এক কথায় বীভৎস। টেলিভিশনের পর্দায় বীভৎসতা আমাদের দেখতে হলো একটানা দীর্ঘ সময়। একেবারে উৎসে থেকে জীবন বাজি রাখা অর্থাৎ অগ্নিযোদ্ধা, সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল এবং তাদের সহযোদ্ধা অসংখ্য মানুষের এই বিভীষিকার প্রত্যক্ষ মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। এর পর থেকে পত্রিকার পাতায় উঠে আসছে মর্মস্পর্শিতার আড়ালের আরও কত মর্মস্পর্শী উপাখ্যান! ৮ জুলাই বিকেল থেকে পরদিন প্রায় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় যে মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটে গেল, তা আমাদের শিল্প-কারখানার ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি, নিরাপত্তা ঝুঁকি, নানারকম অসংগতি ও ব্যাধির চিত্র সামনে পুনর্বার তুলে আনল। বিগত পাঁচ দশকে আমাদের শিল্প-কারখানার পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই কারখানার কর্মপরিবেশ যে এখনও কর্মী কিংবা শ্রমিকবান্ধব হয়নি; রূপগঞ্জের ঘটনা এরই সাক্ষ্যবহ।
যে কোনো শিল্প-কারখানার মেরুদণ্ড শ্রমিক কিংবা কর্মীরা। এটাই সত্য, তাদের শ্রম-ঘামে শিল্পের বিকাশ-সমৃদ্ধি এবং মালিক কিংবা উদ্যোক্তার সাফল্য। প্রশ্ন হচ্ছে- এই বিশাল বাহিনীর জীবন ও কর্মের পথ কতটা মসৃণ? উত্তরটা জটিল কিছু নয় এবং সর্বশেষ রূপগঞ্জের হাসেম ফুডসের ঘটনাটি এরই মর্মান্তিক সাক্ষ্যবহ। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে। বিভিন্ন সূচক পরিসংখ্যানে এর গাণিতিক হিসাব আমরা প্রায়ই দেখি-শুনি। হ্যাঁ, বাংলাদেশ এগিয়েছে তা অসত্য নয়; কিন্তু মানুষের অধিকার কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে? মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি কিংবা জাতীয় প্রবৃদ্ধির স্ম্ফীত চিত্রই কি সবকিছুর মাপকাঠি? এ তর্ক ফুরানোর নয়। রূপগঞ্জের বীভৎস ঘটনার পর আরও কত নেতিবাচক চিত্র উঠে আসছে সংবাদমাধ্যমে! একটি শিল্প-কারখানা তো হঠাৎ দোকানের মতো কার্যক্রম শুরু করার বিষয় নয়। শিল্প-কারখানা চালু করার সুনির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া আছে। আইনি শর্ত কিংবা নিয়ম-কানুন মেনে শিল্প-কারখানার কার্যক্রম চালু করতে হয়। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন লাগে।
প্রশ্ন হচ্ছে- সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর এ ক্ষেত্রে দায় কতটুকু। প্রশ্নটি নিশ্চয় এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই। শিল্পের ক্ষত সারিয়ে তুলে শ্রমিক কিংবা কর্মীদের অনুকূল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দায়-দায়িত্ব যাদের, তারা সে দায়িত্ব পালনে কতটা নিষ্ঠ? এই প্রশ্নগুলোও নতুন নয়। হাসেম ফুডসের ঘটনাটি ফের এসবের সঙ্গে আরও কিছু নতুন প্রশ্ন যুক্ত করেছে। হাসেম ফুডসের এত কর্মী কিংবা শ্রমিকের জীবন পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া কি নিছক দুর্ঘটনা? ১০ জুলাই সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনের শিরোনাম- 'তালাবদ্ধ কারখানায় পুড়ে অঙ্গার'। উপশিরোনাম- 'মুখ দেখে চেনা যায়নি একটা লাশও'। এর পরের শিরোনাম 'অনুমতি ছাড়াই ভবনে ছিল কেমিক্যালের গুদাম'। এ রকম আরও কত খবরের শিরোনাম এবং সবই বিস্ময় ও প্রশ্নবোধক। এত বড় হৃদয়বিদায়ক ঘটনার পর এখন যে ত্রুটি কিংবা ক্ষতগুলো সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে আমরা জেনেছি, সেসব সংশ্নিষ্ট সরকারি সংস্থা কিংবা মন্ত্রণালয় কিংবা প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা জানতেন না? যদি তা-ই হয়, তাহলে শঙ্কার দানা আরও বেশি পুষ্ট হয়। তারা কি তাদের দায় এড়াতে পারেন?
অগ্নিকাণ্ডের দীর্ঘস্থায়িত্ব আমাদের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা-দুর্বলতাও ফের তুলে ধরল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মোকাবিলায় উন্নত প্রযুক্তি-আধুনিকতার ছোঁয়া বহু আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং আরও উন্নতকরণে ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরন্তর প্রয়াস অব্যাহত আছে। কিন্তু আমরা এখনও এসব ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। বলতে গেলে সেভাবে নজরই নেই! যদি তা-ই না হতো, তাহলে ঢাকার নিমতলী, চকবাজারসহ বিগত এক দশকে অনেক মর্মস্পর্শী ঘটনার পর আমাদের নজর সেদিকেই অনেক গভীর হতো; সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার প্রয়াস হতো দৃষ্টিগ্রাহ্য। পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে পদে পদে অক্ষমতা-অদূরদর্শিতা-অদক্ষতা-উদাসীনতার ছাপ! ১০ জুলাই সমকালের ভিন্ন একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে বিশেষজ্ঞ কমিটির ১৭ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি ১১ বছরেও। হাসেম ফুডসের ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসসহ অন্য মহল থেকে স্পষ্টতই বলা হয়েছে, ওই কারখানার গেট খোলা থাকলে অনেক প্রাণ বেঁচে যেত। একটা কারখানায় দাউ দাউ আগুন জ্বলছে; এর ভেতর অনেক প্রাণের বাঁচার জন্য আর্তনাদ অথচ কারখানার গেট তালাবদ্ধ! কী ভয়াবহ নির্মমতা!

হাসেম ফুডসের জীবন্ত দগ্ধ অনেকেই শিশু শ্রমিক। এত বড় একটি খাদ্যপণ্য উৎপাদন কারখানায় শত শত শিশু শ্রমিক নিয়োগ করে অল্প পারিশ্রমিক দিয়ে অধিক মুনাফা লুটছিল তারা। কর্তৃপক্ষের লাভালাভের হিসাবে জীবনের কী মর্মন্তুদ পরিণতি! এ রকম চিত্র শুধু হাসেম ফুডসেরই নয়; খুঁজলে আরও অনেক পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার সংখ্যা কত? এক কথায়, অনেক। অথচ প্রশাসনের চোখের সামনে, দায়িত্বশীলদের চোখে ধুলা দিয়ে এগুলো বহাল আছে। হয়তো এর পেছনেও রয়েছে নানারকম সমীকরণ। আইন কিংবা বিধিবিধান অমান্য করার অপসংস্কৃতি, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার বালাই না থাকার কারণেই যে বারবার এমন মর্মান্তিকতার মুখোমুখি আমাদের হতে হচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর পর মাশুল গুনতে হচ্ছে মানুষকে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে। কোন সমাজে আমরা বাস করছি!
রূপগঞ্জের ঘটনার পর যথারীতি গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। হয়তো তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখবে; হয়তো দেখবে না। অনেক সুপারিশ থাকবে, হয়তো কোনোকিছুই বাস্তবায়িত হবে না। হয়তো দায়ীদেরও শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমাদের মনে পুষ্ট। কিন্তু এভাবে চলতে পারে না। কারও লোভ ও লাভের ফাঁদে আটকে জীবন নিয়ে এভাবে সর্বনাশা কর্মকাণ্ড চলতে পারে না। অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির চাদরেই যদি সমস্যা-সংকট আচ্ছাদিত থাকে, তাহলে ভয়াবহ এমন পীড়ায় আমাদের পীড়িত হতেই হবে। রূপগঞ্জের ঘটনা অত্যন্ত পরিস্কারভাবে বলে দিচ্ছে- হাসেম ফুডস কারখানার মালিক কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের জীবন তুচ্ছতুল্যই মনে করেছে। অবহেলা-অবজ্ঞার নির্মম বলি হলো যেসব জীবন, তাদের স্বজনদের কী দিয়ে এই ক্ষতি, এই আর্তনাদ, এই শূন্যতা, এই ক্ষয় ঢেকে দেওয়া যাবে? তারপরও প্রতিটি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে প্রয়োজনের নিরিখে সহায়তার সবকিছু নিয়ে। নিশ্চিত করতে হবে কঠোর আইনি প্রতিকার।
যে কোনো অনিয়ম, অপরাধের যথাযথ আইনি প্রতিকারই যে অপরিহার্য প্রতিবিধান- নিশ্চয় দায়িত্বশীল সবাই এ সত্য স্বীকার করবেন। না, স্বীকারই শেষ নয়, মেনে নেওয়াও নয় চূড়ান্ত কিছু। তাদের এই বিষয়গুলো মেনে নিয়ে করণীয় সবকিছু করতে হবে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে। হাসেম ফুডসের অনিয়ম-ত্রুটি এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার কঠোর, দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে জীবন, শিল্প, অর্থনীতি, মানবিকতার মর্যাদাসহ আরও অনেক কিছুর প্রয়োজনেই। সর্বোপরি আমাদের জাতীয় ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার প্রয়োজনেও। দ্রুত বিচার করতে হবে, যাতে বিলম্বিত বিচারের কারণে ন্যায়বিচার পরাহত না হয়। মানুষের অধিকার গণ্ডিবদ্ধ নয়। মানুষের জীবন কোনোভাবেই হতে পারে না তুচ্ছতুল্য। আমাদের আইনের কোনো অভাব নেই, কিন্তু নানা ক্ষেত্রেই তার প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিয়ে শেষ নেই প্রশ্নের। মানবিক সমাজ ও ব্যবস্থার জন্য এ সবকিছুর নিরসন ঘটাতেই হবে।
ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক, কবি, প্রাবন্ধিক