সাধারণত বিয়ে, জন্মদিন বা যে কোনো উপলক্ষের পুরস্কার কিংবা মানুষের শখের সংগ্রহের সাধারণ প্রাইজবন্ড এতটা 'অসাধারণ' হয়ে ওঠার কাহিনি সত্যিই বিস্ময়কর। সঞ্চয় প্রবণতা বাড়ানো কিংবা বিক্রির মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে সরকারের সহজ ঋণ নেওয়ার মাধ্যম যে প্রাইজবন্ড, তাকে ঘিরে অবৈধ বেচাকেনা ও দালালচক্র গড়ে ওঠার যে খবর রোববারের সমকালে প্রকাশ হয়েছে, সেটি উদ্বেগজনক। আমরা জানি, তিন মাস অন্তর অনুষ্ঠিত একশ' টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ডের ড্রয়ের মাধ্যমে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। যিনি নির্দিষ্ট নম্বরের ওই প্রাইজবন্ড জমা দিতে পারবেন, তিনিই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবেন। এ সহজ শর্তের কারণে প্রাইজবন্ড ঘিরে গড়ে উঠেছে অবৈধ বেচাকেনা। যার ফলে কেবল একজন অস্বাভাবিকভাবে পরপর একাধিক পুরস্কারই পাচ্ছেন না বরং এটি কালো টাকা সাদা দেখানোর কৌশল হিসেবেও কাজ করছে। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, বিষয়টি সম্পর্কে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) অবহিত।

এ অবৈধ বেচাকেনা যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে প্রকাশ্যেই চলে, তা সমকালের প্রতিবেদক সরেজমিন প্রত্যক্ষ করেছেন। ব্যাংকের ভেতরেই এ অপকর্ম কর্তৃপক্ষ কীভাবে চলতে দিচ্ছে! প্রাইজবন্ডে পাঁচ শ্রেণিতে মোট ৪৬ জনকে পুরস্কার দেওয়া হয়, যার প্রথম পুরস্কারের মূল্যমান ছয় লাখ টাকা। ২০ শতাংশ কর কাটার পর প্রথম পুরস্কারধারী চার লাখ ৮০ হাজার টাকা পাবেন, তাও তিন মাস প্রতীক্ষার পর। অথচ দালালচক্রের মাধ্যমে তিনি সেটা নগদে আরও বেশি দামে বিক্রি করছেন। চূড়ান্তভাবে যিনি এ বন্ড কিনছেন, তিনি আয়কর নথিতে দেখাতে পারেন যে, প্রাইজবন্ডের পুরস্কার থেকে ওই টাকা এসেছে। এ অবস্থায় দুদক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে সুপারিশ পাঠিয়ে গত বছরের শেষ দিকে চিঠি দিয়েছে, সেটি আমরা তাৎপর্যপূর্ণ মনে করি।

বর্তমানে ড্র-পরবর্তী দুই বছর পর্যন্ত ব্যক্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পুরস্কারের অর্থ নির্দিষ্ট ফরমে প্রাইজবন্ড দেখিয়ে পেতে পারেন। দুদক পরামর্শ দিয়েছে, ড্র অনুষ্ঠিত হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নিকটস্থ ব্যাংক বা ডাকঘরে রিপোর্ট করার বিধান করা যেতে পারে। এর ভিত্তিতে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিকে পুরস্কার প্রদান করা হলে প্রাইজবন্ড ঘিরে অসাধু কার্যকলাপ কমবে বলে আমরাও বিশ্বাস করি। ড্রয়ের তিনটি তারিখই নির্ধারিত বলে এতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা সমকালের কাছে সময়ের পরিবর্তনে প্রাইজবন্ড বিক্রি ও পুরস্কার প্রদান পদ্ধতিতে পরিবর্তনের যে কথা বলেছেন, সেটিও আমরা বিবেচনার পরামর্শ দিতে চাই। তার আগে আমরা মনে করি- বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে প্রাইজবন্ডকেন্দ্রিক সব অনিয়মের তদন্ত করা। ব্যাংকের ভেতরেই যেভাবে দালালচক্র কাজ করছে, সেখানে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত রয়েছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রাইজবন্ডের ড্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা যেমন আনতে হবে, তেমনি একে ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ কর্ম বন্ধে পুরস্কারের শর্ত নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। কোনোভাবেই প্রাইজবন্ডের মতো ইতিবাচক একটি বিষয়কে বিতর্কিত করা যাবে না।

মন্তব্য করুন