নতুন বছরে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে দেশের শেয়ারবাজার। একের পর এক টিকা আবিস্কার এবং এর প্রয়োগ শুরুর খবরে বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় পুরোনো গতি ফিরবে। ব্যবসা বাড়লে বাড়বে কোম্পানির মুনাফা। এ আশায় পুরোনো বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ নতুন করে বিনিয়োগে ফিরছে। আসছেন নতুনরাও। বিনিয়োগকারীদের আশায় ভর করে নতুন বছরের প্রথম কার্যদিবসে এক অর্থে উড়াল দিয়ে যাত্রা করেছে শেয়ারবাজার। গতকাল রোববার বছরের প্রথম কার্যদিবসে দেশের দুই শেয়ারবাজারে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। স্বাভাবিক লেনদেন দিনে এর আগে এর তুলনায় বেশি মূল্যের শেয়ার কেনাবেচা হয়েছিল চার বছর আগে ২০১৭ সালের ২৪ জানুয়ারি।

গতকাল উভয় বাজারের ৭০ শতাংশের বেশি শেয়ারের বাজারদর বেড়েছে। এতে প্রধান মূল্য সূচকগুলো বেড়েছে ৪ শতাংশের ওপর। স্বাভাবিক লেনদেন বিবেচনায় (বড় ধরনের ব্লক লেনদেন ছাড়া) এ উত্থানও সর্বশেষ এক বছরের সর্বোচ্চ। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২১৬ পয়েন্ট বেড়েছে। সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬১৮ পয়েন্টে। ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকার শেয়ার। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক সিএসসিএক্স বেড়েছে ৪০৬ পয়েন্ট। সূচক বেড়েছে। দুই বাজার মিলে লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া অন্তত ৫২টি গতকাল সর্বোচ্চ যে দরে (সার্কিট ব্রেকার) কেনাবেচা হওয়ার সুযোগ ছিল, ওই দরেই কেনাবেচা হয়েছে। ৫ শতাংশের ওপর বাজারদর বেড়েছে ৮৫ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের। এতে বাজার মূলধন অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চার লাখ ৬৪ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকায় উঠেছে।

নতুন বছরের প্রথম লেনদেন দিনের এমন উত্থানে স্বভাবতই শেয়ারবাজার-সংশ্নিষ্ট সবাই খুশি। তবে সতর্কভাবে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিএসইসির চেয়ারম্যানসহ শেয়ারবাজার বিশ্নেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, এক দিনে দুই হাজার কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন এবং সূচকের ৪ শতাংশ বৃদ্ধি খুশি হওয়ার মতোই খবর। কিন্তু সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ বড় বৃদ্ধির পর বড় পতনও হতে পারে।

আবু আহমেদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির বেশ কিছু উদ্যোগ ভালো। তবে ব্রোকারেজ শাখা খোলা এবং ডিজিটাল বুথ স্থাপনের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে শেয়ারবাজারকে নিয়ে গেলে বিনিয়োগে অনভিজ্ঞ অনেকে ঢুকে পড়বেন। এতে বড় ধরনের চাহিদা তৈরির কারণে শেয়ারদর অযৌক্তিক পর্যায়ে চলে গিয়ে পতনের শঙ্কা থাকবে। এ কারণে টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা করা উচিত। ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো উচিত।

লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী খন্দকার সাফফাত রেজা সমকালকে বলেন, বছরের প্রথম দিনের উত্থান হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। গত বছরের শেষদিকে বাজারে উত্থান শুরু হয়। এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে করোনাভাইরাস মহামারিকে রুখে দিতে টিকা আবিস্কার এবং দ্রুত এর প্রয়োগ শুরুর খবর। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে শেয়ারবাজারে সুশাসন ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির আমূল পরিবর্তন। বিশেষত বিনিয়োগকারীদের কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেবেন না এবং তাদের কষ্টার্জিত অর্থের বিনিয়োগ নিয়ে কেউ নয়-ছয় করতে পারবে না- বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম কমিশনের এমন আশ্বাস ও সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে। এ আস্থার পরিবেশ বাজারকে এগিয়ে নিচ্ছে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিগত বছরের শেষ সপ্তাহে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সব শেয়ারের বাজারমূল্য বেড়েছে ২২ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকার বেশি। গত এক মাসেই বেড়েছে ৬৮ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। এ সময়ে তালিকাভুক্ত রবি, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স এবং ডোমিনোজ স্টিলের অংশ বাদ দিলেও এ সময়ে সব শেয়ারের বাজারদর বেড়েছে ৫২ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। কিছু কোম্পানির শেয়ারদর দুই থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে। এমনটা দেখে বিগত এক দশকে যারা লাভের আশায় বিনিয়োগ করতে এসে পুঁজি হারিয়েছেন, তারাই এখন লোকসান কাটিয়ে কিছুটা হলেও মুনাফা দেখছেন।

শেয়ারবাজার-সংশ্নিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক ও সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজার শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনকে প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করে। বিগত বছরগুলোতে যেসব ইস্যু বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরায়, সেগুলোর সমাধানে উদ্যোগ নেয় বর্তমান বিএসইসি। বিশেষত অতীতে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের যারা শেয়ার বিক্রি করে পালিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী করেছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালক পদে থাকতে হলে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিকে এককভাবে কমপক্ষে ২ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে আইনি বিধান ২০১১ সালে প্রচলন করে বিগত কমিশন। কিন্তু দায়িত্ব পালনের ৯ বছরেও তা কার্যকর করতে পারেনি। নতুন কমিশন মাত্র ছয় মাসে তা কার্যকর করে দেখিয়েছে।

দেশের শেয়ারবাজারের বড় সমস্যা ছিল মানহীন আইপিও দিয়ে বাজার সয়লাব হওয়া। বর্তমান কমিশন গত মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত ১৪ কোম্পানির আইপিও অনুমোদন করেছে। তবে বাতিল করেছে তার থেকেও বেশি। এর বাইরে বন্ধ ও লোকসানি কোম্পানি বা লোকসান দেখিয়ে যেসব কোম্পানির উদ্যোক্তারা নিজেরা লাভবান হচ্ছেন এবং বিনিয়োগকারীদের ঠকাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু সবার মধ্যে আশা জাগাচ্ছে। এরই মধ্যে তার সুফল দেখছেন শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগকারীরা। তাই নতুন বছর ২০২১ সালে শেয়ারবাজারে সুবাতাস বইবে- এমনটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন তারা।

বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম সমকালকে বলেন, তিনি গত বছরের ১৭ মে যখন বিএসইসির চেয়ারম্যান পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, সেদিন করোনা মহামারির কারণে দেশজুড়ে লকডাউন চলছে। লকডাউনের মধ্যে শেয়ারবাজার বন্ধ ছিল। লেনদেন শুরুর পর যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সমস্যার পাহাড় পেয়েছেন। তিনি জরুরি ভিত্তিতে যা আগে সমাধান করা দরকার, সেদিকেই গেছেন।

বছরের প্রথম দিনে শেয়ারবাজারের বড় উত্থানকে স্বাগত জানিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, এটা বিএসইসির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রকাশ। তাদের আস্থা আমাদের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে প্রেরণা জোগাবে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রাসী মনোভাব এবং হুজুগে অবস্থানের পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, শেয়ারে বিনিয়োগ অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিটা বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে। যারা ঝুঁকি নেওয়া পছন্দ করেন না, তাদের জন্য শিগগিরই কার্যকর বন্ড বাজার আসছে। সেখানে শরিয়াহ বন্ডও কেনাবেচা হবে। সরকার এরই মধ্যে সুকুক বন্ড চালু করেছে। জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করলে সবার জন্য ভালো একটি বাজার হবে।