সাক্ষাৎকার: আইডিএলসি এমডি

অর্থনীতির চেহারা বদলে দেবে বন্ডবাজার

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

আরিফ খান

আরিফ খান

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনতে কার্যকর বন্ডবাজার গড়ার বিকল্প নেই বলে মনে করেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান। তার মতে, কার্যকর বন্ডবাজার গড়তে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারি বন্ড যে কোনো দেশের মানুষকে বিনিয়োগে অভ্যস্ত ও আগ্রহী করে। সাধারণ মানুষ যখন বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়, তখন বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানও ব্যবসার প্রয়োজনে বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহে আগ্রহী হয়। তা ছাড়া দেশের বিপুলসংখ্যক আমানতকারী ইসলামী ব্যাংকিং পছন্দ করেন। তাদের কাছে বন্ড জনপ্রিয় করতে হলে শরিয়াহ অনুমোদিত সুকুক বন্ড আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরিফ খান বলেন, ব্যাংকে আমানতের বিপরীতে উচ্চ সুদহার ছিল, যা এখন অনেক কমে এসেছে। জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদহার না কমালেও এখানে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। এর ফলে বন্ডবাজার তৈরির পথে অর্ধেক কাজ হয়ে গেছে। এখন যাদের হাতে অলস টাকা আছে, তারা অপেক্ষাকৃত ভালো মুনাফা পেতে বিকল্প খুঁজবেন। এতদিন উপায় ছিল না বলে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করতেন। ব্যাংকের সুদহার কমে যাওয়ায় মানুষ বন্ডে বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবেন। সেকেন্ডারি শেয়ারবাজারে ট্রেজারি বিল ও বন্ড কেনাবেচার সুযোগ তৈরি হলে অনেকে এখানে বিনিয়োগ করবেন।
আইডিএলসির এমডি বলেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) অনেক ট্রেজারি বন্ড তালিকাভুক্ত হলেও তা কেনাবেচা না হওয়ার বড় কারণ হলো লেনদেনে ব্রোকারেজ ফি। প্রাথমিক বাজারে ট্রেজারি বন্ডে ব্যক্তি বিনিয়োগে কোনো খরচ নেই। তবে এ বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা সীমিত। সেকেন্ডারি শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হলে অনেক ক্রেতা-বিক্রেতা থাকবেন। যে কেউ ট্রেজারি বন্ড কিনতে পারবেন, বিক্রিও করতে পারবেন। ফলে বন্ডবাজার হলে একদিকে জনগণ সরকারকে ঋণ নিয়ে বেশি মুনাফা পাবে, অন্যদিকে সরকারি ব্যয় নির্বাহে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমবে।
বন্ডের সুদহার এখন কম এবং এ হারে বিনিয়োগ কতটুকু আকর্ষণ করা যাবে- এমন প্রশ্নের উত্তরে আরিফ খান বলেন, করোনা মহামারির মধ্যে এখন সার্বিকভাবে বিনিয়োগ করার সুযোগ কম। ফলে মানুষ এখন সুদ কম হলেও বন্ডে বিনিয়োগ করবেন। তিনি বলেন, ট্রেজারি বিল ও বন্ড যে কেউ কিনতে পারেন- এ তথ্য সিংহভাগ মানুষই জানে না। ইদানীং অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। ব্যাংকগুলোকে আলাদা ডেস্ক স্থাপন করতে বলেছে। তবে সেকেন্ডারি বাজারে লেনদেন হলে দ্রুত জনপ্রিয় হবে। কম ঝুঁকির বিনিয়োগ বলে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের একটা অংশ বন্ডে বিনিয়োগে আসবেন। ফলে শেয়ারবাজারের অস্থিরতা কমবে।
তিনি বলেন, সেকেন্ডারি বাজার কার্যকর হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে আসবে। আইডিএলসিও এ বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করবে। বড় বড় কোম্পানি ব্যাংক থেকে ঋণ না দিয়ে বন্ড ইস্যু করে সাধারণ মানুষের থেকে অর্থ সংগ্রহ করবে। এতে কোম্পানিগুলো যেমন অপেক্ষাকৃত কম সুদে অর্থ পাবে, আবার মানুষও ব্যাংকের থেকে বেশি সুদ পাবে। বিশ্বব্যাপী এমনই হয়। বন্ডবাজার হলে ব্যাংকিং খাতের আমূল পরিবর্তন হবে।
আরিফ খান বলেন, বন্ডবাজার হলে সরকারের লাভ বেশি। তাই এ বাজার গড়তে সরকারকে সবচেয়ে বেশি কাজ করতে হবে। সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। যত টাকা চেয়েছিল, তত পায়নি। কারণ, মানুষ এখনও বন্ড বিষয়ে ভালো জানে না। তবে জনপ্রিয় নয় বলে থেমে গেলে চলবে না। শুরুতে সমস্যা থাকবে। শুরু করলে অভিজ্ঞতা থেকে সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাবে। এভাবে এক সময় আমাদের কার্যকর বন্ডবাজার হবে। দেশের অর্থনীতির চেহারাই বদলে যাবে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশের উন্নতির পেছনে বন্ডবাজারের বড় অবদান রয়েছে।
তিনি বলেন, বন্ডবাজার কার্যকর করতে সবার আগে সরকার এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন একটি উন্নয়ন প্রকল্পে বন্ড ছেড়ে টাকা তুলতে সরকারের অনুমোদন নিতে হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেই অন্য কোনো উৎস থেকে টাকা সংগ্রহ করতে পারে না। এ জন্য আইন সংশোধন করতে হচ্ছে। বিশ্বের সব বড় শহরগুলোর কর্তৃপক্ষ মিউনিসিপ্যাল বন্ড ইস্যু করে অর্থ তোলে। সে অর্থে উন্নয়ন কাজ হয়। তাদের সরকারের অর্থে নির্ভরতা কম। এটাই সবচেয়ে ভালো উপায়। আমাদের এ পথে যেতে হবে। তার মতে, দেশের জনগণের একটা বড় অংশ ধর্মভীরু। এ জন্য ইসলামী ব্যাংকগুলোতে আমানত বেশি। এসব বিনিয়োগকারীকে মাথায় রেখে সুকুক অর্থাৎ ইসলামী বন্ড আনতে হবে। মালয়েশিয়ায় সুকুক বন্ডের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ হয়।