স্বাধীনতার পর মানুষের খাদ্য জোগানোই ছিল দেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আর প্রধান খাদ্য চাল, শাকসবজি ও মাছ উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় এখন বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর দেশে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। এখন ১৭ কোটির বেশি। ৫০ বছরে মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। শিল্প ও আবাসন বৃদ্ধির ফলে আবাদযোগ্য জমি কমেছে। অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তা বেড়েছে।
প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনে দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। কোনো কোনো বছর উদ্বৃত্ত চালও উৎপাদন হচ্ছে। যদিও বন্যা, খরা বা অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে চাল আমদানির প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ গড়ে তোলার ফলে আমদানি নিয়ে ভাবতে হয় না। সবজি, মাছ, মাংস, ফল উৎপাদনেও ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনও কিছু ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা রয়েছে। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, ডাল, গম ও মসলাজাতীয় পণ্যে আমদানি নির্ভরতা বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ শীর্ষক বইয়ে বলা হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাটি ও মানুষকে কাজে লাগিয়ে সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন। তিনি খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য উৎপাদনে জোর দিয়েছিলেন। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয় কৃষি উন্নয়নে। কৃষিতে ভর্তুকি, মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন, সেচ ব্যবস্থাপনা, পরিমিত বালাইনাশক ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়ে কৃষিকে আধুনিক করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। কৃষি উন্নয়নে গড়ে তুলেছিলেন বিভিন্ন সংস্থা। ওই সব সংস্থা উদ্ভাবনী ভূমিকা কৃষি উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের যুগোপযোগী পরিকল্পনা, কৃষকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন সময়ে সরকার কৃষকের ঋণ মওকুফ, ভূমিহীনদের মধ্যে খাসজমি বণ্টন, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার, নতুন নতুন বীজ উদ্ভাবন, স্বল্পমূল্যে সার সরবরাহ, সেচ সুবিধা, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে। সরকারের এ ধরনের নীতি কৃষি উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
৫০ বছরে দেশে চাল উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি। স্বাধীনতার বছর ১৯৭০-৭১ সময়ে দেশে এক কোটি আট লাখ টন চাল উৎপাদন হয়। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে চালের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ৬৬ লাখ টন। চলতি অর্থবছরে উৎপাদন গত বছরের চেয়ে বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। দেশি জাতকে উন্নত করে বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন। শস্যের বহুমুখীকরণ হয়েছে। বেড়েছে উৎপাদনশীলতাও। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগ-সহিষুষ্ণ শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম।
বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, বিভিন্ন কারণেই খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। এর মধ্যে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সেচকাজে শ্যালো টিউবওয়েলের সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ, সারে ভর্তুকি এবং বোরো ও আমনে উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন অন্যতম। আলু উৎপাদনে কোল্ডস্টোরেজ ব্যবস্থা ভূমিকা রেখেছে। শাকসবজি উৎপাদনে বাজার চাহিদা ভূমিকা রেখেছে। তবে ধান, চালসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এগুলো দূর করা দরকার। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে সহযোগিতা দরকার। এতে সামগ্রিক উৎপাদন আরও বাড়বে।
এদিকে, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফলে গমের চাহিদা বেড়েছে এবং উৎপাদনও বেড়েছে। স্বাধীনতার সময়ে দেশে এক লাখ টন গম উৎপাদন হতো। বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ টন গম উৎপাদন হচ্ছে দেশে। তবে পণ্যটির আমদানি নির্ভরতা রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সবটা দেশে উৎপাদন হচ্ছে না। এ সময়ে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে আলু উৎপাদনে। স্বাধীনতার সময়ে দেশে সাড়ে আট লাখ টন আলু উৎপাদন হতো। বর্তমানে প্রায় এক কোটি টন আলু উৎপাদন হচ্ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে আলু। ভুট্টার উৎপাদনও অনেক এগিয়েছে।
সবজি ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে। গত অর্থবছরে দেশে বছরে প্রায় এক কোটি ৮৪ লাখ টন শাকসবজি উৎপাদন হয়। চলতি অর্থবছরে এক কোটি ৯৭ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। শীতকালের পাশাপাশি গ্রীষ্ফ্মকালেও সবজি উৎপাদন হচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। স্বাদুপানির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বছরে ৯ শতাংশ হারে বাড়ছে এ জাতের মাছের উৎপাদন। অন্যদিকে, ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে। বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন হয়।

মন্তব্য করুন