রাজধানী ঘিরে বৃত্তাকার রেলপথ (সার্কুলার রেল) নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় প্রকল্পের সমীক্ষা হয়েছে। সে অনুযায়ী, ৮ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা) ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮০ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার ইলেকট্রিক রেলপথ নির্মাণের কাজে। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ৮৭৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সমীক্ষায় প্রকল্প বাস্তবায়নে যে পরিমাণ আয়-ব্যয় ও যাত্রী সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্নিষ্টরা। প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে তাদের।
রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে একই পথে ছয় লেনের 'ইনার সার্কুলার' রুট নির্মাণের প্রকল্প রয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ)। ওই সড়কের পাশ দিয়েই রেলপথ নির্মাণ করতে চায় রেলওয়ে। সড়ক ও রেলপথ পাশাপাশি নির্মাণের পরিকল্পনা অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে- তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ পেয়েছে।
গতকাল বুধবার রেলভবনে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের সভাপতিত্বে এক সভায় সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। মতামত জানাতে সরকারের অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিদেরও এতে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সভা সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, ৭১ হাজার কোটি টাকায় রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমীক্ষা যাচাই প্রকল্পের পরিচালক মনিরুল ইসলাম ফিরোজী সমকালকে বলেছেন, প্রকল্পটি বিশাল। আর্থিকভাবে না হলেও সার্বিক অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি লাভজনক হবে। সওজ'র এক্সপ্রেসওয়ের পাশে রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনার বিষয়ে তার মন্তব্য হচ্ছে, সড়ক ও রেলের যাত্রী আলাদা।
সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সার্কুলার রেলপথের ৭০ দশমিক ৯৯ কিলোমিটার হবে এলিভেটেড (উড়াল)। বাকি ৯ দশমিক ৯ কিলোমিটার পাতাল। প্রস্তাবিত এ রেলপথে ২৪টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে ২১টি এলিভেটেড এবং তিনটি পাতাল। ১১টি স্টেশন যুক্ত হবে মেট্রোরেলের সঙ্গে। একটি সদরঘাটের সঙ্গে।
প্রস্তাবিত সার্কুলার রেলপথের স্টেশনগুলো হবে- ধউর, উত্তরা, চিড়িয়াখানা, চিড়িয়াখানা দক্ষিণ, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, কামরাঙ্গীরচর, সদরঘাট, পোস্তগোলা, পাগলা, ফতুল্লা, চাষাঢ়া, চিত্তরঞ্জন, আদমজী, সিদ্ধিরগঞ্জ, ডেমরা, ত্রিমোহনী, বেরাইদ, পূর্বাচল, পূর্বাচল উত্তর, ত্রিমুখ, টঙ্গী ও বিশ্ব ইজতেমা মাঠ। অর্থাৎ বিশ্ব ইজতেমা মাঠ থেকে শুরু হয়ে পুরো ঢাকা ঘুরে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ফের বিশ্ব ইজতেমায় এসে শেষ হবে এ রেলপথ। গাবতলী, সদরঘাট ও পোস্তগোলা স্টেশন হবে পাতালে।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এ রেলপথে ২০৩৫ সালে দৈনিক ১০ লাখ ৬৫ হাজার এবং ২০৫৫ সালে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার যাত্রী হবে। বছরে ৩৯ কোটি যাত্রী পরিবহন করবে সার্কুলার রেলপথ। তবে এ সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, সারাদেশে দুই হাজার ৮০০ কিলোমিটার রেলপথে পুরো বছরে সাড়ে ৯ কোটি যাত্রী হয়। বর্তমান প্রবৃদ্ধি অনুযায়ী বাড়লেও ২০৩৫ সাল নাগাদ ৪০ কোটি যাত্রী হবে না। আর ৮০ কিলোমিটার বৃত্তাকার রেলপথে বছরে ৩৯ কোটি যাত্রীর পরিকল্পনা তো আকাশকুসুম। তবে প্রকল্প পরিচালক মনিরুল ইসলাম ফিরোজী বলেছেন, ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা ও ট্রাফিক পূর্বাভাস অনুযায়ী যাত্রীর সংখ্যা প্রাক্কলন করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতেই হিসাব করা হয়েছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, সার্কুলার রেলপথ হবে স্ট্যান্ডার্ড গেজের ইলেকট্রিক ট্রাকশন। অর্থাৎ বিদ্যুতে চলবে ট্রেন। সার্কুলার রেলপথের পুরোটা একবার ঘুরতে ট্রেনের ৬০ দশমিক ৭ মিনিট সময় লাগবে। প্রতিদিন ১৬৪ জোড়া অর্থাৎ ৩২৮টি ট্রেন চলতে পারবে।
বৃত্তাকার রেলপথের সম্ভাব্য রুট নির্ধারণ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে সিয়ুয়ান সার্ভে অ্যান্ড ডিজাইন গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বেটস কনসাল্টিং সার্ভিসেস লিমিটেড ও ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড অ্যাডভাইজারস লিমিটেড যৌথভাবে এ সমীক্ষা করেছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এ সমীক্ষা করা হয়।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বৃত্তাকার রেলপথ হলে ঢাকা শহরের ভেতরে প্রবেশ না করেই যাত্রীরা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারবেন। তাদের যানজটের দুর্ভোগ পোহাতে হবে না। শহরের ভেতরেও যানজট কমবে।
সার্কুলার রেলপথ নির্মাণে যে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে তার মধ্যে চার দশমিক ০৬৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে শুধু রেলপথ নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিতে। অন্যান্য খরচে যাবে এক দশমিক ২৯৩ বিলিয়ন ডলার। ট্রেন কেনায় আধা বিলিয়ন ডলার এবং রেলপথ নির্মাণে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ধরা হয়েছে এক দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। বাকি খরচ ধরা হয়েছে পরিচালনা ও বিবিধ ব্যয়ে।
সমীক্ষায় প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া প্রস্তাব করা হয়েছে তিন টাকা ৮০ পয়সা। এর সঙ্গে ভিত্তি ভাড়া যোগ হবে ৩০ টাকা ৬ পয়সা। সব মিলিয়ে বৃত্তাকার রেলপথের পুরোটা ভ্রমণ করলে ৩৩৭ টাকা ভাড়া আসবে। ২০৩৫ সালে বছরে তিন হাজার ১৬০ কোটি টাকা আয় হবে। যদিও এ হিসাব বাস্তবসম্মত নয় জানিয়ে রেলের কর্মকর্তারা বলেছেন, সারাদেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করে রেল বছরে দেড় কোটি টাকার মতো আয় করতে পারে। সেখানে একটি লাইনের বছরে তিন হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব নয়। তারা বলছেন, ৭১ হাজার কোটি টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো অবস্থা রেলের নেই। সমীক্ষার জন্য যে ২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, তা জলেই গেছে।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নির্মাণ কাজ শুরুর পর ছয় বছর লাগবে সার্কুলার রেলপথ তৈরিতে। তবে কবে নাগাদ কাজ শুরুর পর্যায়ে রেলওয়ে পৌঁছাতে পারবে তা নিশ্চিত নয়। কারণ, প্রকল্প ব্যয় কীভাবে আসবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। প্রকল্প পরিচালক বলেছেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) সার্কুলার রেলপথ হবে।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি সার্কুলার রেলপথ পিপিপির মাধ্যমে নির্মাণ করতে বলে। তবে এখনও কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান সার্কুলার রেলপথে বিনিয়োগের আগ্রহ জানায়নি।