বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেছেন, বাজেটে বরাদ্দের চেয়ে বেশি দেখা দরকার মানসম্পন্ন বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব নীতি পদক্ষেপগুলো নেওয়া হচ্ছে, লক্ষ্য অনুযায়ী সংশ্নিষ্টরা সেগুলোর সুফল পাচ্ছে কি-না, সেটা দেখা দরকার। সুশাসন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ও পদ্ধতিগত উন্নয়নের মাধ্যমে উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

শনিবার সিপিডি আয়োজিত বাজেট সংলাপ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ওই অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, শ্রমিক নেতারাও মতামত রাখেন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। অনুষ্ঠানে বাজেট বাস্তবায়ন সমস্যা, তথ্যের অভাব, নীতি সহায়তার সুষম বণ্টনে অনীহা, সংস্কার উদ্যোগের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।

সিপিডির চেয়ারম্যান বলেন, করোনার প্রভাব মোকাবিলার ৮০ শতাংশ উদ্যোগ এসেছে মুদ্রানীতির মাধ্যমে। আর ২০ শতাংশ রাজস্ব নীতির মাধ্যমে। ফলে ব্যাংক খাতে মনিটরিং বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ হচ্ছে না। মেশিনারিজ ও যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। অন্যদিকে ব্যাংকের তারল্য বেড়েছে। বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। নতুন দরিদ্রদের অস্বীকার করা যাবে না।

তিনি বলেন, করোনা মোকাবিলায় টিকার বিকল্প নেই। টিকা পাওয়ার সব উদ্যোগ দরকার। তবে যথাযথ পরীক্ষাও জরুরি। পরীক্ষার হার বাড়াতে হবে। কেউ টিকা পেল না, আবার কেউ পরীক্ষা করাল না, তাহলে সংক্রমণ আটকানো যাবে না।

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান তথ্যের ঘাটতি প্রসঙ্গে বলেন, হালনাগাদ তথ্য উপাত্তের সরবরাহ বাড়াতে বিবিএসকে আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছে। দরিদ্র্যের পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে এ চিত্র পরিবর্তনশীল।

ব্যাংকিং কমিশন গঠন প্রসঙ্গে বলেন, এর আগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেকগুলো কমিশন গঠন করা হয়েছে, কমিশনের সুপারিশ মানা হয়নি। ব্যাংক খাতে যদি মানার চেষ্টা থাকে, তাহলে কমিশন করা যেতে পারে। করপোরেট কর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের কর একসঙ্গে অনেক কমানো সম্ভব নয়, কারণ সরকারের অর্থের দরকার আছে। তিনি ভ্যাটের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। বাজেট বাস্তবায়নের মান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অবশ্যই বাস্তবায়নে সমস্যা আছে। দুর্নীতি আছে। এগুলো দূর করার জন্য খোদ প্রধানমন্ত্রী কাজ করছেন। ১০ মাসের বাস্তবায়ন চিত্র দেখে সমালোচনা করলে হবে না, পদ্ধতিগত কারণেই অর্থবছরের শেষ দুই মাসে বাস্তবায়ন বা অর্থ ছাড় বাড়ে। তবে এক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, তথ্যের ঘাটতির চেয়ে অসংগতি বড় বিষয়। দেশে নতুন দরিদ্র আছে কি নেই, তা নির্ভর করবে তথ্যের ওপর। সরকারি দপ্তরের কাছে এ তথ্য নেই। বিবিএসের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। যেসব সিদ্ধান্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়, সেগুলো হালনাগাদ না থাকলে সরকার কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা সংসদে আছেন শুধু হ্যাঁ বা না বলার জন্য। কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রাক-বাজেট আলোচনা আরও অংশগ্রহণমূলক করা দরকার। করোনা প্রসঙ্গে এ আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, জনস্বাস্থ্য বলতে হাসপাতালের বেড সংখ্যা, আইসিইউ বাড়ানোর বিষয় না। বৃহত্তর পরিসরে মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপদ করা। তামাকের কারণে করোনার তুলনায় বছরে ১৫/১৬ গুণ মানুষ বেশি মারা যাচ্ছে। এসব মৃত্যু কমাতে হবে। জনস্বাস্থ্যকে অবহেলা করা হলে উন্নত রাষ্ট্রে পৌঁছানো যাবে না। এখন করোনা আছে, ভবিষ্যতে হয়ত অন্যকিছু আসবে। ফলে ব্যবস্থাগত উন্নয়ন দরকার। পরিবেশ উন্নয়নে জোর দিতে হবে।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিমউদ্দীন বলেন, ব্যবসায়ীরা আগাম কর বিলুপ্ত চায়। এতে ব্যবসার খরচ বাড়ে। বাজেটে সে বিষয়ে উদ্যোগ নেই। অন্যদিকে সরবরাহ পর্যায়ে এআইটি ৫ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। অবশ্যই কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। তবে সেজন্য নীতি উদ্যোগ দরকার। একেকটি খাতের জন্য একেক ধরনের নীতি সহায়তা দরকার। তিনি প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানিয়ে বলেন, ছোট ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি নগদ সহায়তা দিতে হবে। অনেকের পুঁজি নেই।

বিএনপি নেতা সংসদ সদস্য ব্যারিষ্টার রুমিন ফারহানা বলেন, জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় যে রকম বাজেট দরকার ছিল, তা পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্যখাতে সার্বিক অবহেলা ছিল, তা আছে। টিকার বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। টিকার উৎস পরিষ্কার না। সামাজিক নিরাপত্তা বরাদ্দের সামান্য অংশ পৌঁছাচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা নতুন দরিদ্রদের তথ্য দিলেও স্বীকার করছেন না অর্থমন্ত্রী। তাহলে শিগগির বিআইডিএস বা বিবিএসকে দিয়ে জরিপ করিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটে অর্থমন্ত্রী সবকিছু করতে চেয়েছেন। কিন্তু অগ্রাধিকার নেই। সরকারের ব্যয়ের লক্ষ্য হতে হবে পিছিয়ে পড়া মানুষ, প্রান্তিক মানুষ। সেজন্য কর্মসূচি দরকার। তিনি বলেন, ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার, অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার উন্নয়নে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দরকার।

তিনি বলেন, এসএমই খাতের সুবিধার বড় অংশই মাঝারিরা পেয়ে যায়, ছোটরা পায় না। এজন্য মাঝারিদের আলাদা করতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বাস্তবায়ন পর্যায়ে অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাজেট বিষয়ে সিপিডির মূল্যায়ন তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, করোনার পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়নমূলক, কর্মসংস্থানমূলক ব্যয় দরকার। কিন্তু তা হচ্ছে না। ফলে কাগজে কলমে সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতির কথা বলা হলেও মুলত সংকোচনমূলক রাজস্ব নীতি দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, ঋণ প্রবাহ বাড়েনি। রপ্তানিতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থা তৈরি হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটের প্রাক্কলন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। অবকাঠামো, সুশাসন, দুর্নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে দুর্বলতা রয়েছে।

বিষয় : বাজেট সিপিডি মতামত

মন্তব্য করুন