সরকারি চাল সংগ্রহ শেষ হতে না হতেই সবচেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চালের দাম বেড়ে গেছে। গত দু-তিন দিনে প্রায় সব ধরনের সিদ্ধ চালের দাম কেজিতে গড়ে পাঁচ টাকা বেড়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়াচ্ছে অসাধু চক্র। গত সপ্তাহে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পরপরই একশ্রেণির ব্যবসায়ী সরবরাহ সংকটের অজুহাতে এর দাম ব্যাপক বাড়িয়ে দেয়। পরে সরকারের নানা পদক্ষেপে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আমন চাল আসার আগে একইভাবে সংকটের কথা বলে একশ্রেণির ব্যবসায়ী চালের বাজার থেকে ফায়দা নিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে অভিযান জোরদার করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং একইসঙ্গে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিল মালিকরা বৈরী আবহাওয়ায় ধান প্রক্রিয়াজাত করে চাল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা বলছেন। আমন মৌসুমের আগে চালের ঘাটতির অজুহাতে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও এখন বেশিরভাগ অটো রাইস মিলে চাল উৎপাদনে আবহাওয়ার কোনো প্রভাব নেই। এ ছাড়া বোরো ও আউশ ধানের বেশ সরবরাহ আছে। এ অবস্থায় দাম বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ নেই।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গত তিন দিনের ব্যবধানে খুচরায় সব ধরনের চাল কিনতে কেজিতে গড়ে পাঁচ টাকা বেশি গুনছেন ক্রেতারা। মাঝারি মানের চাল লতা ও বিআর-২৮ এখন ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা। বাজারে মোটা গুটি ও স্বর্ণা চাল তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। দু-একটি দোকানে বিক্রি হলেও তা এখন একই হারে বেড়ে ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আর সরু চাল মিনিকেটের কেজি ৫৮ থেকে ৬০ টাকায় পৌঁছেছে, যা ছিল ৫২ থেকে ৫৪ টাকা। মানভেদে নাজিরশাইল চাল বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। যে মানের নাজিরশাইল আগে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি ছিল, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। মোটা চালের দাম বেড়ে ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরের উত্তর পীরেরবাগ বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী মো. সোহেল জানান, করোনা সংক্রমণের শুরুতে চালের দাম কিছুটা বেড়েছিল। এর পর মৌসুমি চালের সরবরাহ বাড়তে থাকায় দাম আবার কমে আসে। এখন আবার মিল মালিকরা দাম বাড়াচ্ছেন। তিনি আরও জানান, চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় মোটা চালের কদর বেড়েছে। এ জন্য গত তিন দিন ধরে পাইকারি আড়তে অর্ডার দিয়েও মোটা চাল পাচ্ছেন না।
গতকাল মিল পর্যায়ে চালের দাম আরও বেড়েছে। ৫০ কেজির প্রতি বস্তা বিআর-২৮ চাল দুই হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা, মিনিকেট দুই হাজার ৬২৫ থেকে দুই হাজার ৭০০ টাকা ও নাজিরশাইল দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ হিসাবে মিলগেটে প্রতি কেজি বিআর-২৮ চাল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, মিনিকেট ৫২ থেকে ৫৪ টাকা ও নাজিরশাইল ৫৬ থেকে ৬০ টাকা দর দাঁড়ায়। অথচ খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা সিদ্ধ চালের দাম দেশে আসার পর ৩৪ থেকে ৪৫ টাকা কেজি হওয়ার কথা।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোসাম্মৎ নাজমানারা খানম সমকালকে বলেন, এখন চালের দাম বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। বোরো ও আউশ মৌসুমের পর্যাপ্ত ধান ও চাল কৃষক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে আছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশে চাল উৎপাদন বেড়েছে। বাজারে ধান ও চালের ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। হঠাৎ করে চালের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন, অসাধু চক্র চালের বাজার অস্থির করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এ জন্য বাজার অভিযান জোরদার করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাজারে সংকট সৃষ্টি এবং চালের বাজার অস্থির করার অপকৌশল নিয়ে দাম বাড়ালে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বাজার স্বাভাবিক রাখতে ৫০ লাখ পরিবারের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় দেড় লাখ টন চাল দেওয়া শুরু হয়েছে। খোলা বাজারে বিক্রি বাড়ানো হয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়বে। সরকারের হাতে ১৪ লাখ ১৮ হাজার টনের বেশি চাল মজুদ আছে। চালের কোথাও ঘাটতি নেই। এর পরও ঘাটতি হলে আমদানির অনুমতি আছে। চাল আমদানিতে শুল্ক্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুর রশিদ সমকালকে বলেন, বোরো মৌসুম শেষ দিকে এবং আউশের উৎপাদন কম হয়েছে। আমন ওঠার আগে বাজার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বাজারে চালের বেশ টান আছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চাল উৎপাদনও কম হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অনেক দিন ধরে সরকার আমদানির ঘোষণা দিলেও আমদানি করতে পারেনি। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা সেভাবে এগোয়নি। এ জন্য দেশে যে ধান-চাল আছে তা দিয়ে আমন পর্যন্ত চলতে হবে। তাছাড়া তুলনামূলক কম দাম দিয়ে সরকারের চাল সংগ্রহের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বাজারে প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, আমন ধান উঠতে এখনও দুই মাস বাকি। এ জন্য শুল্ক্ক তুলে দিয়ে আমদানি বাড়ানো জরুরি।
রশিদ অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী আব্দুর রশিদ বলেন, কিছু ব্যবসায়ী বাড়তি মজুদ করতে পারেন। এসব জায়গায় অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। ওই চাল বাজারে না এলে দাম ধরে রাখা কঠিন হবে। এ জন্য বাজার মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সীমিত আকারের হলেও আমদানি চাল এলে বাজারে ইতিবাচক চাপ তৈরি হবে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্য সচিব গোলাম রহমান সমকালকে বলেন, অসাধু চক্র সব সময় বাজার থেকে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে। এদের আরও কঠোরভাবে দমন করতে হবে। এবার সরকারি চাল সংগ্রহ কম হয়েছে। গুদামে অন্য বছরের চেয়ে মজুদ কম আছে। সে কারণে ব্যবসায়ীরা চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে করছেন। তারা অতি মুনাফা করার সুযোগ নিচ্ছেন। এ জন্য সরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি করে মজুদ বাড়ানো উচিত। তবে কোনোভাবে বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না। তিনি বলেন, অসাধু চক্রের কারসাজি রোধে কঠোর না হলে বারবার এমন হবে।
এবার সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল আট লাখ টন ধান সংগ্রহের। সংগ্রহ হয়েছে মাত্র দুই লাখ ১৯ হাজার ৩৫ টন বা ২৭ দশমিক ১২ শতাংশ। সিদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ লাখ টন। এর মধ্যে সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ছয় লাখ ৫২ হাজার ১৮২ টন বা ৬৫ দশমিক ২১ শতাংশ। আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দেড় লাখ টন। সংগ্রহ হয়েছে ৯৬ হাজার ৪৭২ টন বা ৬৪ দশমিক ৩১ শতাংশ।














বিষয় : অসাধু চক্র চালের বাজারেও

মন্তব্য করুন