ল্যাপটপ এবং মাদার পিসি নামে পরিচিত সংযোজিত আকারে আসা ডেস্কটপ কম্পিউটার আমদানিতে ৩০ শতাংশ হারে করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে আসন্ন বাজেটে। পাশাপাশি দেশে কম্পিউটার পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা করোনাভাইরাস মহামারির এই সময় এমন সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না।
মোস্তাফা জব্বার জানান, দেশে ল্যাপটপ ও মাদার পিসি উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে এ করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। উৎপাদন সহায়ক কর নীতির কারণে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনে বড় সাফল্য আসার পর ল্যাপটপ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও একই নীতি গ্রহণের বিবেচনা থেকেই এ প্রস্তাব। মন্ত্রী আরও জানান, কম্পিউটার যন্ত্রাংশের ওপর নতুন কর আরোপ করা হচ্ছে না। ফলে বাজার থেকে পৃথকভাবে যন্ত্রাংশ কিনে ডেস্কটপ কম্পিউটার সংযোজনের ক্ষেত্রে দাম বাড়বে না।
তবে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মো. শহীদ উল মুনীর সমকালকে বলেন, তারাও ল্যাপটপ এবং কম্পিউটার উৎপাদনে 'মেড ইন বাংলাদেশ'-এর পক্ষে। কিন্তু বাংলাদেশ ল্যাপটপ উৎপাদনে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে সক্ষমতা অর্জনের আগে উচ্চহারে আমদানি শুল্ক্ক আরোপ করা হলে বাজারে দাম অনেক বেড়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষকে কম্পিউটার পণ্য কিনতে ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, মহামারির সময়ে যেখানে ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের বাজারে পণ্যের সংকট দেখা যাচ্ছে, সেখানে এ ধরনের করারোপ করা হলে তা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে না।
যা আছে প্রস্তাবে :১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরের বাজেটে সব ধরনের কম্পিউটার পণ্যে শূন্য শুল্ক্ক নীতি গ্রহণ করেছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার। ওই অর্থবছর থেকেই দেশে ডেস্কটপ, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যায়। ফলে দেশে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর সংখ্যাও এক বছরের মধ্যে দ্বিগুণের বেশি হয়ে যায়। আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে করারোপ করা হলে সেটাই হবে ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরের পর কম্পিউটার পণ্যের ওপর প্রথম করারোপ।
সূত্র জানায়, বাজেট প্রস্তাবে দেশে কম্পিউটার উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে তিনটি শ্রেণিতে প্রকারভেদ করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে থাকছেন উৎপাদক। যারা কম্পিউটার পণ্য ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদন করবেন, তারা 'উৎপাদক' শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্তরা সর্বোচ্চ কর সুবিধা পাবেন।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকছে সংযোজন। যেসব প্রতিষ্ঠান যন্ত্রাংশ আমদানি করে দেশে সংযোজন করবে, তারা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হবে। এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্তদের জন্য সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণিতে আছেন আমদানিকারকরা। যারা বিদেশে প্রস্তুতকৃত ল্যাপটপ ও মাদার পিসি আমদানি করেন, তারা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এই শ্রেণির ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে কম্পিউটারের জন্য আবশ্যকীয় যন্ত্রাংশ যেমন মাদারবোর্ড, প্রসেসর, র‌্যাম, হার্ডডিস্কের মতো যন্ত্রাংশের আমদানি আগের মতোই করমুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এ সম্পর্কে বলেন, ২০১৭ সালে দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন উৎসাহিত করতে একই ধরনের নীতি গ্রহণ করা হয়। এর ফলে এখন দেশে অত্যন্ত মানসম্পন্ন মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন হচ্ছে। দেশে তৈরি স্মার্টফোন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বে স্মার্টফোন শিল্পে 'মেড ইন বাংলাদেশ' জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানির ক্ষেত্রে কর বাড়িয়ে দেশে উৎপাদনে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার নীতি গ্রহণ না করা হলে এটা সম্ভব হতো না। সরকার সেই নীতিটা এখন ল্যাপটপ এবং কম্পিউটার উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নিতে চায়।
মন্ত্রী বলেন, ১৯৯৮-৯৯ সালের বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। সে সময়ে দেশে কম্পিউটার পণ্য উৎপাদনের কোনো পরিবেশই ছিল না। এ কারণে সে সময়ে কম্পিউটার পণ্যকে শূন্য শুল্ক্ক নীতির আওতায় নিয়ে আসাটা খুবই সময়োপযোগী ছিল। আর এখনকার পরিস্থিতি হচ্ছে, বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও ল্যাপটপ তৈরি হচ্ছে। সেগুলো খুবই মানসম্পন্ন। এখন যদি মোবাইল হ্যান্ডসেটের মতো ল্যাপটপের ক্ষেত্রেও দেশে উৎপাদন সহায়ক নীতি নেওয়া হয়, তাহলে ল্যাপটপের ক্ষেত্রে দেশ দ্রুত স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।
মহামারির সংকটজনক সময়ে এ ধরনের করারোপের ফলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে- এমন বিষয়ে মোস্তাফা জব্বার বলেন, এ সময়ে ল্যাপটপের চাহিদা বেড়েছে এবং এ চাহিদার কারণেই আমদানির বদলে দেশে উৎপাদন বাড়লে দাম কমবে, ক্রেতারা উপকৃত হবেন। আমদানিনির্ভর হলে সংকটে দাম বাড়ে, উৎপাদননির্ভর হলে দাম কমে। সেটা মোবাইল হ্যান্ডসেটের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। মোবাইল হ্যান্ডসেটের মতোই ক্রেতাদের সুলভমূল্যে ল্যাপটপ পাওয়ার স্বার্থেই এই নীতির কথা চিন্তা করা হয়েছে।
মহামারি মধ্যেও গত অর্থবছর মোবাইল ইন্টারনেট ও ভয়েস কলের ওপর নতুন করে ৫ শতাংশ সম্পূরক কর আরোপ করা হয়েছিল। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মন্ত্রী বলেন, এই কর বাড়ানো হবে কিনা সেটা অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলতে পারে। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগতভাবে সব সময়ই মোবাইল ইন্টারনেট কিংবা ব্রডব্যান্ড দুই ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট সংযোগ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে কর বৃদ্ধির বিপক্ষে। কারণ ইন্টারনেট ব্যবহার যত বাড়বে, দেশে ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত হবে। ফলে যদি শিক্ষার্থী এবং তরুণদের বিনামূল্যেও ইন্টারনেট দেওয়া হয়, সেটা বরং দেশের একটা বিনিয়োগ হবে, যেখান থেকে দ্রুতই অনেক বড় সুফল পাওয়া যাবে।
অন্যরা যা বলেন :বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মো. শহীদ উল মুনীর বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ল্যাপটপ উৎপাদনে সক্ষম নয়। বরং ল্যাপটপের বাজার এখন পর্যন্ত আমদানিনির্ভর। তা ছাড়া দেশে শুধু উৎপাদন নয়, মানসম্পন্ন ল্যাপটপ উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে, না হলে দেশে উৎপাদিত পণ্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করবে না।
তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, কভিড-১৯ মহামারির সংকটে বছরজুড়েই ল্যাপটপের বাজারে সংকট চলছে। এর ফলে এমনিতেই বাজারে আগের চেয়ে ল্যাপটপের দাম বেশ বেড়েছে। এ অবস্থায় আমদানির ওপর কর আরোপ করা হলে সেটা বাজারে সংকট আরও বাড়িয়ে দেবে। কারণ এখন অনলাইন নির্ভরতা বাড়ছে। অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে, অফিস চলছে। কেনাকাটা হচ্ছে অনলাইনে। ফলে ল্যাপটপের মতো ডিভাইসের চাহিদাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় মানুষকে যত কম মূল্যে ডিভাইস দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, সেটাই মঙ্গলজনক। ল্যাপটপ উৎপাদন সহায়ক নীতি নেওয়া হোক, কিন্তু আমদানিতে করারোপের উপযুক্ত সময় এখন নয়।