সরকারের সংগ্রহ নীতিমালা অনুযায়ী গুদামে সব সময় মজুদ থাকার কথা কমপক্ষে ১০ লাখ টন চাল। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মজুদ থাকা উচিত ১৫ লাখ টন। কিন্তু এখন সরকারের কাছে মজুদ আছে মাত্র দুই লাখ ৯৭ হাজার টন। সরকার আমদানির মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। বেসরকারিভাবে সাড়ে ১৫ লাখ টন চাল আমদানির অনুমোদন হলেও এসেছে সাড়ে সাত লাখ টনেরও কম। আর সরকারিভাবে সাড়ে ১০ লাখ টন লক্ষ্য থাকলেও আমদানি করা হয়েছে মাত্র তিন লাখ ৮৩ হাজার টন। বিশাল এই ঘাটতির কারণে চালের বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। সেটি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্টরা।
নতুন ধান উৎপাদন হওয়ার পরও চালের দাম কমেনি। বরং দিন দিন দাম বেড়ে চলেছে। গত এক বছরে দেশের খুচরা বাজারে চালের দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এখন দেশের কৃষক ও মিল মালিকদের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহের চেষ্টা করছে সরকার। সেটিও সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে সংশ্নিষ্টদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, বেসরকারিভাবে আমদানি না করে সরকারকে নিজে আমদানি করতে হবে। কিন্তু সরকার নিজে যে পরিমাণ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটাও আনতে পারেনি। সংগ্রহ ও আমদানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় বাজারে চালের দামে ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে কোনো কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে চালের বাজারে আরও ঊর্ধ্বগতি দেখা দেবে।
আসাদুজ্জামান আরও বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে এক বছরে চালের মজুদ ১১ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ১৫ লাখ টন করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে মজুদ কেন দুই লাখ টনে নামিয়ে আনা হলো, তার জবাব খাদ্য মন্ত্রণালয়কে দিতে হবে।
গত ২৭ ডিসেম্বর বেসরকারিভাবে চাল আমদানির শুল্ক্ক ৬২ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করে সরকার। এরপর ব্যবসায়ীরা ১৫ লাখ ৬০ হাজার ৮৬৩ টন চাল আমদানির অনুমোদন নেন। কিন্তু আমদানির শেষ দিন ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে চাল প্রবেশ করেছে সাত লাখ ৪৪ হাজার ৪৩০ টন। অনুমোদনের ৪৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বেসরকারি চাল আমদানিকারকরা অনুমতি নেওয়ার পরও প্রায় ৫২ ভাগ চাল আমদানি করেননি।
এ ছাড়া দুই লাখ ১০ হাজার ৭৬১ টন চালের এলসি খোলার পরও আমদানি করা হয়নি বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ছয় লাখ পাঁচ হাজার ৬৭২ টন চালের এলসি খোলেননি আমদানিকারকরা। ফলে আমদানির মাধ্যমে চালের ঘাটতি পূরণের সরকারি উদ্যোগ ভেস্তে গেছে।
আমদানিকারকরা অভিযোগ করেছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে পুরো চাল আমদানি করা সম্ভব হয়নি। বলা হয়েছে, সাত দিনের মধ্যে এলসি খুলতে হবে। আর চাল আনার পর ২০ দিনের মধ্যে বাজারজাত করতে হবে। এই অল্প সময়ের মধ্যে নিয়ে আসাটা আসলে অনেক কঠিন। আবার বোরো ধান কাটা শুরু হওয়ায় আমদানি নিয়ে সংশয়ে পড়েন তারা। এ ছাড়া সীমান্তে ট্রাকে ও কাস্টমসে হয়রানির কারণে অনেকে এলসি খোলার পরও চাল দেশে আনতে পারেননি।
সবচেয়ে বেশি চাল আমদানির অনুমতি পাওয়া ব্যবসায়ী সাতক্ষীরার সি মজুমদার বলেন, এলসি খোলার ১০ দিনের মধ্যে ৫০ ভাগ, পরের ১০ দিনে ৫০ ভাগ চাল বাজারজাত করতে বলা হয়েছে। এই অল্প সময়ের মধ্যে নিয়ে আসাটা অনেক কঠিন। আর এলসি করলেই চাল আমদানি করা যায় না। এরপর আরও অনেক কাজ থাকে। ট্রাকের সংকট, স্থলবন্দরে জট ইত্যাদি কারণে সময় বেশি লাগে। এদিকে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা সেটা বুঝতে চান না।
সি মজুমদার জানান, তার দুই লাখ টন চালের এলসি খোলা ছিল, এর মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার টন দেশে প্রবেশ করেছে। বাকি ৬০ হাজার আনতে পারেননি।
নওগাঁর চাল ব্যবসায়ী ও আমদানির অনুমতি পাওয়া নুরুল ইসলাম বলেন, আমদানির চাল এনে বিক্রি করা কঠিন। তাই ২০ হাজার টনের অনুমতি পেয়ে তিনি ১০ হাজার টন আমদানি করেছেন।
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, গত বছর আগস্টেই প্রয়োজনীয় পরিমাণ চাল আমদানির অনুমতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু চার মাস পর গত জানুয়ারিতে সেই প্রক্রিয়া শুরু করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এরপর নানা জটিলতায় বেসরকারিভাবে চাল আমদানিতেও বিলম্ব হয়েছে।
গত বোরো মৌসুমে সরকারের ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল আট লাখ টন। এর মধ্যে সংগ্রহ হয়েছিল মাত্র দুই লাখ ১৯ হাজার ৮৬৫ টন। সিদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ লাখ টন। এর মধ্যে সংগ্রহ হয়েছিল ছয় লাখ ৬৭ হাজার ৮৯০ টন। আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দেড় লাখ টন। সংগ্রহ হয়েছিল ৯৯ হাজার ১২৩ টন। একইভাবে আমন মৌসুমেও সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি সরকার। চলতি বোরো মৌসুমে সরকার সাড়ে ছয় লাখ টন ধান কিনতে চায়। গত বছরের চেয়ে সাড়ে তিন লাখ টন কম। এ ছাড়া সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল থেকে ধান সংগ্রহ শুরু হয়েছে। তবে বেশিরভাগ জেলায় এখনও শুরু হয়নি। আজ ৭ মে থেকে চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হবে। শেষ হবে ৩১ আগস্ট।
গত দুই মৌসুমে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার একাধিকবার বলেছিলেন, চালকল মালিকরা যদি সিন্ডিকেট করে, তাহলে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হবে।
কিন্তু সেই আমদানির উদ্যোগ সফল হয়নি। এখন আবার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল সংগ্রহের জন্য সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে সরকার। গত ৪ মে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের এবং ৫ মে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এ সময় চলতি বোরো মৌসুমে ধান-চাল ক্রয়ের গতি ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সাধন চন্দ্র মজুমদার।
খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক বদরুল হাসান সমকালকে বলেন, কভিডের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল কেনা অনেক কঠিন। প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব খাদ্য মজুদ রেখেছে। বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে মাসে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টন চাল আমদানি করা যায়। অথচ দেশে প্রতিদিন চালের চাহিদা ৮০ হাজার টন। তাই আমদানির চেয়ে সংগ্রহের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে দেশের বাজারে চালের দাম সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
তিনি বলেন, বেসরকারিভাবে চাল আমদানির জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি না করে উন্মুক্তভাবে সুযোগ দিয়ে মনিটরিং বাড়ালে অভিযান সফল হতো। প্রয়োজনীয় চাল আমদানি হলে বন্ধের নির্দেশ দিত সরকার।
তবে খাদ্যসচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম সমকালকে বলেন, আমদানিকারকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রয়েছে। এ জন্য তাদের চাপ দেওয়া যায় না। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য ৩২০ আমদানিকারককে নির্দিষ্ট পরিমাণে চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন বোরো ধান কাটা শুরু হয়ে গেছে। চাল আমদানির আর প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দুই কোটি ৫ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ধান-চাল সংগ্রহে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপরও সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে শুল্ক্ক কমিয়ে আবার আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারিভাবে ১৩ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্তব্য করুন