৩৫০ পোশাক কারখানার রপ্তানি অর্ডার বাতিল

উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আজ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠক

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২০     আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ আবদুল্লাহ

ছবি: ফাইল

ছবি: ফাইল

করোনাভাইরাসের প্রভাবে গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ৩৫০ তৈরি পোশাক কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে। এর সঙ্গে ৯২ কোটি ৭০ লাখ ডলার মূল্যমানের পণ্য জড়িত। আরও কারখানার অর্ডার বাতিলের আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের নিয়ে আজ বৈঠকে বসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য বাণিজ্য সহায়ক পরামর্শক কমিটির বৈঠকও রয়েছে আজ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বিজিএমইএ জানায়, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩০০ কারখানার অর্ডার বাতিল হয়। গতকাল রোববার পর্যন্ত এ সংখ্যা ৩৫০-এ পৌঁছেছে বলে বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া অনেক অর্ডার স্থগিত হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামীতে সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধ করা নিয়ে আশঙ্কায় আছেন কারখানা মালিকরা।

ইউরোপ, আমেরিকাসহ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজার রয়েছে এমন দেশে করোনাভাইরাসের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। কোনো কোনো দেশ জরুরি অবস্থা জারি করেছে। কোনো কোনো দেশ অন্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে। ফলে এসব দেশে পোশাক পণ্যের বেচাকেনা কমে গেছে ব্যাপকভাবে। কোনো কোনো শহরে বেচাকেনা একদম বন্ধ। ফলে বাংলাদেশ থেকে পোশাক নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করে যেসব ব্র্যান্ড তারা এ মুহূর্তে পোশাক নিতে চাইছে না। এ জন্য অনেক ক্রেতা অর্ডার বাতিল করছে। অনেকে অর্ডার স্থগিত করছে।

পোশাক খাত নিয়ে আজকের সভায় সভাপতিত্ব করবেন বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দীন। সভায় শ্রম সচিব, বস্ত্র ও পাট সচিব, ইপিবির প্রতিনিধি এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। সভায় পোশাক খাতে করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা নিয়ে আলোচনা হবে।

দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের বাজারগুলোতে মন্দা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পোশাক খাতে বেশ কিছু নীতি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। সংস্থাটি বলেছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত ১ শতাংশ হারে যে নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে তা ঋণ হিসেবে কোম্পানিগুলোকে আগাম দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল মওকুফ করা যেতে পারে, যা দিয়ে কোম্পানিগুলো বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পারবে।

বিজিএমইএ পরিচালক আসিফ ইব্রাহীম সমকালকে বলেন, গত শনিবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ৩৪৭টি কারখানার ৯৭ কোটি ২০ লাখ ডলারের রপ্তানি অর্ডার বাতিল হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় বিজিএমইএ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

করোনাভাইরাসের প্রভাব জানতে বিজিএমইএ একটি পোর্টাল চালু করেছে। ওই পোর্টালে যেসব কারখানা সংযুক্ত হয়েছে, তাদের মধ্য থেকে এই অর্ডার বাতিলের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এখনও সব কারখানা ওই পোর্টালে সংযুক্ত হয়নি। দেশে বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার কারখানা উৎপাদনে আছে। সংশ্নিষ্টরা জানান, ক্রেতারা যে পরিমাণ অর্ডার বাতিল করছে, স্থগিত করছে তার চেয়ে বেশি। সরাসরি অর্ডার বাতিল না করে ক্রেতারা বলছে- আগামী দু-তিন সপ্তাহ পর চূড়ান্ত করবে যে অর্ডার থাকবে নাকি বাতিল হবে।

আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সারাদেশে সচল নিট গার্মেন্টের ৬০ ভাগই নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত। বাংলাদেশ বছরে ১৭ বিলিয়ন ডলারের যে নিট পণ্য রপ্তানি করে এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের নিট গার্মেন্টগুলোই রপ্তানি করে ১০ বিলিয়ন ডলারের। নারায়ণগঞ্জে এ খাতে কাজ করে ১০ থেকে ১২ লাখ শ্রমিক। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশাল এই শ্রমবাজারও হুমকির মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন নিট গার্মেন্ট মালিকরা।

বাংলাদেশের নিট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, 'বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার যদি আমাদের পাশে না দাঁড়ায় তাহলে আমরা মারা পড়ব। ধ্বংস হয়ে যেতে পারে দেশের নিট খাত।'

বিকেএমইএর পরিচালক এম মনসুর আহমেদ বলেন, 'চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য ফেরত আসছে। ইউরোপ থেকে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো অর্ডার বন্ধ রেখেছে। ইতালি, জার্মানি তো প্রচুর পণ্য নেয়। এখন ইতালির যে অবস্থা সেখানকারর ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তো ফোনই ধরে না। করোনা মোকাবিলা করতে না পারলে গার্মেন্ট শিল্প ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে, গার্মেন্ট টিকবে না।'

পরামর্শক কমিটির সভা : বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সভাপতিত্বে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সম্মেলন কক্ষে বাণিজ্য পরামর্শক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে আজ। বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতা, এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও বিভিন্ন খাতের বড় ব্যবসায়ীদের নিয়ে বাণিজ্য সহায়ক পরামর্শক কমিটি গঠন করেন তোফায়েল আহমেদ। গত ছয় বছরে এ কমিটি ৬টি বৈঠক করেছে। সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে গত বছরের জুলাই মাসে। এখন করোনাভাইরাসের কারণে ছোট-বড় সব খাত ঝুঁকিতে পড়ায় করণীয় নির্ধারণে এই কমিটির সভা ডেকেছেন টিপু মুনশি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, করোনাভাইরাসের কারণে সব খাতই ঝুঁকিতে পড়েছে। এ ঝুঁকি দিন দিন আরও বাড়ছে। বিভিন্ন সংগঠন ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের কাছে বাড়তি প্রণোদনা আশা করছে। এ অবস্থায় বিভিন্ন খাতের প্রকৃত তথ্য জানা ও করণীয় নির্ধারণ করতে জরুরিভাবে বাণিজ্য সহায়ক পরামর্শক কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে।