করোনাকালে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেড়েছে ব্যাপক। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ব্যাংকগুলো উদ্বৃত্ত ডলার বিক্রি করছে প্রচুর। এতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়ে গেছে। এ কারণে টাকার দরপতন ঠেকাতে বাজার থেকে প্রচুর ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শুধু জুলাই থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কেনা হয়েছে ৪২০ কোটি ডলার। চলতি বছরের শুরু থেকে কেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০৮ কোটি ডলার। অথচ এর আগের তিন বছরে ব্যাপক চাহিদার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে নিয়মিত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাভাইরাস মহামারির শুরুর দিকে ধস নামলেও পরে রপ্তানি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কমে যাওয়ার আশঙ্কার বদলে রেমিট্যান্স বেড়েছে ব্যাপক। অন্যদিকে আগের সময়ের চেয়ে আমদানি কমছে। অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। রপ্তানিতে এক শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি রয়েছে। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এ সময়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রচুর ঋণও এসেছে। আবার বেসরকারি খাতে নেওয়া স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর কারণে অনেকে আপাতত ঋণ পরিশোধ করছেন না। সব মিলে অধিকাংশ ব্যাংকের হাতে এখন ডলার উদ্বৃত্ত রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত ডলার কেনার কারণে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে গত বছরের মতো ডলারের দর ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অবশ্য গত জুন মাসের দিকে আন্তঃব্যাংকে সর্বোচ্চ ৮৪ টাকা ৯৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি হয়েছিল।

ব্যাংকের কাছে ডলার উদ্বৃত্ত থাকলে তা কিনে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেননা প্রতিটি ব্যাংকের ডলার ধারণের একটি সীমা রয়েছে। কোনো ব্যাংকের আমদানির দায় পরিশোধের তুলনায় প্রবাসী রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বেশি হলে ওই ব্যাংকে ডলার উদ্বৃত্ত হয়। এক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত থাকা ব্যাংক প্রথমে সংকটে থাকা ব্যাংকের কাছে বিক্রির চেষ্টা করে। তখন কোনো ব্যাংকের আগ্রহ না থাকলে অর্থাৎ মুদ্রাবাজারে বিক্রি করতে না পারলে স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক তা কিনে নেয়।

এ প্রবণতা প্রসঙ্গে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হালিম চৌধুরী সমকালকে বলেন, সরকারের ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা, হুন্ডি প্রবণতা কমার কারণে প্রবাসী আয় ব্যাপক বাড়ছে। আবার বিদেশ থেকে মানুষের আসার পরিমাণ কমে যাওয়ায় আগে সবাই নিজেরা যে ডলার আনতেন তা কমে গেছে। এই ডলারও এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে। এসব কারণে রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। আবার এ সময়ে রপ্তানিতে কিছুটা হলেও প্রবৃদ্ধি আছে। তবে আমদানি কমছে। এ অবস্থায় ডলার নিয়ে ব্যাংকগুলো খুব স্বস্তিদায়ক অবস্থানে আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

করোনার প্রভাব শুরুর আগ পর্যন্ত সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন প্রায়ই সরকারি মালিকানার কয়েকটি ব্যাংক ডলার কিনতে ধরনা দিচ্ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। তবে চলতি বছরের শুরু থেকে পরিস্থিতি উল্টো হয়ে যায়। জানুয়ারি থেকে গত বুধবার পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৫০৮ কোটি ডলার কিনে বাজারে ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি সরবরাহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সময় মাত্র ৪২ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিক্রি করে। অন্যদিকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রথম দুই প্রান্তিকে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে ৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার কেনা হয়। এর পর থেকে কোনো ব্যাংক ডলার কেনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসেনি। অথচ ২০১৯ সালের চিত্রটা ছিল ঠিক এর বিপরীত। গত বছর বিভিন্ন ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কিনেছিল ১৬২ কোটি ১০ লাখ ডলার। এর আগের বছর ২৩৭ কোটি ১০ লাখ এবং ২০১৭ সালে ১২৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কেনে। এ তিন বছরের মধ্যে শুধু ২০১৭ সালের শুরুর দিকে কয়েকটি ব্যাংক সাড়ে চার কোটি ডলার কিনেছিল।

ব্যাংকাররা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে। ডলার বিক্রি করলে রিজার্ভ কমে। কয়েক মাস আগেও প্রচুর ডলার বিক্রির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দীর্ঘদিন ধরে ৩১ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ওঠানামা করছিল। বাংলাদেশে করোনার প্রভাব শুরুর পর গত মার্চ শেষে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, গত কয়েক মাসে তা বেড়ে ৪১ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। সম্প্রতি এশিয়ান কিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দায় পরিশোধের পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। এর আগে ২০১১-১২ অর্থবছর শেষে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১০ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার, মাত্র পাঁচ বছরে তা তিনগুণ বেড়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষে ৩০ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। এর পর রিজার্ভ আর সেভাবে বাড়েনি।