যেসব খাত থেকে সরকার বেশি রাজস্ব পেয়ে থাকে তার মধ্যে সিগারেট অন্যতম। উচ্চ করহারের কারণে এ খাত থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব যেমন আসছে, তেমনি রাজস্ব ফাঁকির ঘটনাও অহরহ। এ জন্য রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) সংশ্নিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ী ও বিশ্নেষকরা। তারা বলছেন, নকল ঠেকাতে ব্যান্ডরোল ব্যবস্থা তুলে দিতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানি গঠন ও পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় যেসব সংস্থার অনুমোদন দরকার, সেগুলো যথাযথভাবে পরিপালন হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। এনবিআরের কাছে সিগারেট কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহের বিস্তারিত তথ্য থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
ট্যাক্স স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল নকল ও পুনরায় ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা বেশি ঘটছে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন থেকে ট্যাক্স স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল তুলে নেওয়াসহ বিভিন্ন উপায়ে কর ফাঁকি দিচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানি। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারে প্রচলিত নামি ব্র্যান্ড নকল করে বাজারজাত করার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। ভ্যাট গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ধরা পড়ে। প্রাথমিকভাবে কারখানা বন্ধ ও সিগারেট জব্দ করা হলেও কিছুদিন পরেই ওইসব কোম্পানি পুনরায় তাদের কারখানা চালু করে এবং তাদের ব্র্যান্ডগুলো বাজারজাত শুরু করে।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের প্রসার ঠেকাতে কঠোর নীতির অভাব রয়েছে। মূসক ও সম্পূরক শুল্ক্ক আইন-২০১২-এ সিগারেটের রাজস্ব ফাঁকি রোধের উদ্যোগও যথেষ্ট নয়। চলতি অর্থবছরে এনবিআর সিগারেটের উৎপাদকের জন্য ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ট্যাক্স স্ট্যাম্পের সমন্বয় বাধ্যতামূলক করে দেয়। এর ফলে একটি কোম্পানি কী পরিমাণ ট্যাক্স স্ট্যাম্প দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন থেকে তুলছে এবং কী পরিমাণ সিগারেট উৎপাদন করেছে তার একটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ত্রৈমাসিক এ সমন্বয় শুধু বড় কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়েছে। বেশিরভাগ উৎপাদকের ক্ষেত্রে এ নীতি বাস্তবায়ন করা যায়নি।
বৈধ উৎপাদকরা মনে করেন, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক্ক
আইনে কিছু কঠোর ধারা সংযোজন করা উচিত। যেমন-স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের উৎপাদন আটকাতে শেল অ্যান্ড স্লাইড ফরম্যাট তথা ব্যান্ডরোল ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা দরকার। এতে রাজস্ব আদায়ে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না। কারণ বৈধ প্রস্তুতকারকরা তাদের ব্যান্ডগুলোর প্রায় ৯০ ভাগ হিঞ্জ লিড প্যাকেট দিয়ে মোড়কজাত করে থাকে এবং প্যাকেটের গায়ে ট্যাক্স স্ট্যাম্প লাগায়। দেখা গেছে, রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের ব্র্যান্ডগুলো এখন ২০ শলাকার নকল/পুনর্ব্যবহূত ট্যাক্স স্ট্যাম্প আবদ্ধিত প্যাকেটে পাওয়া যাচ্ছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, তাদের ট্যাক্স স্ট্যাম্পযুক্ত প্যাকেট উৎপাদন করার ক্ষমতা আছে। ব্যান্ডরোল নকল করা তুলনামূলকভাবে সহজ। সুতরাং ব্যান্ডরোলের ব্যবহার যদি সিগারেটের জন্য বন্ধ করে দেওয়া যায় তাহলে তারা নতুন নিরাপত্তা বিশিষ্ট ট্যাক্স স্ট্যাম্প ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন। জানা গেছে, প্রতি মিলিয়ন পিস ব্যান্ডরোল উৎপাদনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের খরচ হয় আনুমানিক ১১ টাকা এবং ট্যাক্স স্ট্যাম্পের ক্ষেত্রে আনুমানিক ৯ টাকা। ব্যান্ডরোলের ব্যবহার বন্ধ করলে একদিকে সরকারের খরচ কমবে, অন্যদিকে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের প্রসারও কিছুটা ঠেকানো যাবে। এখানে উল্লেখ্য, সম্প্রতি বগুড়া এবং রংপুরে নকল ব্যান্ডরোল ফ্যাক্টরি পাওয়া যায় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।
বর্তমানে এনবিআরের কাছে দেশের সিগারেট উৎপাদনকারী কোম্পানি ও তাদের মেশিনের সংখ্যা সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য নেই। সংশ্নিষ্টরা মনে করেন, রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে হলে কমিশনারেট ওয়ারি ডাটাবেজের দরকার হবে। প্রতি কমিশনারেট যদি ৬ মাস অন্তর তাদের অধীন সিগারেট কোম্পানিগুলোর মেশিন সংখ্যা ও উৎপাদন ক্ষমতার তথ্য হালনাগাদ করে তাহলে এনবিআরের কাছে একটি ডাটাবেজ গড়ে উঠবে। এই ডাটাবেজের ভিত্তিতে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি নতুন মেশিন কেনে তাহলে তার জন্য কমিশনারেট থেকে অগ্রিম অনুমতি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। অন্যদিকে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক্ক আইনের ৫৮ ধারায় তামাকজাত পণ্যের জন্য যে বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে তার অধীনে মূসক ফাঁকি প্রতিরোধে বিশেষ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। এ ধারায় পণ্যের নায্যবাজার মূল্য নিশ্চিত করার পন্থা বিষয়ে বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, চাল ও তেলের মিলের আড়ালে সিগারেট কারখানা গড়ে উঠছে। সুতরাং সিগারেট কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সঠিক নিয়মনীতি করা দরকার। যেগুলো একটি কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করবে। বর্তমানে অনেক সিগারেট কোম্পানি স্থানীয় কমিশনারেট থেকে শুধু ভ্যাট লাইসেন্স নিয়ে তাদের ব্যবসা কার্যক্রম শুরু করে। অথচ সিগারেট কারখানা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি দিতে হলে স্থানীয় ভ্যাট কমিশনারকে অবশ্যই ট্রেড লাইসেন্স, কলকারখানা অধিদপ্তরের ফ্যাক্টরি লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, অগ্নিনির্বাপণ লাইসেন্স, বয়লার ও বিস্ম্ফোরক লাইসেন্স, ভবনের নকশার অনুমোদনপত্রের কপি অবশ্যই জমা নিতে হবে। এসব সনদ যে প্রতিষ্ঠানের থাকবে তারাই ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন পাবে। সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১৯টি লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়। রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া কোম্পানিগুলো এসব নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করে না। ২০১৯ সালে চট্টগ্রামের ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকোকে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ৮২ লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এছাড়া কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে একটি বাদাম তেলের কারখানার ভেতর সিগারেট উৎপাদনের সন্ধান পাওয়া যায়, যাদের পরিবেশ ও অন্যান্য ছাড়পত্র ছিল না। এখন আবার ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন অনলাইনে হওয়ায়, অবৈধ সিগারেট উৎপাদনকারীরা খুব সহজেই ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন করে ফেলে এবং নকল পণ্য বানাতে পারে। সিগারেট কোম্পানির জন্য এই ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন প্রসেস ম্যানুয়াল হওয়া এবং এনবিআরের কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা উচিত।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে গত ২৫ মার্চ ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ সিগারেট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনও সিগারেটে এসব নকল ট্যাক্স স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোলের ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ব্যাপারে এনবিআরকে আহ্বান জানায়। তারা বলেছেন, তিন বছর ধরে এনবিআর নিরলসভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের প্রসার ঠেকাতে। দুর্ভাগ্যবশত এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিগারেট বাজারে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিক্রি হচ্ছে, যার ফলে সরকার বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি থেকে ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। বাংলাদেশ বিড়ি অ্যাসোসিয়েশনও এ ব্যাপারে একমত পোষণ করে এবং বলে যে সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া বিড়ি কারখানার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এর ফলে, পুরোনো বিড়ি ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের প্রস্তাবে এনবিআরকে আহ্বান জানান, যেন নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।