যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশে ওষুধ ও ভ্যাকসিন (টিকা) তৈরি করার প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। এখানকার কোম্পানিতে ওষুধ ও ভ্যাকসিন তৈরি করে নিজেদের দেশের পাশাপাশি অন্য দেশেও রপ্তানি করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে করোনা মোকাবিলায় ব্যবহূত পিপিই, মাস্কসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম দেশটির বাজারে যাতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বিনা শুল্ক্কে রপ্তানি করতে পারেন, সে উদ্যোগ নিতেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গতকাল মঙ্গলবার আয়োজিত এ বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দীন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে ২০১৩ সালের নভেম্বরে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম অ্যাগ্রিমেন্ট (টিকফা) চুক্তি সই হয়। প্রতিবছর টিকফার একটি বৈঠক হয়। সর্বশেষ বৈঠক ও পরবর্তী বৈঠকের মধ্যবর্তী সময়ে আগের সিদ্ধান্তের অগ্রগতি ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বৈঠকও হয়। সর্বশেষ গত মার্চে ঢাকায় টিকফার পঞ্চম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী বছর ওয়াশিংটনে ষষ্ঠ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
বৈঠক শেষে বাণিজ্য সচিব জাফর উদ্দিন সমকালকে জানান, দেশের ওষুধ খাতের সক্ষমতা তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের ভ্যাকসিন ও ওষুধ উৎপাদন করে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো, এখানকার ওষুধ কোম্পানিগুলো থেকে 'কন্টাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং'য়ের মাধ্যমে ওষুধ ও ভ্যাকসিন তৈরি করে তাদের চাহিদা অনুযায়ী নিজ দেশ বা অন্য দেশে সরবরাহ করতে পারবে। এর সঙ্গে অবশ্য করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশের ভ্যাকসিন কেনার কোনো সম্পর্ক নেই। এ প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব সভায় কোনো সিদ্ধান্ত হয় না। যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবে।
সচিব আরও জানান, বৈঠকে তুলা আমদানিতে ফিউমিগেশন পরীক্ষা বাতিল করা এবং কিছু পণ্যে শুল্ক্ক কমানোর প্রস্তাব করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করছে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো। যুক্তরাষ্ট্রসহ ১০৭ দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ বিবেচনায় দেশটিতে এখানকার কোম্পানিতে ওষুধ প্রস্তুত করে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা বেড়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন কোম্পানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী পিপিই, মাস্কসহ বিভিন্ন সুরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করে রপ্তানি করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এসব সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক্কের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের যে কোনো তৈরি পোশাকপণ্য দেশটির বাজারে প্রবেশ করতে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক্ক দিতে হয়। পিপিই, মাস্ক যেহেতু পোশাক কারখানায় তৈরি হচ্ছে বা কাপড় থেকে তৈরি, সে জন্য এ ক্ষেত্রেও ওই পরিমাণ শুল্ক্ক আরোপ করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট করে কোনো ভ্যাকসিনের কথা বলা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে করোনাভাইরাসসহ যে কোনো ভ্যাকসিন বাংলাদেশ থেকে তৈরি করে নিতে পারবে।
এদিকে, অনেক দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তুলা রপ্তানিতে বন্দরে 'ফিউমিগেশন' করার শর্ত প্রত্যাহারের দাবি করে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ফিউমিগেশন এক ধরনের অশুল্ক্ক বাধা। ফিউমিগেশন হচ্ছে তুলাকে ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ থেকে মুক্ত করার এক ধরনের পদ্ধতি। যুক্তরাষ্ট্রের তুলায় ক্ষতিকর কীট 'বোল' থাকতে পারে- এ সন্দেহে আমদানির সময় বন্দরে ফিউমিগেশন করার শর্ত দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ। গতকাল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফিউমিগেশনের শর্ত তুলে নেওয়া যেতে পারে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলায় উৎপাদিত পণ্য তাদের বাজারে রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক্ক সুবিধা দেয়। বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ তুলা আমদানিকারক দেশগুলোর অন্যতম।
অন্যদিকে, বৈঠকে শুল্ক্কমুক্ত সুবিধায় সুগন্ধি চাল রপ্তানির সুবিধাও চেয়েছে বাংলাদেশ। এর সঙ্গে সামগ্রিক রপ্তানিতে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানির বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ২০ ভাগ আসে সেখান থেকে। অন্যদিকে, ওই দেশ থেকে প্রায় দেড়শ' কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়।



বিষয় : মাস্ক পিপিই

মন্তব্য করুন