয়েছে। এ সময়ে ৯০ শতাংশের বেশি শেয়ারের দর কমায় বাজার মূলধন (কোম্পানিগুলোর সব শেয়ারের মোট বাজারমূল্য) হারিয়েছে আট হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, বাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স হারিয়েছে ১৬৬ পয়েন্ট। অথচ এর আগের তিন সপ্তাহের দর বৃদ্ধিতে বাজার মূলধন বেড়েছিল তিন হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা এবং সূচক বেড়েছিল ১০৩ পয়েন্ট।

বাজার-সংশ্নিষ্টরা জানান, দরপতনের কারণে প্রতিনিয়ত পুঁজি হারিয়ে গত আট বছরে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন। নতুন যারা আসছেন, তারাও টিকতে পারছেন না, লোকসান করে এদেরও অনেকে নিষ্ফ্ক্রিয়। গত কয়েক বছরে কেউ মুনাফা করেছেন এমন বিনিয়োগকারী খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

এ সংকটাবস্থার জন্য বাজার-বিশ্নেষক ও গবেষকরা প্রধানত তিনটি কারণকে দায়ী করছেন। প্রথমত, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ৮০ শতাংশের বেশি মানহীন এবং নতুন করে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত করেনি। দ্বিতীয়ত, এ বাজারে প্রকৃত বিনিয়োগকারী,  বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নেই। ব্যক্তি বিনিয়োগকারী থেকে প্রতিষ্ঠান- সকলে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ করছে। কেউই বিশ্নেষণনির্ভর বিনিয়োগে নেই। তৃতীয়ত, দায়িত্বশীল পদে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য লোক নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, এখানে ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংকসহ সব স্টেকহোল্ডার কেবল নিজেদের স্বার্থটাই দেখে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে সুশাসন নেই। মালিকরা বেনামে শেয়ার ব্যবসা করছে। তারা ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দিচ্ছে। অনেক অডিট প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় কেউ আর্থিক প্রতিবেদনে বিশ্বাস রাখতে পারছে না। অথচ বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এটাই প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এ অবস্থায় কোনো বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করবে না। আবু আহমেদ বলেন, আসলে স্টক এক্সচেঞ্জ বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি দায়িত্বশীল হতো, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএর সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, যে বাজারে ভালো পণ্য বিক্রি হয় না, সেই বাজারে ভালো ক্রেতাও থাকে না। শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রেও একই কথা। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ভালো কোম্পানির শেয়ার আনার কথা বলছি, কিন্তু ভালো কোম্পানি আসছে না। যেগুলো আসছে, সেগুলো কি মূলধন সংগ্রহের জন্য আসছে, নাকি সেগুলোর মালিকরা শেয়ার ব্যবসা করে টাকা হাতিয়ে নিতে আসছেন- এ প্রশ্ন এখন অনেকের।

একই কথা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমনের। তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত হতে আসা কোম্পানিগুলোর মূলধন তালিকাভুক্তির মাত্র দুই বছর আগে রাতারাতি ৫ থেকে ৫০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এই যে মূলধন বাড়ল, সে ক্ষেত্রে প্রকৃত বিনিয়োগ হয়েছে কি-না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তথ্য-প্রমাণ বলছে, বিনিয়োগ না করেই শেয়ার ইস্যু হচ্ছে। টাকাবিহীন ওই শেয়ারের একটা অংশ মালিকরা নিচ্ছেন, বাকিটা প্লেসমেন্ট শেয়ার হিসেবে বিক্রি করছেন। তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যে মালিকরা শেয়ার বিক্রি করে ভাগছেন। এরপর কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তালিকাভুক্তির পর যে কোম্পানির শেয়ারদর ৪০ টাকা হয়েছিল, সেগুলো চার টাকায় নেমে এসেছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পথে বসলেও পুরোটাই লাভ এসব কোম্পানির মালিকদের।

ডিএসইর এ পরিচালক বলেন, এই যে ক্ষতি, তার পুরোটা সাধারণ মানুষের। এভাবে তারা বছরের পর বছর ঠকছেন। মালিকদের শেয়ার চলে যাচ্ছে জুয়াড়িদের হাতে। বন্ধ বা রুগ্‌ণ কোম্পানির শেয়ারদর কারণ ছাড়া হুটহাট বাড়ছে। এ কারণে এখন সহজে বিনিয়োগ করতে চান না। প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগ করার মতো ভালো শেয়ার কম, এমনকি ভালো পরিবেশও নেই।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনালের ব্যবসায় অনুষদ বিভাগের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মূসা বলেন, দেশের শেয়ারবাজার পেশাদার বিনিয়োগকারীদের হাতে নেই। জুয়াড়ি ও ব্যক্তিশ্রেণি নির্ভরতা এ বাজারের বড় দুর্বলতা। তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্য সব দেশে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগই শেয়ারবাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ হয় পেশাদার, অভিজ্ঞ এবং যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দ্বারা। লেনদেনের ৮০ ভাগের বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকে এদের হাতে, যারা আবেগে বা কানকথায় বিনিয়োগ করেন না বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারও করেন না। বাংলাদেশে এ ধারা নেই বললেই চলে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শ্রেণির সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃত বিনিয়োগ ধারায় বাজারকে আনার কোনো প্রচেষ্টাই এখানে নেই।

শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউস ব্র্যাক ইপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেরিফ এম রহমান জানান, গুটিকয় ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর বাইরে শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে চুলচেরা বিশ্নেষণ করেন। কোম্পানির আর্থিক অবস্থার বাইরে মালিকদের বিষয়েও খোঁজখবর নেন। এ বিচার-বিশ্নেষণ করে ৯০ শতাংশ শেয়ারকে বাতিল করে দেন। বছরের পর বছর একই শেয়ারে বিনিয়োগ করে তারা টায়ার্ড। নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো ভালো শেয়ার না পাওয়ায় অনেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন।

ভালো শেয়ারের সংকটের কারণে এখানে ভালো বিনিয়োগকারী আসছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শ্রেণি তৈরি হয়নি। পৃথিবীর অন্য সব দেশে মিউচুয়াল ফান্ড বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে। ফান্ডগুলো বিনিয়োগে সম্পূর্ণ পেশাদারিত্ব নিয়ে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে পেশাদারিত্বের লেশমাত্র নেই। এমন পরিস্থিতিতে একটা ভালো বাজার আশা করা দুরূহ।

সামগ্রিক হতাশাজনক পরিস্থিতির জন্য সর্বক্ষেত্রে সুশাসনের অভাবকেই বড় কারণ বলে মনে করেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়ালি-উল মারুফ মতিন। তিনি সমকালকে বলেন, সমস্যা হচ্ছে, শেয়ারবাজার বিষয়ে ভালো ধারণা রাখেন এমন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির অভাব বাজারে সর্বত্র। স্টক এক্সচেঞ্জে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে ডিমিউচুয়ালাইজেশন করা হয়েছিল। কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জ তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। আইন সংশোধনের মাধ্যমে এটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা সরকারের নীতিনির্ধারণী সবখানেই একই অবস্থা। তিনি বলেন, ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বহু পদক্ষেপ সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিয়েছে, অনেক আইনের সংস্কার হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ কিছুই হয়নি। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের এ বাজারের প্রতি আস্থা নেই।

২০০৯-১০ সালে শেয়ার কারসাজির ঘটনায় সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সুশাসন না থাকলে যা হয়, তার পরিণতি ভোগ করছে শেয়ারবাজার। তিনি বলেন, সব সংকটের সুরাহা করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার গুরুদায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির। কিন্তু সংস্থাটি এ ক্ষেত্রে তা পারছে না। ভালো কোম্পানি এ বাজারে না এলে ভালো বিনিয়োগকারীও আসবেন না। আর এ দুইয়ের অভাব থাকলে কখনও কোনো শেয়ারবাজারেই স্বাভাবিক ধারা আসতে পারে না।

শেয়ারবাজারে আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। তার আগে মন্দ কোম্পানিকে সরিয়ে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।