সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি এলআর গ্লোবালের বিরুদ্ধে কারসাজিমূলক লেনদেন, বেআইনি বিনিয়োগ, মানি লন্ডারিংসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বহু বছরের। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির তদন্তেও তা প্রমাণিত। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা এবং অবৈধ বিনিয়োগ ফেরত আনার নির্দেশ দিয়েছিল বিএসইসি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনাধীনে থাকা ছয়টি ফান্ডের মধ্যে দুটির ব্যবস্থাপনা বিনিয়োগকারীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্য সম্পদ ব্যবস্থাপকের কাছে হস্তান্তরে খোদ কমিশনই আদেশ দিয়েছিল। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি অবৈধ ও প্রশ্নবিদ্ধ বিনিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ করেনি, উল্টো ফান্ডের ব্যবস্থাপনা নিজের কাছে রাখতে মামলা করে। এ অবস্থায় জনগণের বিনিয়োগের অর্থ-সম্পদ এলআর গ্লোবালের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়- এমন মন্তব্য করে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে অবিলম্বে এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা ছয় মিউচুয়াল ফান্ডেরই ব্যবস্থাপনা অন্য কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপকের কাছে হস্তান্তরের সুপারিশ করেছিলেন বিএসইসির মিউচুয়াল ফান্ড বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার মিজানুর রহমান।
কিন্তু কমিশনারের ওই সুপারিশ খোদ কমিশনেই উপেক্ষিত হয়েছে। এলআর গ্লোবালের ব্যবস্থাপনাধীন ডিবিএইচ প্রথম ও গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ডের ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম স্থগিত করে আগে যে আদেশ দিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে বিএসইসি। কমিশনের চিঠি পেয়ে এরই মধ্যে ফান্ড দুটির ব্যবস্থাপনা শুরু করেছে এ প্রতিষ্ঠান। অথচ এমন কিছু হতে যাচ্ছে, তা আগাম আঁচ করতে পেরেই মিজানুর রহমান ওই সুপারিশ করেছিলেন। সুপারিশের পক্ষে এলআর গ্লোবালের অনিয়মের ফিরিস্তি তুলে ধরে কমিশন চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত প্রতিবেদন দিয়েছিলেন গত ৯ মার্চ।
প্রতিবেদনে কমিশনার মিজানুর রহমান জানান, যেখানে শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কমিশনের দায়িত্ব, সেখানে এলআর গ্লোবালের কাছে দুটি ফান্ডের ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে দেওয়া হলে তা কমিশনের আগের আদেশের বিপরীত এবং মারাত্মক ভুল হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির কমিশনার মিজানুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। আবার মিজানুর রহমানের প্রতিবেদনের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি সংস্থার চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম। তবে বিএসইসির চেয়ারম্যান এলআর গ্লোবালের অনিয়ম ও কমিশনের সিদ্ধান্ত বিষয়ে কথা বলেছেন। সমকালকে তিনি বলেন, এলআর গ্লোবালের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা কমিশন সভায় হয়েছে।
মিজানুর রহমানের প্রতিবেদন :কমিশনার মিজানুর রহমান তার প্রতিবেদনে বলেন, এলআর গ্লোবালের কাছে হাজার কোটি টাকার মিউচুয়াল ফান্ডের ব্যবস্থাপনা রাখা নিরাপদ নয়। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে অবিলম্বে এ সম্পদ ব্যবস্থাপকের ব্যবস্থাপনায় থাকা ডিবিএইচ প্রথম, গ্রিন ডেল্টা, এআইবিএল প্রথম ইসলামিক, এমবিএল প্রথম, এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ এবং এনসিসিবিএল প্রথম নামের ছয় মিউচুয়াল ফান্ডের ব্যবস্থাপনা কোনো স্বনামধন্য সম্পদ ব্যবস্থাপকের হস্তান্তর করা প্রয়োজন। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থিতি অনুযায়ী, এই ছয় ফান্ডের সম্পদমূল্য ছিল এক হাজার ৫২ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, এলআর গ্লোবাল বেআইনিভাবে ছয় কোম্পানিতে ৯০ কোটি ১৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে অনলাইন নিউজপোর্টাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে ৪৯ কোটি টাকা, থাইরোকেয়ার বাংলাদেশে তিন কোটি ৯৫ লাখ, ইউনিকর্ন ইন্ডাস্ট্রিজে সাড়ে ১৬ কোটি ৫০ লাখ, এনার্জি প্রিমায় ৯ কোটি ৯৭ লাখ, রংপুর ডিস্ট্রিলারিজ অ্যান্ড কেমিক্যালে ১০ কোটি টাকা এবং ২০১০ সালের ১৭ মে লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজে ৭৫ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। এসব কোম্পানির বেশিরভাগই লোকসানি বা সম্পদের পরিমাণ প্রশ্নবিদ্ধ।
শুধু মন্দ বিনিয়োগ নয়, সম্পদ ব্যবস্থাপক এলআর গ্লোবাল নিজের খরচকে মিউচুয়াল ফান্ডের খরচ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে কমিশনারের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ৩০ জুন, ২০১৯ সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এলআর গ্লোবাল আট কোটি ২৮ লাখ টাকার খরচ মিউচুয়াল ফান্ড থেকে নিয়েছে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এটা অবৈধ। এ ছাড়া বছরের পর বছর মন্দ বিনিয়োগের বিষয়ে মিথ্যা ও জাল আর্থিক প্রতিবেদন দিয়েছে।
মিজানুর রহমান তার প্রতিবেদনে এলআর গ্লোবালের বেআইনি বিনিয়োগের ওপর বিএসইসির তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের তথ্যও উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন, ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর তদন্ত কমিটির দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানিটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ১০০ টাকা মূল্যমানের প্রতি শেয়ার সাড়ে ১২ হাজার টাকা দরে মোট ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, কমিশনের ১৯৬৯ সালের অধ্যাদেশ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা লঙ্ঘন করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি এলআর গ্লোবালের সিইও রিয়াজ ইসলাম, সিএফও রোনাল্ড মিকি গোমেজ, লিগ্যাল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স বিভাগের প্রধান মনোয়ারা হোসেন এবং বিনিয়োগ কমিটির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। তদন্ত কমিটি তাদের পর্যবেক্ষণে এও উল্লেখ করেছে, রিয়াজ ইসলামের নিয়ন্ত্রণে থাকা এ সম্পদ ব্যবস্থাপকের কাছে থাকা ছয় মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ নিরাপদ নয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বেআইনি বিনিয়োগ, আন্তঃতহবিলের অর্থ বেআইনি হস্তান্তর, বেআইনিভাবে ফান্ড থেকে অর্থ খরচ, কারসাজিমূলক লেনদেননহ নানা বেআইনি কর্মকাণ্ডের দায়ে ২০১৪ সালের ২৬ জুন সম্পদ ব্যবস্থাপক এলআর গ্লোবালকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে তৎকালীন কমিশন। একই সঙ্গে অবৈধভাবে পাঁচ কোটি ৯৫ লাখ খরচের টাকা ফান্ডে ফেরত প্রদান, সাড়ে ৪৮ কোটি টাকার অবৈধ বিনিয়োগের অর্থ ফেরত নেওয়া তহবিল থেকে আইনি খরচের নামে ৩১ কোটি ৬২ লাখ টাকারও বেশি অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের কারণে ডিবিএইচ প্রথম ও গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ডের ৭০ শতাংশ বিনিয়োগকারী এলআর গ্লোবালের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে আইডিএলসি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসিও ফান্ডের সমুদয় তহবিল ও সম্পদ আইডিএলসি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেয়। এ বিষয়ে এলআর গ্লোবাল উচ্চ আদালতে মামলা করলে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণ বেঞ্চ তহবিল হস্তান্তরে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। কিন্তু কমিশন সম্প্রতি তহবিল হস্তান্তরের আদেশের পরিবর্তে তা পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে।
এলআর গ্লোবালের বক্তব্য :অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এলআর গ্লোবালের সিইও রিয়াজ ইসলাম এসব অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, আইন মেনে এলআর গ্লোবাল ছয় মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ করেছে। বিনিয়োগ থেকে মুনাফা পাচ্ছেন। তার পরও কোনো বিনিয়োগ বিষয়ে বিএসইসির আপত্তি থাকলে তা প্রত্যাহার করতে আপত্তি নেই। এ বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তিনি জানান, ডিবিএইচ প্রথম ও গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনা বিষয়ে কমিশন অনুমতি দিয়েছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে কমিশনের চিঠি তিনি পেয়েছেন। চলতি সপ্তাহে এ দুই মিউচুয়াল ফান্ড থেকে বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
বিএসইসির চেয়ারম্যানের বক্তব্য :এলআর গ্লোবালের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সত্ত্বেও তার কাছে দুই ফান্ডের ব্যবস্থাপনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চাইলে বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, এ সিদ্ধান্ত কমিশন সভায় হয়েছে, এটা একা তার সিদ্ধান্ত নয়। তিনি সমকালকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যত অনিয়মের অভিযোগ ছিল, তার সবটারই সুরাহা করা হয়েছে। তাকে যত টাকা জরিমানা করা হয়েছিল, গত দুই মাসে তা আদায় করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান কমিশনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে যত মামলা করেছিল, তা প্রত্যাহার করানো হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো অনিয়ম করবে না- এমন শর্তে তহবিলের ব্যবস্থাপনা ছাড়া হয়েছে। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে অনিয়মের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ঠিক নয় বলে মনে করি। কারণ, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ফান্ডের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বিনা অনুমতিতে বিনিয়োগ করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির এমন বিনিয়োগ আইনি সীমার মধ্যে আছে। তার পরও বিডিনিউজের বিনিয়োগ ৩০ দিনের মধ্যে ফেরত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এলআর গ্লোবাল তা ফেরত আনবে। এর বাইরে এলআর গ্লোবালের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ থাকলে তা মিউচুয়াল ফান্ড বিভাগকে জানাতে বলেছেন। অভিযোগ প্রমাণ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন