ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইনে মৃত্যুফাঁদ

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সবুজ ইউনুস

গত ১ নভেম্বর সমকালের পৃষ্ঠা ১০-এ একটি খবর ছাপা হয়। শিরোনাম ছিল 'বিদ্যুৎস্পর্শে চাচা-ভাতিজাসহ চার জেলায় পাঁচজনের মৃত্যু'। গত ৫ নভেম্বর সমকালের ১৯-এর পাতায় এরকম আরও একটি খবর ছাপা হয়। শিরোনাম 'বিদ্যুৎস্পর্শে মা-ছেলেসহ তিনজনের মৃত্যু'। সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো জাতীয় দৈনিকের প্রথম বা শেষ পাতায় ছাপার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একদিনে বিদ্যুৎস্পর্শে পাঁচজন সাধারণ মানুষ মারা গেলেও খবরটিকে ততটা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়নি। এর মূল কারণ এরকম ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটছে। ফলে এসব খবর এখন কোনো জাতীয় দৈনিকে আর তেমন গুরুত্ব পায় না। ছাপা হয় ভেতরের পাতায়। যেভাবে সাধারণ কোনো সড়ক দুর্ঘটনার খবর ছাপা হয়।


সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে দেশে বেশ কয়েকটি সংস্থা গবেষণা করে। সেখানে এ বিষয়ে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। কিন্তু বিদ্যুৎস্পর্শের দুর্ঘটনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য তেমন গবেষণা নেই। ফলে পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকেই পরিসংখ্যান নিতে হয়। সমকালে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা গেছে ৩৭ জন। ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে ২০১৭ সালে মারা গেছে ৩৬৪ জন।

বিশ্নেষকরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনার মতো প্রতিদিনই বিদ্যুৎস্পর্শে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। এ বিষয়ে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে মৃত্যুর হার সড়ক দুর্ঘটনাকে ছাপিয়ে যাবে। ২০২১ সালের মধ্যে সারাদেশের ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেওয়ার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। দ্রুতগতিতে বিদ্যুতের লাইন সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০০৯ সালে সারাদেশে বিদ্যুৎ গ্রাহক ছিলেন এক কোটি ৮ লাখ। চলতি বছর গ্রাহক সংখ্যা তিন কোটি ৫১ লাখ। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত ১১ বছরে গ্রাহক বেড়েছে দুই কোটি ৪৩ লাখ। এই বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন সম্প্রসারণে গুণগত মান রক্ষা করতে হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সারাদেশের অধিকাংশ গ্রামগঞ্জে অপরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। দ্রুত মানুষকে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে গিয়ে যেনতেনভাবে লাইন টানা হয়েছে। নিয়মকানুন বহু ক্ষেত্রেই মানা হয়নি। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাসহ প্রভাবশালীদের চাপে লাইন টানা হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দিয়ে। শহরেই পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হাতেগোনা। গ্রামে বাড়িঘরগুলো খুবই অপরিকল্পিত। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। ফলে এসব এলাকায় বিদ্যুতের লাইন টানা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তাসহ অলিগলি দিয়ে লাইন টানা হয়েছে। কারও বাড়ির জানালার পাশ দিয়ে, কারও বাড়ির গাছগাছালির ভেতর দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে লাইন চলে গেছে। এরপর এসব লাইন থেকে বাঁশের খুঁটি দিয়ে তার নিয়ে বিদ্যুৎ চুরি করছে অনেকেই। এগুলো আরও ভয়ংকর। এসব বিতরণ লাইন রক্ষণাবেক্ষণ এবং পাহারা দেওয়ার জন্য পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের লোকবল খুবই কম। সারাদেশে হাজার হাজার কিলোমিটার লাইন পাহারা দেওয়ার মতো লোকবল তাদের নেই। ফলে গ্রামে নতুন 'মৃত্যুফাঁদ' এখন বিদ্যুতের তার।

পাশাপাশি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের সামগ্রী। এখন নকল ও মানহীন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি হাতের নাগালে। বিদ্যুতের তার, সুইচ বোর্ড, সার্কিটগুলো নিম্নমানের হওয়ায় বাসাবাড়িতে হরহামেশা শর্টসার্কিটের ঘটনা ঘটছে। আগুন লাগছে। প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া গ্রামের গ্রাহকরা সচেতন কম। অসতর্কতার কারণে বিদ্যুৎস্পর্শের ঘটনা বাড়ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২০ সালের মধ্যে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। ইতোমধ্যেই ৯৪ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা উদ্বৃত্ত। সরবরাহ লাইন না থাকায় বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে বিতরণ লাইন সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত গতিতে করা হচ্ছে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক মহাব্যবস্থাপক (জিএম) নাম না প্রকাশের শর্তে সমকালকে জানান, কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন স্থাপনের আগে অনেকগুলো নিয়মকানুন পালন করতে হয়। এলাকা জরিপ করতে হয়। ওই এলাকায় কতজন গ্রাহক আছেন, বিদ্যুৎ দিলে আর্থিক লোকসান হবে কি-না, গ্রাহকদের আর্থিক সামর্থ্য ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করার পর সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য লাইন স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এসব নিয়মকানুন খাতা-কলমে থাকলেও সব ক্ষেত্রে প্রতিপালন করা হয় না। এলাকার রাজনৈতিক নেতা, এমপিসহ প্রভাবশালীদের চাপে পড়ে কোনো রকম যাচাইবাছাই ছাড়াই বহু গ্রামে লাইন স্থাপন করতে হয়। অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হলেও লাইন টানা হয়। এসব কারণে বিদ্যুৎস্পর্শে অকাল মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিদ্যুৎ লাইন টানার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন না করলে ভবিষ্যতে এভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।

১ নভেম্বর সমকালে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরে বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে আইজল মিয়া (৪০) ও উজ্জ্বল মিয়া (১৮) নামে চাচা-ভাতিজার মৃত্যু হয়েছে। চকরিয়া পৌরসভার ফুলতলীতে একটি টায়ার মিলে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে শ্রমিক আলমগীর (৪৫) মারা যান। ঝালকাঠির রাজাপুরে ইজিবাইক থেকে চার্জারের তার খুলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে চালক বাপ্পী হাওলাদারের (১৮) মৃত্যু হয়। ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার ধীতপুর গ্রামে বিদ্যুতের তারের ওপর ভেজা কাঁথা শুকাতে দিতে গিয়ে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। ৫ নভেম্বর সমকালে প্রকাশিত অপর এক খবরে বলা হয়, বরগুনার পাথরঘাটায় মা-ছেলেসহ তিনজন মারা যান। নিহতরা হলেন দেলোয়ার হোসেন (৬৫), হামিদা বেগম (৪২) ও ছেলে রাসেল (১৮)। খবরে আরও বলা হয়, দিনমজুর দেলোয়ার বাগানে সুপারি গাছ কাটতে যান। ওই গাছ বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনে গিয়ে পড়ে। তারে দেলোয়ারের হাত জড়িয়ে যায়। এরপর দেলোয়ারের ভাইয়ের স্ত্রী হামিদা বেগম এবং ছেলে রাসেল তাকে বাঁচাতে গিয়ে তারাও বিদ্যুৎস্পর্শে ঘটনাস্থলেই মারা যান। মা ও ছেলে জানতেন না বিদ্যুৎস্পর্শিত কাউকে কীভাবে বাঁচাতে হয়। ফলে এই মা ও ছেলেকে অকালে বিদায় নিতে হয়েছে। তাদের মৃত্যুর কারণ সচেতনতার অভাব।

ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত বছর বৈদ্যুতিক গোলযোগে সারাদেশে সাত হাজার ৮২৫টি ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা মোট অগ্নিকাণ্ডের ৩৯ শতাংশ। ২০১৭ সালে দেশে ৩৬৪ জন বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যাওয়ার রেকর্ড পাওয়া যায়। যদিও প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। ২০১৬ সালে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ৪২ শতাংশের পেছনে কারণ ছিল বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ অপরিকল্পিতভাবে বিদ্যুতের বিতরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।

পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রামে উন্নয়নের মূল শর্তই হলো বিদ্যুৎ। কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পারলে সেখানে উন্নয়ন হবেই। এ জন্য কিছুটা হলেও তাড়াহুড়ো করে নিয়মকানুন পুরোপুরি না মেনে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ সুযোগে গ্রামের কিছু অসাধু ব্যক্তি বিভিন্ন স্থানে বাঁশ দিয়ে লাইন নিচ্ছে, যা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে করে তুলেছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একটু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হচ্ছে অঙ্গহানি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় আহত ১৭ হাজার ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৫ হাজারের ওপরে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মতে, দেশে অগ্নিকাণ্ডের অধিকাংশ ঘটনা ঘটে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা এ জন্য ভবন তৈরিতে অনিয়ম, বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ এবং নকল ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহারকে দায়ী করেছেন।

জানতে চাইলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শফিক উদ্দিন সমকালকে বলেন, বিতরণ লাইনের দুর্বলতা শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামে বেশি দেখা যায়। তাই বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনাগুলো গ্রামেই বেশি ঘটে। তিনি দাবি করেন, ওজোপাডিকোর আওতাধীন এলাকায় বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার পরিমাণ কমে আসছে। জরাজীর্ণ লাইন প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। আগামীতে বিতরণ ব্যবস্থা আরও নিরাপদ হবে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলী বলেন, দেশের আনাচে-কানাচে হাজার হাজার কিলোমিটার লাইন বসছে। ফলে কিছু স্থানে ভুলত্রুটি হতে পারে। এটার পরিমাণ খুব বেশি নয়। তিনি দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে গ্রাহকদের অসচেতনতাকে দায়ী করে বলেন, তারা নিয়মিত গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক করে জনগণকে সচেতন করার কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। দু-এক বছরের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলো লাইন স্থাপনে অনেক সময় নিয়ম মানে না। তাদের গাফিলতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে সে দায় বিতরণ কোম্পানির ওপরই বর্তায়। তিনি বলেন, অনেক সময় খরচ কমাতে বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনে নিরাপত্তার দিকে নজর দেওয়া হয় কম। মানহীন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। এতে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সমকালকে বলেন, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা রোধে বিতরণ কোম্পানি ও গ্রাহক উভয়কে সচেতন হতে হবে। দ্রুত সংযোগ দিতে অনেক বিতরণ কোম্পানি লাইন স্থাপনে নিরাপত্তার দিকে নজর দিচ্ছে কম। আবার গ্রাহকরাও সচেতন কম। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, বিদ্যুতের বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। সচেতনতা বাড়াতে কাজ চলছে। স্মার্ট গ্রিড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দুর্ঘটনা রোধে সহায়ক হবে।