নেপালের শীর্ষ ধনী ও প্রথম বিলিয়নেয়ার বিনোদ কে. চৌধুরী বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে চান। ইতোমধ্যে তিনি এ দেশে বিশ্বখ্যাত 'ওয়াই ওয়াই' ব্র্যান্ডের নুডলস উৎপাদনে যৌথ বিনিয়োগ করেছেন। আগামী দিনে হোটেল, অবকাঠামো ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে তার। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর এক হোটেল সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি এ আগ্রহের কথা জানান।

বিনোদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ অনেক সম্ভাবনাময় দেশ। এ দেশে বড় বাজার রয়েছে। এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তবে এ দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ সেই তুলনায় কম। বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আইন ও নীতিমালায় পরিবর্তন দরকার। বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমাতে হবে। করপোরেট করও কমানো উচিত। পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। সহজে ব্যবসা করার সুযোগ দিলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।

২০১৩ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন নেপালের প্রথম বিলিয়নেয়ার বা একশ' কোটি ডলারের সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হিসেবে বিনোদ চৌধুরীকে তালিকাভুক্ত করে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই উদ্যোক্তা ১৯টি দেশে শতাধিক শিল্প-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তিনি নেপালের জাতীয় সংসদের একজন সদস্য। খাদ্য, আর্থিক সেবা, সিমেন্ট, জ্বালানি, বিলাসবহুল হোটেলসহ কয়েকটি খাতে ব্যবসা রয়েছে চৌধুরী গ্রুপের। ভারতের তাজ হোটেলে অংশীদারিত্ব রয়েছে বিনোদ চৌধুরীর। সিঙ্গাপুরে বড় বিনিয়োগ রয়েছে চৌধুরী গ্রুপের। বিনোদ চৌধুরী বলেন, ওয়াই ওয়াই ব্র্যান্ডের নুডলস এখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ভারতসহ বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশে বিক্রি হচ্ছে। ভারতের নুডলসের বাজারের ২৬ শতাংশ শেয়ার এই ব্র্যান্ডের। বাংলাদেশে ওয়াই ওয়াই নুডলস কারখানা ইতোমধ্যে উৎপাদনে গেছে। ধামরাইয়ে অবস্থিত কারখানায় ইতোমধ্যে ৩৫০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। ছয় মাস ধরে এ দেশের বাজারে পরীক্ষামূলকভাবে বিক্রি হচ্ছে। আগামী মার্চ থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে। শিগগিরই দেশের বাজারে দৃশ্যমান হবে। এই ব্র্যান্ড নুডলসের বাজারে বড় জায়গা তৈরি করে নেবে। কারণ এই নুডলসের প্যাকেট খুলে সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ার উপযোগী।

তিনি জানান, আগামী দিনে বাংলাদেশের কারখানা থেকে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওসসহ বিভিন্ন দেশে নুডলস রপ্তানি করা হবে। নুডলসের এ কারখানায় ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। আগামী এক বছরে এই কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হবে। তখন ৫০০ লোকের কর্মসংস্থান হবে। তিনি তথ্য দেন, নেপালে যখন ওয়াই ওয়াই নুডলস যাত্রা করে, তখন মাথাপিছু ভোগ বছরে তিন থেকে চার প্যাকেট ছিল। এখন তা ৬০ প্যাকেট হয়েছে। ভারতের বাজারেও মাথাপিছু ভোগ পাঁচ থেকে ছয় প্যাকেট। বাংলাদেশের মাথাপিছু ভোগ তিন প্যাকেটের কম। এ দেশে ইনস্ট্যান্ট নুডলসের বড় বাজার রয়েছে। আমাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। এটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী পণ্য। আমাদের পরিকল্পনা সুস্পষ্ট।

তিনি জানান, ওয়াই ওয়াই ব্র্যান্ড মূলত থাইল্যান্ডের। এই কোম্পানির উদ্যোক্তাকে তিনি প্রস্তাব দেন অংশীদারিত্বে ব্যবসা করার। শুরুতে থাইল্যান্ডের ব্যবসায়ী রাজি হয়নি। উল্টো তাকে নিরুৎসাহিত করে বলেন, এ পণ্য নেপালের ক্রেতারা কিনতে পারবে না। অথচ এখন প্রতিদিন নূ্যনতম ৩০ হাজার প্যাকেট নুডলস নেপালের কারখানায় তৈরি হচ্ছে। এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ব্র্যান্ডের ২৪টি নুডলস কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় ৩০০ কোটি প্যাকেট নুডলস উৎপাদন হচ্ছে।

উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের উঠে আসা প্রসঙ্গে বিনোদ চৌধুরী বলেন, যে কোনো কাজের সক্ষমতা, অঙ্গীকার ও গভীর আসক্তি স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দেয়। এটি তার হৃদয় বিশ্বাস করে। ১৯৩৪ সালে তার পিতামহ ভারতের রাজস্থান থেকে নেপালে এসে বস্ত্রের ব্যবসা শুরু করেন। এর পরে তার বাবা ধীরে ধীরে বিভিন্ন সময়ে নানা ব্যবসা গড়ে তোলেন। তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্যবসায় যোগ দেন। তখন তিনি ভারতে হিসাবরক্ষণে পড়াশোনা করছিলেন। বাবা অসুস্থ হওয়ায় পড়ালেখার পর্ব অসম্পূর্ণ রেখেই নেপালে ফিরে আসেন। এসে ব্যবসায় যোগ দেন। তখনই তার জীবনের বড় পরিবর্তন আসে। তবে অনেক কঠিন সময় পার করতে হয়েছে তাকে। ১৮ বছর বয়সে চিন্তা করেছেন, মনের ভেতর থেকে লক্ষ্য ঠিক থাকলে এবং অঙ্গীকার থাকলে তা অর্জন হবেই। এ ক্ষেত্রে বয়স কোনো বিষয় নয়। তিনি বলেন, ১৯৮০ সালে বিস্কুট কারখানা থেকে খাদ্যপণ্যের ব্যবসা শুরু করেন। এর পরে নুডলসের কারখানা স্থাপন করেন। সেখান থেকে ভারত, নেপাল, হংকং ও সিঙ্গাপুরে সুপার স্টোর ব্যবসা চালু করেন। এখন এসব স্টোর বেশ জনপ্রিয়।

বিনোদ চৌধুরী বলেন, ছোট দেশ নেপালে সিমেন্টের ব্যবসা অনেক কঠিন। ভারতে বড় বাজার ধরার সুযোগ থাকায় তিনি সে দেশে সিমেন্ট খাতে বিনিয়োগ করেন। ভারতের বাজারে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি বলেন, ৯০-এর দশকের আগে থেকে ব্যবসায় শুল্ক্ক ও অশুল্ক্ক নানা বাধা ছিল। আমদানি ও রপ্তানি অতটা সহজ ছিল না। তবে এর মধ্য দিয়েও আস্থা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। এর কারণ গুণগত মানের পণ্য ও সেবা দিতে পারলে ক্রেতারা তা গ্রহণ করবেই। তাদের সঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রেখে ব্যবসা করতে হবে। ক্রেতাই হচ্ছে ব্যবসায়ীদের কাছে রাজা।