করোনা সংকটে কৃষিই সম্ভাবনার পথ দেখাচ্ছে। এ কারণে সরকার এ খাতের ওপর ভরসা রাখতে চায়। এর ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে কৃষিকে। ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতের পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ২৯ হাজার ৯৮৩ কোট টাকা। আর কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৫ হাজার ৪৪১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সব মিলিয়ে মোট বরাদ্দ কিছুটা বাড়বে। অধিক খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বেশি। আর কৃষি খাতে ভর্ভুকি গতবারের মতোই ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থাকতে পারে অথবা ৫০০ কোটি টাকা বাড়াতে পারে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র। কৃষি খাতে কর অব্যাহতি ও ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের।

জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৬৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এ ক্ষেত্রে ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যার পুরোটা খরচ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। হাওরাঞ্চলে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ডাউন পেমেন্ট কমানোর বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৩০২০ কোটি টাকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। ২০২৫ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের আওতায় ৫১,৩০০টি কৃষিযন্ত্র বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। প্রকল্প-সংশ্নিষ্টরা জানান, করোনাসহ বিভিন্ন কারণে কৃষিযন্ত্র বিতরণ কার্যক্রম শুরু করতে বেশ খানিকটা দেরি হয়েছে। গত এপ্রিলে কৃষিযন্ত্র বিতরণ শুরু হয়েছে এবং মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৬৬৬টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার, ২১টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ও ৪৭০টি রিপার বিতরণ করা হয়, যা চলতি বছরে বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম। আগামী অর্থবছরে বিতরণ বাড়ানো হবে।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করতে ৭০ শতাংশের ওপর ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। যান্ত্রিকীকরণের জন্য হারভেস্টার থেকে শুরু করে সব ধরনের কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে সরকার গবেষণার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষিকে আধুনিকায়ন ও লাভজনক করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়লে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সময় ও খরচ কম লাগবে।

থাকছে কর অব্যাহতি ও ছাড়: বাজেটে কৃষি খাতে কর অব্যাহতি ও ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের। জানা গেছে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে নতুন বিনিয়োগকারীরা পেতে পারেন ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা। আগামী ১ জুলাই থেকে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত যারা এ খাতে বিনিয়োগ করবেন, তারাই আয়কর অব্যাহতির সুবিধা পেতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নূ্যনতম বিনিয়োগ হতে হবে এক কোটি টাকা। তবে মৎস্য চাষের আয়কর বাড়ানোর ঘোষণা আসতে পারে। মাছচাষের আয়ের প্রথম ১০ লাখ টাকা করমুক্ত থাকতে পারে। পরের ১০ লাখে ৫ শতাংশ এবং এর পরের ১০ লাখে ১০ শতাংশ কর অপরিবর্তিত থাকতে পারে। ৩০ লাখ বেশি আয়ে ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপ হতে পারে।

খাদ্যশস্য সংগ্রহে ১৭ হাজার কোটি টাকা: আসন্ন বাজেটে খাদ্যশস্য সংগ্রহের জন্য বরাদ্দ থাকছে ১৬ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এ খাতে বরাদ্দ বাড়ছে পৌনে তিনশ কোটি টাকা। সংগ্রহ করা খাদ্যশস্যের বড় একটি অংশ বিতরণ করা হবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পেছনে। আগামী অর্থবছরের প্রায় ৩৩ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে চাল সংগ্রহ করা হবে প্রায় ২৬ লাখ টন এবং বাকি ৭ লাখ টন গম। চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটে ২৪ লাখ ৫৫ হাজার টন খাদ্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

কৃষি খাতের ৮২ প্রকল্পে এডিপিতে বড় বরাদ্দেও ব্যয় কম: চলতি অর্থবছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থার বাস্তবায়নাধীন ৮২টি প্রকল্পের জন্য ২ হাজার ২৯৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করে সরকার। মার্চ পর্যন্ত প্রথম ৯ মাসে বরাদ্দের মাত্র ৪৯.১০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বরাদ্দ যথার্থ না পাওয়া, করোনার কারণে মাঠ পর্যায়ে ঠিকমতো মুভমেন্ট না হওয়া এবং যথাযথ উদ্যোগের অভাবে অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ করা যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব: মহামারি করোনায় মানুষকে সুরক্ষা দিতে কৃষি, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট প্রণয়নের প্রস্তাব করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম খান সমকালকে বলেন, কৃষিতে গবেষণা, সম্প্র্রসারণ ও উপকরণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। মোট বাজেটের কমপক্ষে ১০ শতাংশ অর্থ বৃহত্তর কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ করা দরকার।

খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি), বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদ সমকালকে বলেন, করোনায় সৃষ্ট নতুন দরিদ্র ও নতুুন বেকারদের অনেকেই গ্রামে ফিরছে। ফলে তাদের গ্রামীণ অর্থনীতি কিংবা কৃষিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা আরেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ। সরাসরি কৃষকদের ধান বিক্রি বাড়াতে উৎসাহ প্রদান, মূল্য সহায়তা বাবদ বরাদ্দ রাখা, সৌর বিদ্যুৎভিত্তিক সেচ প্রকল্প নেওয়া, ঋণ পরিশোধের মেয়াদকাল বাড়ানো, কৃষিবীমা চালু, যন্ত্রপাতি বিতরণ ব্যবস্থাপনায় প্রান্তিক কৃষকদের অভিগ্যমতা বাড়াতে নীতিমালা, পারিবারিক কৃষি খাতে বরাদ্দ রাখা, খাদ্য ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ বাড়ানো এবং মোট বাজেটের কমপক্ষে ২০% কৃষি খাতে বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান নুরুল আলম মাসুদ।

বাজেটে হাওরের কৃষিকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়ে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা সমকালকে বলেন, অকাল বন্যার হাত থেকে হাওরের ফসলকে রক্ষায় স্বল্পমেয়াদি ও পানি সহনীয় ধান আবিস্কার করা দরকার। গভীর হাওর থেকে ফসল আনতে কিছু ডুবু রাস্তা প্রয়োজন। হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়াতে প্রজনন মৌসুমে দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হবে এবং এই সময়ে জেলেদের প্রণোদনা দিতে হবে।

মন্তব্য করুন