দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আবারো ৬০০০ পয়েন্টের মাইলফলক পার করেছে। দিনের শেষে বৃহস্পতিবারের তুলনায় ২২ পয়েন্ট বেড়ে ৬০০৮ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে।

সোয়া তিন বছর পর সূচকটি পুনরায় এ মাইলফলক স্পর্শ করল। এর আগে সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সূচকটির ৬০০০ পয়েন্টের ওপর ছিল। 

তবে রোববার লেনদেনের শেষ পর্যন্ত সূচকটি ৬০০০ পয়েন্টে উঠলেও, এ ওঠার পথটি মসৃণ ছিল না। বরং চার ঘণ্টার লেনদেনের সময়ে অন্তত দুইবার বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুক্ষীন হয়েছে। কিছু ব্যাংকের শেয়ারদর বৃদ্ধি সূচকটিকে ৬০০০ পয়েন্টের ওপর রাখলেও এ ব্যাংকের শেয়ারের দরপতনে দিনের লেনদেনের মাঝে অন্তত দুই দফায় সূচকটি ৬০০০ পয়েন্টের নিচে নেমেছিল।

শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টরা সূচকের ৬০০০ পয়েন্টের ওপর নিজের অবস্থানকে ধরে রাখাকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অনেক। যদি সূচকটি ৬০০০ পয়েন্টের ওপর স্থায়ী হয়, তবে বিনিয়োগকারীরা আরো বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। সেক্ষেত্রে এখান থেকে অনেক শেয়ারের দর দ্রুত আরো বাড়বে।

তবে সে পথটি যে সহজ নয়, তা রোববারের লেনদেনেই বোঝা গেছে। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইএক্স সূচকটি ১০১ পয়েন্ট বেড়ে ক্লোজ হয়েছিল ৫৯৮৫.৮১ পয়েন্টে। রোববার স্বাভাবিক লেনদেন শুরুর আগের ১৫ মিনিটের প্রি-ওপেনিং সেশনের শেয়ার কেনাবেচায় ভর করেই সকাল ১০টায় সূচকটি ৪৮ পয়েন্ট বেড়ে ৬০৩৩.৯১ পয়েন্টে উঠে। পরের তিন মিনিটে তা আরো খানিকটা বেড়ে ৬০৩৯.১২ পয়েন্টে ওঠেছিল। 

এরপরই ঘটে উল্টো ঘটনা। ব্যাংকসহ বেশিরভাগ শেয়ার দর হারালে সূচকটি পরের মাত্র ২৪ মিনিটে ৫৯ পয়েন্ট হারিয়ে ৫০৭৯.৯৭ পয়েন্ট নামে। এর পর স্কয়ার ফার্মার মত বড় বাজার মূলধনী কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধির পাশাপাশি কয়েকটি ব্যাংকের শেয়ার হারানো দর ফিরে পেলে সূচক ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়।

১০টা ২৯ মিনিটের পর পরবর্তী ২৫ মিনিটে ডিএসইএক্স সূচক ৪৪ পয়েন্ট বেড়ে ৬০২৪ পয়েন্টে ওঠে। কিন্তু তাও পরবর্তি ২-৩ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়নি। পুনরায় ব্যাংকসহ অনেক শেয়ার দর হারালে সূচকটি বেলা ১১টা ৫১ মিনিটে দিনের সর্বনিম্ন অবস্থান ৫৯৭২.৬৮ পয়েন্টে নামে। 

অবশ্য শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ ব্যাংকের শেয়ারদর কমে দিনের লেনদেন শেষ হলেও ব্র্যাক, ইস্টার্ন, যমুনা, ডাচ-বাংলাসহ কয়েকটি ব্যাংকের শেয়ারদর বৃদ্ধি সূচকটিকে ফের ৬০০০ পয়েন্টের ওপরে তুলে আনতে সহায়তা করেছে। এর বাইরে একক কোম্পানি হিসেবে স্কয়ার ফার্মা, বেক্সিমকো লিমিটেড, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ইফাদ অটোস, লাফার্জ-হোলসিম সিমেন্টের দরবৃদ্ধি বেশ খানিকটা সহায়তা করেছে।

সূচক খানিকটা বাড়লেও আগের দিনের তুলনায় বেশিরভাগ শেয়ারই দর হারিয়েছে। ডিএসইতে ১৪৪ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের দরবৃদ্ধির বিপরীতে ১৭৪টি শেয়ার দর হারিয়েছে। অপরিবর্তিত ৪৬টি শেয়ারের দর।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রোববার লেনদেনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি খাতের বাজারদরই ঊর্ধ্বমুখী ছিল। খাতটি হলো মিউচুয়াল ফান্ড। এ খাতের ৩৭টি ফান্ডের মধ্যে ৩৫টিরই বাজারদর বেড়েছে। ফান্ড প্রতি গড় দরবৃদ্ধির হার ৩.৮১ শতাংশ।

আলোচিত খাতগুলোর মধ্যে ব্যাংক খাতের বেশিরভাগ শেয়ার দর হারিয়েছে। এ খাতের ১১ শেয়ারের দরবৃদ্ধির বিপরীতে ১৮টির দর কমেছে। তা সত্ত্বেও এ খাতের সার্বিক দর বেড়েছে ০.৭৯ শতাংশ। এটাই সূচককে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে।

এর বাইরে বীমা খাতের শেয়ারদরের ওঠানামায় বেশ অস্থিরতা ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৬ শেয়ারের দরবৃদ্ধির বিপরীতে ৩২টির দর কমেছে। দরবৃদ্ধির ক্ষেত্রে জীবন বীমা খাতের কিছু শেয়ার তুলনামূলক এগিয়ে ছিল।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ৫ শেয়ারের দরবৃদ্ধির বিপরীতে ১৫টির দর কমেছে। তারপরও এ খাতের গড় শেয়ারদর বেড়েছে ১.৪৯ শতাংশ। 

লেনদেনের বড় সময় জুড়ে প্রকৌশল এবং বস্ত্র খাতের বেশিরভাগ শেয়ার দরবৃদ্ধির ধারায় থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। প্রকৌশল খাতের মিশ্রধারায় এবং বস্ত্র খাতের বেশিরভাগ শেয়ার দর হারিয়েছে। 

খাদ্য এবং আনুসঙ্গিক খাতের বেশিরভাগ শেয়ার দর হারিয়েছে। ওষুধ ও রসায়ন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসহ অন্য অধিকাংশ খাতে ছিল মিশ্রধারা।

পর্যালোচনায় আরো দেখা গেছে, সূচক ৬০০০ পয়েন্ট পার হতেই হাজার টাকার বেশি দামি শেয়ারগুলো দর হারিয়েছে। যেমন রেকিট বেনকিজারের শেয়ার ১৩১ টাকা ৪০ পয়সা করে দর হারিয়ে সর্বশেষ ৪২৪৩ টাকা ৪০ পয়সায় কেনাবেচা হয়েছে। ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের দর ২৪.৯০ টাকা কমে ২৭৭২ টাকায়, মারিকো বাংলাদেশের শেয়ার ১৬.৮০ টাকা কমে ২০৮৫.২০ টাকায়, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের শেয়ারদর ২২.৭০ পয়সা করে কমে ১৭৬৪ টাকায় নেমেছে।

রোববার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ দর বেড়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের, সর্বশেষ কেনাবেচা হয়েছে ৬৯.৩০ টাকায়। 

হঠাৎ করে প্রায় ১০ শতাংশ দর বেড়ে দরবৃদ্ধির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে এসেছে ইফাদ অটোস, সর্বশেষ কেনাবেচা হয়েছে ৫৫.৩০ টাকায়। 

আফতাব অটোও ছিল একই ধারায়। প্রায় ১০ শতাংশ দর বেড়ে সর্বশেষ ২৭.৮০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। এ শেয়ারটি ছিল দরবৃদ্ধির তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে।

৯ শতাংশের ওপর দর বেড়েছে আরো আট শেয়ার এবং এক মিউচুয়াল ফান্ডের। এগুলো হলো- প্রাইম লাইফ ইন্স্যুরেন্স (৭৯ টাকা), যমুনা ব্যাংক (২৩.৪০ টাকা), ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স (৬১.৩০ টাকা), নর্দার্ন ইন্স্যুরেন্স (৬৬.৫০ টাকা), সালভো কেমিক্যাল (১৯.৫০ টাকা), মেট্রো স্পিনিং (১৬.১০ টাকা) এবং পিএফ প্রথম মিউচুয়াল ফান্ড (১১.৯০ টাকা)।

রোববার ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত দর বেড়েছে ২৪ শেয়ার এবং ৮ মিউচুয়াল ফান্ডের।

বিপরীতে সর্বোচ্চ ৯.৩৪ শতাংশ দর হারিয়ে দরপতনের শীর্ষে ছিল ডেল্টা স্পিনার্স, শেয়ারটি সর্বশেষ ৯.৭০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। ৫ শতাংশের ওপর দর হারিয়েছে আরো ১০ শেয়ার। এগুলো হলো- ইমাম বাটন (২৪ টাকা), তওফিকা ইন্ডাস্ট্রিজ (২৭.৩০ টাকা), আমান ফিড (৩৯.১০ টাকা), পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ৩৭.৩০ টাকা), সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স (৩৭.৮০ টাকা), দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স (৪৫.৫০ টাকা), প্রাইম ব্যাংক (২৪.৭০ টাকা), আমান কটন ফাইব্রস (৩৫.১০ টাকা), ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স (৫৭.৫০ টাকা), ক্রীস্টাল ইন্স্যুরেন্স (৫৬.২০ টাকা), মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক (১১.৩০ টাকা)।

ডিএসইতে দিনব্যাপী ২ হাজার ১৪৯ কোটি ২১ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। একক খাত হিসেবে সর্বোচ্চ ৪৯৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে ব্যাংক খাতে। এ খাতের লেনদেন মোটের ২৩.১০ শতাংশ।

খাতওয়ারি লেনদেনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল বীমা খাত। এ খাতের ৪৮ কোম্পানি ৪৯২ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।

লেনদেনে যথারীতি শীর্ষে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার। এ কোম্পানির ১১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। ২.৮০ টাকা দর বেড়ে শেয়ারটি সর্বশেষ ৮৮.৫০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে।

লেনদেনে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে ছিল পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স (লেনদেন ৮৯.৩০ কোটি টাকা, সর্বশেষ দর ১৩৯.১০ টাকা), তৃতীয় অবস্থানে ছিল ইফাদ অটোস (লেনদেন ৬৯.১৬ কোটি টাকা, সর্বশেষ দর ৫৫.৩০ টাকা)।