এক দশকেও হলো না সাগরে পাইপলাইন

জ্বালানি তেল পরিবহনে সাড়ে নয়শ' কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় বেড়ে এখন সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

হাসনাইন ইমতিয়াজ

এক দশকেও শেষ হলো না সাগরে পাইপলাইন নির্মাণ কাজ। সাগর উপকূলে নোঙর করা জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ওই তেল খালাসের জন্য ২০০৯ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এসপিএম প্রকল্প হাতে নেয়। সর্বশেষ সংশোধনী অনুসারে গত ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্প মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। প্রথমবার একনেক যখন প্রকল্পটি অনুমোদন হয় তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৫৪ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে কয়েক ধাপে ডিপিপি সংশোধনের পর ব্যয় বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। বিপিসি বলছে, ঋণ ছাড় হতে বিলম্ব হওয়ায় এবং জমি অধিগ্রহণে জটিলতার কারণে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
এ প্রকল্পের যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলা হয়েছিল, চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামোতে মাদার ভেসেল (বৃহৎ জাহাজ) থেকে জ্বালানি তেল খালাস করা সম্ভব নয়। কারণ কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলের নাব্য কমে যাচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে মাদার ভেসেল গভীর সমুদ্রে নোঙর করা হয়। সেখান থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে আমদানি করা জ্বালানি তেল খালাস করা হয়। এভাবে একটি বড় মাপের ভেসেল (এক লাখ টনের ওপরে) খালাস করতে ১১ দিন সময় লাগে। এ ছাড়া লাইটার জাহজের মাধ্যমে তেল খালাসে অপচয় হয় বেশি। কিন্তু সাগরে ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে স্টোরেজ ট্যাঙ্ক পর্যন্ত নিতে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় লাগবে। ফলে সময় বাঁচবে ৯ দিন। অপচয়ও হবে না। এ জন্য ২০১০ সালেই এসপিএম প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এতে বছরে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে প্রকল্পপত্রে বলা হয়।
সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনালটি মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিমে নির্মাণ করা হচ্ছে। টার্মিনাল থেকে সাগরে ১৪৬ কিলোমিটার ও ভূমিতে ৭৪ কিলোমিটার মোট ২২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুটি পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের ৩২ কিলোমিটার এবং ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের ১৮৮ কিলোমিটার পাইপলাইন বসবে। মহেশখালী দ্বীপে ক্রুড অয়েল ও ডিজেলের জন্য পৃথক ছয়টি স্টোরেজ ট্যাঙ্ক নির্মাণ করা হবে। এখান থেকে পতেঙ্গায় অবস্থিত ইআরএলের স্টোরেজ ট্যাঙ্কে তেল আনা হবে।
বারবার ডিপিপি সংশোধন :২০১০ সালে একনেকে অনুমোদিত এসপিএম প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৫৪ কোটি টাকা। সে সময় ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ৯০৪ কোটি ঋণ দিতে চেয়েছিল। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে ঘটিতির কথা বলে নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। প্রথম নকশায় একটি পাইপলাইন ছিল। নতুন নকশায় গভীর সমুদ্র থেকে দুটি পাইপলাইনে তেল খালাসের বিষয় যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য ৯৪ কিলোমিটার বেড়ে ২২০ কিলোমিটারে দাঁড়ায়। এতে ব্যয় বেড়ে হয় চার হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের মার্চে প্রথমবার ডিপিপি সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এতে বৈদেশিক সহায়তা ধরা হয় তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আইডিবি ঋণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে নতুন ডিপিপি তৈরি করে ২০১৫ সালের নভেম্বরে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। এ সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় পাঁচ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে চার হাজার ২৯৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় চীনের এক্সিম ব্যাংক। আর বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ বিশেষ আইনের আওতায় টেন্ডার ছাড়া প্রকল্পের কাজ পায় চীনের চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ব্যুরো (সিপিপিবি)। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে সিপিপিবির সঙ্গে বিপিসি ও ইআরএলের চুক্তি সই হয়। ২০১৭ সালের অক্টোবরে চীনের এক্সিম ব্যাংক ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ঋণ চুক্তি সই হয়। ২০১৭ সালের ৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
গত ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা আগামী বছরের আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে ইআরএল। এ বিষয়ে বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণের টাকা পেতে দেরি হয়েছে। এ ছাড়া কিছু জায়গায় পাইপলাইনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা যাচ্ছে না। এ জন্য প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে। এদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কোম্পানি চীনের। সেখানে অসংখ্য চীনা নাগরিক কাজ করে। করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্প কাজ ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড) পাইলাইনের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচ দশমিক ছয় একর জমি দিতে রাজি হচ্ছে না। গত দুই বছর ধরে কেইপিজেডের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকেও সমাধান মিলছে না। প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জার্মানির আইএলএফ কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স ২০১৮ সাল থেকে কেইপিজেডের ভেতর কাজ করতে গিয়ে বারবার বাধা পেয়েছে। জ্বালানি বিভাগ থেকে এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিলেও বিষয়টি প্রায় দুই বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। কেইপিজেড বিকল্প রুটের প্রস্তাব দিলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যাচাই করে জানিয়েছে, সেটি বাস্তবসম্মত নয়।
দেশে বর্তমানে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৫৫ লাখ টন। এর মধ্যে ৫০ লাখ টনই আমদানি করা হয়। বাকিটা দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ইআরএলের শোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন। শোধনাগারের দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে শোধন ক্ষমতা ৪৫ লাখ টনে পৌঁছবে।