দাম বাড়ানোর শুনানি

বিদ্যুতে প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

ফাইল ছবি

অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিক প্রকল্প গ্রহণে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর খরচ বেড়ে যায়। এই ব্যয় সামলাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। যার চাপ পড়ে ভোক্তার উপর। তাই প্রকল্পের যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা জরুরী। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) উচিত একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা।

বিদ্যুতের মূল্যহার নির্ধারণের শুনানির তৃতীয় দিনে সোমবার রাজধানীর টিসিবি মিলনায়তনে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে এই দাবি জানানো হয়। সোমবার ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এবং ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) গ্রাহক পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর উপর শুনানি হয়। শুনানিতে ডেসকো প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে বিতরণ ব্যয় এক টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। তাদের প্রস্তাবনা যাচাই করে কমিশনের মূল্যায়ন কমিটি ৮১ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করে। ডিপিডিসির প্রস্তাব ছিল এক টাকা ২৪ পয়সা। মূল্যায়ন কমিটি ৮৭ পয়সা বৃদ্ধি যৌক্তিক বলে জানিয়েছে।

শুনানিতে ডেসকো এবং ডিপিডিসি দুই কোম্পানিই বলছে, পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম না বাড়লে তাদেরও বাড়তি দামের প্রয়োজন হবে না। দুই কোম্পানিই লাভজনক অবস্থায় রয়েছে বলে শুনানিতে জানিয়েছে। এ বিষয়ে মূল্যায়ন কমিটি বলেছে কমিশন পাইকারি বিদ্যুতের দাম যতটা বৃদ্ধি করবে একই হারে যেনো খুচরা দাম বাড়ায়।

কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে ডিপিডিসি গঠনের সময় এক হাজার ১৪৮ কোটি টাকার সম্পদ দেখানো হয়েছে। এখন সব মিলিয়ে ডিপিডিসির সম্পদ ১৪ হাজার কোটি টাকার। নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করার ফলে ডিপিডিসির সম্পদ বেড়েছে। কিন্তু ডিপিডিসির এই প্রকল্প গ্রহণ কতটা যৌক্তিক তা নির্ধারণ করা জরুরী। এজন্য কমিশনকে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠনের আহ্বান জানান তিনি। এই কমিটি বিবেচনা করবে প্রকল্প গ্রহণ যৌক্তিক ছিল কি না। তিনি বলেন, ডিপিডিসিকে আমরা কেস স্টাডি হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। অনেকক্ষেত্রেই প্রকল্প গ্রহণের জন্য অদৃশ্য চাপ থাকে। এখানে ডিপিডিসিরও কিছু করনীয় থাকে না। ফলে এসব প্রকল্প গ্রহণ আদৌ যৌক্তিক কি না তা বিবেচনা করা জরুরী।

মূল্যায়ন কমিটি তাদের সুপারিশে বলছে, দীর্ঘদিন বিল না দেয়ার কারণে অনেক গ্রাহকের বিলম্ব মাশুল বিলের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। সঙ্গত কারণে এই বিল আদায়ে বিপাকে পড়ছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। তাই বকেয়া বিলের উপর পাঁচ শতাংশ হারে সরল সুদ ধরে এসব বিল আদায় করা যেতে পারে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে সিটিকর্পোরেশন এবং পৌরসভার কাছে বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিপুল বকেয়া রয়েছে। শুনানিতে ডিপিডিসি বলছে, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে তাদের ১৫৮ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এই বকেয়া অর্থ আদায়ে তাদের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। বকেয়া টাকা না দিলে জানুয়ারি মাসে লাইন কেটে দেওয়া হবে।

কারিগরি কমিটি বলছে, গ্রাহকের নিরাপত্তা জামানতের অর্থ কোম্পানিগুলো নিজের আয়ে অন্তর্ভূক্ত করছে। এটা আইনসঙ্গত নয়। এই অর্থ পৃথক একাউন্টে রাখতে হবে। কোন কারণে গ্রাহক লাইন ছেড়ে দিলে তার নিরাপত্তা জামানত সুদসহ ফেরত দিতে হবে।

কমিটি আরও বলেছে, এখন প্রিপেইড মিটার লাগানো হচ্ছে। এর আগে গ্রাহক ডিজিটাল মিটার ব্যবহারের সময় বিরতণ কোম্পানি যে নিরাপত্তা জামানত নিয়েছিল তা ফেরত দেয়া উচিত। এ বিষয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, গ্রাহক আবেদন করলে তাদের এই অর্থ ফেরত দিচ্ছে তারা। কিন্তু অধিকাংশ গ্রাহক আবেদন না করায় তা বিতরণ কোম্পানির কাছেই থেকে যাচ্ছে।

প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নিয়েও কমিশনে ভোক্তারা অভিযোগ করেছে। বিতরণ কোম্পানি বলছে, বিদ্যুত বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ি তারা ৪০ টাকা করে প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নিচ্ছে। একটি মিটারের আয়ুষ্কাল ১০ বছর ধরে এই ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ভোক্তারা অভিযোগ করেছে মিটারের দামের চেয়ে এই ভাড়া দ্বিগুন। আবার কোন কারণে মিটার লক হলে খুলে দিতে ৬০০ টাকা চার্জ নেওয়া হচ্ছে।

কমিশনের কারিগরি কমিটি বলছে বৈদ্যুতিক যানবাহন চার্জের জন্য একটি পৃথক ধাপ নির্ধারণ করা যেতে পারে। অফপিক আওয়ারে যাতে এসব লাইন থেকে বিদ্যুত নিতে পারে বিতরণ কোম্পানি।

কমিশন চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলামের সভাপতিত্বে শুনানিতে কমিশনের অন্য সদস্য এবং ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ানের নেতৃত্বে ডিপিসিরি কর্মকর্তা এবং ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহিদ সারোয়ারের নেতৃত্বে ডেসকোর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।