সামাজিক নিরাপত্তার বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন

সঞ্চয়পত্রের সুদ ও কৃষি খাতে ভর্তুকির একটা অংশ এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২০     আপডেট: ১৬ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ আবদুল্লাহ

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে সরকার প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এমন কিছু খাতের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এমন কয়েকটি খাতের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করে অঙ্ক বড় করে দেখানো হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে সরকার ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করেছে, যা মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বাজেটে এ খাতে ৮১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। নতুন বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে ১৩ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদের একটি অংশ, কৃষি ভর্তুকি, কর্মসংস্থানের জন্য পল্লি এলাকায় বিতরণে ঋণের অর্থ ও প্রণোদনা প্যাকেজের ভর্তুকি সুদের বরাদ্দ এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্থগিত সুদের মওকুফ অংশ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রেখেছে সরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঞ্চয়পত্র যারা কিনছেন তাদের নিরেট সঞ্চয় রয়েছে। এ ধরনের জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার চেয়ে আরও অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে সরকারের। এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় যে ঋণ বিতরণ করা হবে, তা কখনও নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত হতে পারে না। কারণ এই ঋণ যিনি নেবেন তাকে সুদসহ নির্ধারিত সময়ে সরকারকে ফেরত দিতে হবে। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্থগিত সুদের জন্য যে অংশ সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে তা যাবে দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়াতে হবে, তবে এভাবে নয়। এতে জনসাধারণ বিভ্রান্ত হতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিস্তারিত বরাদ্দ বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, নগদ ভাতা বাবদ ৩৩ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচিতে  বরাদ্দ রয়েছে ১৭ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা। ভিজিডি, ভিজিএফ, ওএমএস, জিআর, কাবিখা, কাবিটা এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত। উপবৃত্তির জন্য রয়েছে ৪ হাজার ৯০ কোটি টাকা। বিশেষ কর্মসূচির আওতায় নগদ অথবা উপকরণ হস্তান্তর খাত রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৯ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। যার মধ্যে রয়েছে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে দেওয়া প্রণোদনা ঋণের সুদ ভর্তুকির ৩ হাজার কোটি টাকা। করোনার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মার্চ ও এপ্রিল স্থগিত সুদের আংশিক সুদ মওকুফ বাবদ যে ২ হাজার কোটি টাকা সরকার দিচ্ছে তাও যোগ করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রে সরকার যে সুদ পরিশোধ করে তার মধ্যে ৬ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা সামাজিক নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে। কৃষি ভর্তুকির এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা, নিম্ন আয়ের পেশাজীবী কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণের ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, কর্মসৃজনের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও পিকেএসএফ যে দুই হাজার কোটি টাকার ঋণ দেবে সেই বরাদ্দও সামাজিক নিরাপত্তার আওতাভুক্ত করা হয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সরকার সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে যে ঋণ নিচ্ছে তা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় হচ্ছে- এ কথা বলা যাবে না। এই ঋণের অর্থ সাধারণ কাজে ব্যয় হলে তার সুদ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্তর্ভুক্ত করা যৌক্তিক হবে না। অন্যদিকে পেনশন বা অন্যান্য ঋণ তহবিলও এর অন্তর্ভুক্ত করা কাম্য নয়।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে বাজেটের পরিসংখ্যানের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে। প্রকৃত অর্থে সামাজিক নিরাপত্তা বলতে যা বোঝায়, আর যেসব খাতের বরাদ্দ এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এ ছাড়া ঋণ তো ঋণই। ঋণকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। এভাবে হিসাব করলে তো সরকারের সব উদ্যোগই সামাজিক নিরাপত্তার জন্য, জনকল্যাণের জন্য। তাহলে বলা যেতে পারে, পুরো বাজেটই সামাজিক নিরাপত্তার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বলতে যা বোঝানো হয়ে থাকে এবারের বেশ কিছু বরাদ্দ তার সঙ্গে খাপ খায় না।

গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদ, অবসর ভাতা, ঋণের তহবিল এগুলো সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অন্তর্ভুক্ত হওয়া ঠিক নয়। সামাজিক নিরাপত্তা কী তা বৈশ্বিকভাবে ঠিক করা আছে। মূলত দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ ও ব্যয় সামাজিক নিরাপত্তার প্রথম অগ্রাধিকার। এবারের বাজেটে এ ধরনের জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বেড়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় কম। কারণ করোনাভাইরাসের কারণে প্রচুর মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। অনেকে কর্মসংস্থান হারিয়েছে। এ ধরনের মানুষের জন্য কী করা হলো সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সঞ্চয়পত্রের সুদ, কৃষি ভর্তুকি, ঋণের সুদের ভর্তুকি বা ঋণ তহবিল এ খাতে যোগ করলে অঙ্কটা বড় করা যাবে, কিন্তু মূল উদ্দেশ্য পূরণ করা যাবে না।

সংসদে বাজেট প্রস্তাব পেশের পরদিন ১২ জানুয়ারি বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চয়পত্রের সুদের অর্থ কেন সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ব্যয়ে দেখানো হচ্ছে জানতে চাইলে অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা মানে শুধু সমাজের দরিদ্র বা পিছিয়ে পড়াদের সহায়তা করা তা নয়। রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিকের অধিকার রয়েছে। বয়স্ক এবং নারীরা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকেন। অবসরপ্রাপ্তরা বিনিয়োগ করেন। এসব নাগরিকের জন্য সরকার যা করছে তা অবশ্যই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় পড়ে।