দাম লাগামহীন

পেঁয়াজের সেঞ্চুরি

অস্থিরতা সৃষ্টি করলে ব্যবস্থা : বাণিজ্য সচিব

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মিরাজ শামস

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পেঁয়াজের দাম লাগামহীন। কাঁচাবাজারে এক কেজি পেঁয়াজের দাম সেঞ্চুরি ছাড়িয়েছে। গতকাল সোমবার এক দিনের ব্যবধানেই পণ্যটির দাম এক লাফে কেজিতে বেড়েছে ৪০ টাকা। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই দেশে অসাধু ব্যবসায়ীরা অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ালেন। গতকাল রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ১১০ থেকে ১২০ টাকা ও আমদানি করা পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১১০ টাকায় কিনেছেন ক্রেতারা।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দু'সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৭০ টাকা। ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণে বাজারে সব ধরনের পেঁয়াজে চড়া দাম দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের স্থানীয় বাজার নিয়ন্ত্রণে নূ্যনতম রফতানি মূল্য ৮৫০ ডলার বেঁধে দেয় দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর। এ ঘোষণার পর ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। ওই সময়ে কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে দেশি পেঁয়াজ ৮০ ও ভারতীয় পেঁয়াজ ৭০ টাকায় বিক্রি হয়। সম্প্রতি ভারতের স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত রোববার প্রতিবেশী দেশটি পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে গতকাল দেশের বাজারে কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে দেশি পেঁয়াজ ১২০ ও আমদানি পেঁয়াজ ১১০ টাকায় উঠেছে। এ ছাড়া ঈদুল আজহার আগেই নানা কৌশলে বাজারে প্রথম দফায় পেঁয়াজের দাম বাড়ান ব্যবসায়ীরা। গত ৭ জুলাই কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে দেশি পেঁয়াজ ৫০ ও ভারতীয় পেঁয়াজ ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়। এর একদিন আগেও দেশি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ ও ভারতীয় পেঁয়াজ ২৮ থেকে ৩০ টাকা ছিল।

দাম আরও বাড়তে পারে- এ আশঙ্কায় গতকাল ঢাকার বাজারে ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। অনেকে বেশি বেশি করে কিনেছেন। এ সুযোগ নেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এদিকে বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দীন হুঁশিয়ার করেছেন, কেউ পেঁয়াজের মজুদ করে বাজার অস্থির করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি বাড়িয়েছে টিসিবি। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, আমদানি করা পেঁয়াজের সরবরাহ সংকটে দাম বেড়েছে। তবে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে পেঁয়াজের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক মনে করছে সরকার ও ক্রেতারা।

গতকাল রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর বাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা জিয়াউর রহমান বলেন, পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার খবরে ক্রেতারাও বেশি কিনছেন। একজন ক্রেতা গতকাল সকালে পাঁচ কেজি কিনেছেন। ওই ক্রেতা দুপুরে আরও ১০ কেজি নিয়ে গেছেন।

দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও বহুগুণ বেড়েছে। অন্যদিন দুই বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি করলেও গতকাল ছয় বস্তা বিক্রি করেছেন। এই বাজারের শ্রীরাম ভান্ডারের পাইকারি ব্যবসায়ী কানাই লাল সাহা বলেন, কাঁচামালের দাম বাড়লে কেনাবেচা বেশি হয়। এ বাজারে প্রতিদিন ২০০ বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি হলেও গতকাল ৫৫০ থেকে ৬০০ বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। উত্তর পীরেরবাগ বাজারের দোকানি জসিম উদ্দিন জানান, এখন দেশি পেঁয়াজ ১২০ ও ভারতীয় পেঁয়াজ ১১০ টাকা কেজি। এই পেঁয়াজ রোববার সকালেও যথাক্রমে ৮০ ও ৭০ টাকায় বিক্রি করেছেন। গতকাল পাইকারি বাজার থেকে এই পেঁয়াজ দ্বিগুণ দামে কিনেছেন বলে জানান তিনি।

গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও পুরান ঢাকার শ্যামবাজার আড়তে পাইকারি প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১০৫ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ৯০ থেকে ৯৫ ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হয়। এই আড়তগুলোতে মিয়ানমারের পেঁয়াজ আলাদা দামে তেমন বিক্রি হয়নি। সবই ভারতীয় বলে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। গত রোববার সকালে শ্যামবাজারের পাইকারি আড়তে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৫৮ থেকে ৬০ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ৫৪ থেকে ৫৫ ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫২ টাকা কেজি ছিল। এ হিসাবে পাইকারিতে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এই পেঁয়াজ আমদানিতে বাড়তি মূল্য না দিয়েই কেজিতে ৪০ টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করছেন ব্যবসায়ীরা।

শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী ও পেঁয়াজ আমদানিকারক রতন সাহা সমকালকে জানান, ভারত রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ফলে আমদানির বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা পেঁয়াজ শিপমেন্ট বন্ধ হয়ে যায়। এতে সরবরাহ ঘাটতির আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে বাজারে পেঁয়াজ থাকলেও পাইপলাইনে তেমন নেই। ফলে আগামী দিনে আরও সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ, মিসর ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আসতে সময়ের প্রয়োজন হবে। এ সময়ের মধ্যে ভারত পেঁয়াজ রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে আমদানি করে বিপাকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতীয় পেঁয়াজ আসা শুরু হলে মিসর ও তুরস্কের পেঁয়াজের চাহিদা কমায় দামও কমে যায়। এ কারণে ঝুঁকি নিয়ে আমদানি করতে চান না ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে দুই দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তি করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দ্রুত আমদানির ফলে সংকটের সমাধান সম্ভব।

মিয়ানমারের পেঁয়াজ ভারতীয় নামে বেশি দামে বিক্রি :বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় মিয়ানমার থেকে কম দামে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে মিয়ানমারের এই পেঁয়াজ ভারতীয় বলে চড়া দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। কারওয়ান বাজারে মিয়ানমারের পেঁয়াজ ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা যায়। শ্যামবাজারে এই পেঁয়াজ ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই পেঁয়াজ খুচরায় ১১০ টাকা কেজিতে কিনছেন ক্রেতারা। অথচ মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম পড়ছে ৪০ টাকা কেজি।

কারসাজি করলে ব্যবস্থা নেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় :বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন গতকাল মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করায় উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুদ আছে। পাশাপাশি মিয়ানমার, তুরস্ক ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে টিসিবির ট্রাক সেল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া পেঁয়াজের সরবরাহ, বাজারদর পর্যবেক্ষণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০টি মনিটরিং টিম গঠন করেছে। এসব টিম দেশের যেসব অঞ্চল থেকে বেশি বেশি পেঁয়াজ সরবরাহ হয় এবং পাইকারি বাজারগুলো মনিটর করবে। একই সঙ্গে কোথাও কোনো পক্ষ পেঁয়াজের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করলে বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে এসব টিম।

বাণিজ্য সচিব বলেন, ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন ছয় হাজার টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। দেশের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল বৃহত্তর ফরিদপুর, পাবনাসহ সারাদেশে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় তিন লাখ টন পেঁয়াজ চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছে মজুদ আছে, যা দিয়ে আগামী ৫০ থেকে ৫৫ দিন দেশের পেঁয়াজের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ সময়ের মধ্যে দেশে নতুন পেঁয়াজ বাজারে চলে আসবে। ফলে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতার কোনো কারণ নেই।

সচিব আরও বলেন, এসব মজুদ পেঁয়াজ যাতে স্বাভাবিকভাবে বাজারে সরবরাহ করা হয় এবং বাজারের কোনো পক্ষ যাতে কারসাজি করতে না পারে, সে জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তদারকি টিমগুলো কাজ করবে। পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট জেলার ডিসিরাও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন। মনিটরিং টিমগুলো রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। ফলে আশা করা যাচ্ছে, পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক থাকবে। সচিব বলেন, দেশে পেঁয়াজের দর নির্ধারণ হয় আমদানি মূল্যের ওপর। আমদানি মূল্য বেড়ে যাওয়ায় দাম বেড়েছে। তবে তা কোনোভাবেই অস্বাভাবিক পর্যায়ে যেতে দেওয়া হবে না।

টিসিবির পেঁয়াজের কেজি ৪৫ টাকা :দুর্গাপূজা সামনে রেখে বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশে ট্রাকে করে পেঁয়াজসহ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রিতে নেমেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।

বাণিজ্য সচিব জানান, এত দিন রাজধানীতে ১৬টি ট্রাকে টিসিবি পেঁয়াজ বিক্রি করত। কাল (মঙ্গলবার) থেকে ৩৫টি ট্রাকে করে ৪৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করা হবে। টিসিবি কত দিন পেঁয়াজ বিক্রি করবে- জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব বলেন, বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী বিক্রি করা হবে। যত দিন বাজার স্বাভাবিক না হচ্ছে, তত দিন এই বিক্রি চলবে।

ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে এসব পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করা হবে বলে টিসিবির প্রধান তথ্য কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন। তিনি বলেন, টিসিবি নির্ধারিত স্থানগুলোতে ট্রাক থেকে জনসাধারণ কেজিপ্রতি পেঁয়াজ ৪৫ টাকায়, চিনি ও মশুর ডাল ৫০ টাকা ও সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ৮৫ টাকায় কিনতে পারবেন। বিজ্ঞপ্তিতে টিসিবি জানিয়েছে, একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই কেজি পেঁয়াজ, চার কেজি চিনি, চার কেজি ডাল ও পাঁচ লিটার সয়াবিন তেল কিনতে পারবেন। গতকাল বাজারে চড়া দাম থাকায় ন্যায্যমূল্যে টিসিবির পেঁয়াজ কিনতে ভিড় করেছে সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করে ৪৫ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ কিনছেন তারা। রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে ও ফার্মগেটে টিসিবির পণ্য কিনতে লম্বা লাইন দেখা গেছে।

ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির সমকালকে বলেন, দেশি এবং আগে কম দামে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কারসাজি করে দাম বাড়িয়েছেন। এটা অতি মুনাফার লোভে করছেন তারা। পেঁয়াজের দাম নিয়ে অস্থিরতা বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, টিসিবির এত কম সক্ষমতা নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাটিকে আরও শক্তিশালী করা উচিত। পাশাপাশি বাজার স্বাভাবিক রাখতে অভিযান জোরদার করতে হবে। ক্রেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পেঁয়াজ পরিমিত কেনা উচিত। যাতে বাজারে অস্থিরতা তৈরি না হয়। কারণ, পেঁয়াজের বাড়তি এ দাম থাকবে না।