রাজশাহীর ঐতিহ্যের কথা উঠলে সিল্ক কাপড়ের নাম সবার আগে চলে আসে। চাকচিক্য ও ঔজ্জ্বল্যে যা অতুলনীয়। রাজশাহী সিল্ক অত্যন্ত কোমল ও আরামদায়ক। শীত ও গ্রীষ্ম সব ঋতুর উপযোগী রেশমের তৈরি এ কাপড়। খুশির খবর, দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্ক এখন ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে আগামী ২৬ এপ্রিল বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবসে।

আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ববিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) নিয়ম মেনে রাজশাহী সিল্ককে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার বিভিন্ন ধাপ শেষ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডকে এই জিআই স্বত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজশাহী সিল্ক উৎপাদকদের তালিকা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে চাহিদা অনুযায়ী আরও উৎপাদককে তালিকায় সংযোজন করা হবে। রেশম উন্নয়ন বোর্ডের সুপারিশ বা প্রত্যয়নের মাধ্যমে তাদের আলাদা নিবন্ধন সনদ দেওয়া হবে।

রাজশাহী সিল্ককে জিআই পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে ২০১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আবেদন করা হয়। নানা প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশের জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিতে গত ৬ জানুয়ারি জার্নাল প্রকাশ করা হয়। এর দুই মাসের মধ্যে কোনো আপত্তি এলে তা নিষ্পত্তি করে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গত ৬ মার্চ আপত্তি উত্থাপনের সময় শেষ হয়েছে এবং এ বিষয়ে অন্য কোনো পর্যায় থেকে আপত্তি আসেনি। ফলে রাজশাহী সিল্ক্ক এখন বাংলাদেশের জিআই পণ্য।

ডব্লিউআইপিওর নিয়ম অনুযায়ী জিআই নিবন্ধন সনদ দেওয়ার দায়িত্ব শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি)। অধিদপ্তরের নিবন্ধক আবদুস সাত্তার সমকালকে বলেন, আগামী ২৬ এপ্রিল বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবসে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকাই মসলিনের পাশাপাশি রাজশাহী সিল্কের জিআই সনদ হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের ঐতিহ্যবাহী এ পণ্যের জিআই স্বীকৃতি নতুন করে বিশ্ববাজারে এর ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। জিআই হিসেবে ব্র্যান্ডিং হলে একদিকে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে পণ্যের দাম বেশি পাওয়া যাবে।

বর্তমানে দেশে মালবেরি রেশম তৈরি হয়। রেশম পোকা তুঁত পাতা খাওয়ার পর মুখ থেকে নিঃসৃত লালা থেকে ২০ থেকে ২২ দিনে রেশম গুটি তৈরি হয়। গুটি থেকে সুতা এবং সুতা থেকে রেশম কাপড় তৈরি হয়। রেশম কাপড়ের একটি ব্র্যান্ডের নাম রাজশাহী সিল্ক। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে রাজশাহী সিল্ক রপ্তানি হতো। এখন নতুন করে রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জিআই স্বীকৃত পণ্য বিশ্বের যে কোনো দেশে কদর রয়েছে।

দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের মধ্যে জামদানি, ইলিশ ও ক্ষীরশাপাতি আম ইতোমধ্যে জিআই পণ্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এসব পণ্যের স্বত্ব আর কোনো দেশ দাবি করতে পারবে না। দেশের মধ্যেও অন্য কোনো এলাকার জনগোষ্ঠী মালিকানা পাবে না। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে বাংলাদেশ সমৃদ্ধিশালী হলেও দীর্ঘসময় ধরে দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের মালিকানা সুরক্ষার সুযোগ ছিল না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩ এবং ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) বিধিমালা, ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়। এর পরই দেশে জিআই পণ্য নিবন্ধনের পথ তৈরি হয়। বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর স্বীকৃতি পায় জামদানি। এর পর ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট ইলিশ এবং ২০১৯ সালে ২৭ জানুয়ারি ক্ষীরশাপাতি আম এ স্বীকৃতি পায়। গত বছর করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণে ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্বীকৃতি দেওয়ার কার্যক্রম কিছুটা পিছিয়ে যায়। এবার ঢাকাই মসলিন ও রাজশাহী সিল্ক জিআই সনদ পাচ্ছে। আরও কয়েকটি পণ্য এ প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

মন্তব্য করুন