গত সোম ও মঙ্গলবারের মতো আজও লেনদেনের মাঝে বড় দরপতন হয়েছিল দেশের শেয়ারবাজারে। তবে শেষ পর্যন্ত সামলে নিয়েছে। এমনকি দিনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে মূল্যসূচক ১১৫ পয়েন্ট হারিয়ে যখন খাদে পড়েছিল, সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত সূচকটি গতকালের তুলনায় ৫ পয়েন্ট বেড়ে ৬৬২৩ পয়েন্টে উঠেছে।

প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হওয়া ৩৭৬ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৩৬টির দরপতন দিয়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়েছে। দর বেড়েছে ১১১ শেয়ার ও ফান্ডের। অপরিবর্তিত থেকেছে ২৯টির দর।

সূচক ৫ পয়েন্ট বাড়লেও লেনদেন হওয়া প্রায় ৬৩ শতাংশ শেয়ার দর হারিয়েছে, বিপরীতে বেড়েছে ২৯ শতাংশের দর। অর্থাৎ সূচককে টেনে তুলতে বৃহৎ মূলধনী কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ানো হয়েছে।

তবে দুপুর আড়াইটায় দিনের স্বাভাবিক লেনদেন শেষ হওয়া সময়ের চিত্রের সঙ্গে দুপুর পৌনে ১টার লেনদেন চিত্র একই ছিল না, ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ।

১২টা ৪৭ মিনিটে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকালের তুলনায় ৭৭ পয়েন্ট হারিয়ে দিনের সর্বনিম্ন অবস্থান ৬৫৪০ পয়েন্টে নেমেছিল। 

যদিও বুধবার সকাল ১০টায় লেনদেনের শুরুতে সূচকটি যাত্রা শুরু করেছিল ৬৬১৭.৮৩ পয়েন্ট থেকে। এর আধা ঘণ্টা পর সকাল সাড়ে ১০টায় আগের দিনের থেকে প্রায় ৩৮ পয়েন্ট বেড়ে ৬৬৫৫.৮০ পয়েন্ট পর্যন্ত উঠেছিল। 

এর পর দরপতন শুরু হলেও দুপুর সোয়া ১২টা পর্যন্ত সূচকের পতন সহনীয় পর্যায়ে ছিল। এর পর বিকন ফার্মা, স্কয়ার ফার্মা, ওরিয়ন ফার্মা, এক্মি ল্যাবসহ বৃহৎ মূলধনী কোম্পানির দরপতন হলে সূচকের বড় পতন শুরু হয়। 

এতে সকাল সাড়ে ১০টার দিনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ডিএসইএক্স সূচকটি ১১৫ পয়েন্ট হারিয়ে ১২টা ৪৭ মিনিটে ৬৫৪০.৮০ পয়েন্টে নামে।

এ সময় ৩৭৬ কোম্পানির মধ্যে কেবল ৪২টির শেয়ার দর বেড়ে কেনাবেচা হচ্ছিল।

গত সোম ও মঙ্গলবারও সূচকের ওঠানামায় বড় ধরনের উত্থান-পতন দেখা গিয়েছিল। এর মধ্যে সোমবার লেনদেন শুরুর মাত্র ৩৩ মিনিটেই ডিএসইএক্স মূল্য সূচক আগের দিনের তুলনায় ৭৩ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৫২৩ পয়েন্টে নেমেছিল। ওইদিন পরের এক ঘণ্টায় আগের অবস্থান থেকে ১০০ পয়েন্ট বেড়ে ৬৬২৩ পয়েন্টে উঠে যায়। শেষ পর্যন্ত ক্লোজ হয়েছিল ৬৬২৮ পয়েন্টে।

মঙ্গলবার দিনের লেনদেন শুরুর আধা ঘণ্টায় প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের থেকে ৪১ পয়েন্ট বেড়ে রেকর্ড অবস্থান ৬৬৬৯ পয়েন্টে ওঠেছিল। এর পরই হঠাৎ বড় শেয়ারগুলো দর হারাতে থাকলে পরের ৪০ মিনিটে সূচকটি আগের অবস্থান থেকে ৬০ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৬০৯ পয়েন্টে নেমেছিল। তবে গতকাল মঙ্গলবার শেষ পর্যন্ত ১০ পয়েন্ট হারিয়ে ডিএসইএক্স সূচক ৬৬১৭ পয়েন্টে থেমেছিল। আজ ওই অবস্থান থেকে ১০টা পুনরায় যাত্রা শুরু করে সূচকটি।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে চালুর পর ডিএসইএক্স সূচকটি সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। অনেক শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির ওপর ভর করে সূচক আজকের অবস্থানে এসেছে। ফলে একটু দর বাড়লেই অনেক বিনিয়োগকারী ভয়ে শেয়ার বিক্রি করেন। এ কারণেই এত অস্থিরতা।

এর বাইরে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির নেপথ্যে কারসাজি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কারসাজির অভিযোগ ও প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর গতকাল এমন ৯ কোম্পানির দরবৃদ্ধির নেপথ্যের ঘটনা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। সব কিছু মিলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দরপতনের ভয় থাকা অস্বাভাবিক নয়।

তবে ব্যাপক পতনের পর সূচকের ঘুরে দাঁড়ানোর কারণ বিষয়ে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানান, সূচকের উত্থান-পতনে বড় প্রভাব রাখে এমন শেয়ারগুলোর দর বাড়ানোর মধ্য দিয়ে সূচকের পতন কমেছে। আগেও এমনটা দেখা গেছে। যখনই বড় দরপতন হয়, তখন সূচকের পতন ঠেকাতে বিশেষ কিছু জায়গা থেকে বড় মূলধনী শেয়ার কিনে সেগুলোর দর বাড়ানো হয়। 

সূচকের পতনের কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুপুর পৌনে ১টায় যখন ডিএসইএক্স সূচক ৭৫ পয়েন্ট হারিয়েছিল, তখন ওষুধ ও রসায়ন খাতের শেয়ারের দরপতনই ছিল সূচকটির পতনের বড় কারণ। ওই সময় এ খাতের ৩০ কোম্পানির মধ্যে ২৮টির দরপতনে ডিএসইএক্স সূচক ২৬ পয়েন্ট হারিয়েছিল।

পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, শুধু বিকন ফার্মার দরপতনেই এ সময় ডিএসইএক্স সূচক প্রায় ১০ পয়েন্ট হারিয়েছিল। এছাড়া স্কয়ার ফার্মার দরপতনে ৫ পয়েন্ট, এক্মি ল্যাবের কারণে পৌনে ৩ পয়েন্ট, ওরিয়ন ফার্মার কারণে দেড় পয়েন্ট হারায় ডিএসইএক্স সূচক।

সূচকের পতন ঠেকিয়ে দিতে এসব শেয়ারকেই বেশি কাজে লাগানো হয়েছে। যেমন সাড়ে ১০টায় ডিএসইএক্স সূচক যখন দিনের সর্বোচ্চ অবস্থানে তখন বিকন ফার্মার শেয়ার দিনের সর্বোচ্চ দর ২০৮.৯০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছিল। যখন সূচক দিনের তলানি অবস্থানে, তখন এ শেয়ারও দিনের সর্বনিম্ন দর ১৯২ টাকায়। কিন্তু শেষ লেনদেনটি হয়েছে ১৯৯.৪০ টাকায়। তখন সূচকও ঊর্ধ্বমুখী।

একইভাবে সর্বোচ্চ পতনের সময় স্কয়ার ফার্মার শেয়ারের দরপতনে সূচক প্রায় ৬ পয়েন্ট হারালেও লেনদেন শেষে শেয়ারটির দর বৃদ্ধি পাওয়ায় সূচকে যোগ করে দেড় পয়েন্টেরও বেশি। একইভাবে বেক্সিমকো ফার্মা ৪ পয়েন্ট, রেনেটা সাড়ে ৩ পয়েন্ট যোগ করেছে।

তবে বেক্সিমকো লিমিটেডের দরবৃদ্ধি আজ সূচকে এককভাবে সর্বোচ্চ ১১ পয়েন্টেরও বেশি যোগ করেছে। এটাও সূচকের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছে।

গ্রামীণফোন, লাফার্জ-হোলসিম সিমেন্টের দরবৃদ্ধিও এক্ষেত্রে ভালো অবদান রাখে।

শেষ পর্যন্ত সূচক ঘুরে দাঁড়ালেও সব খাতের বেশিরভাগ শেয়ারকে দর হারাতে দেখা গেছে।

এর মধ্যে সর্বাধিক দর হারিয়েছে প্রকৌশল খাত। এ খাতের ৪২ কোম্পানির মধ্যে ৩৩টি দর হারিয়েছে। বাকি ৯ কোম্পানির মধ্যে ৮টির দরবৃদ্ধি সত্ত্বেও সার্বিক বিচারে ২.৬৭ শতাংশ ওপর দর হারিয়েছে এ খাত।

অন্য খাতগুলোর মধ্যে ব্যাংকের ৩২ কোম্পানির মধ্যে ২০টি দর হারিয়ে ও ৭টি দর বেড়ে কেনাবেচা হচ্ছিল। 

বীমা খাতের ৫১ কোম্পানির মধ্যে ৩৬টি দর হারিয়েছে ও ১৩টি দর বেড়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ২২ কোম্পানির মধ্যে ১০টি দর কমেছে এবং বেড়েছে সমান ১০ শেয়ারের। বস্ত্র খাতের ৫৮ কোম্পানির মধ্যে ৩০টি দর কমেছে, বেড়েছে ২২টির।

অন্য সব খাতের অধিকাংশ শেয়ার দর হারালেও ব্যতিক্রম ছিল সিমেন্ট খাত। এ খাতের ৭ কোম্পানির মধ্যে শেষ পর্যন্ত ৫টির দর বেড়েছে।

শেয়ার দরের ব্যাপক উত্থান-পতনের মধ্যেও ডিএসইতে ১০ শতাংশ দর বেড়ে কেনাবেচা হয়েছে ইসলামিক ফাইন্যান্স, সাউথবাংলা এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক এবং শ্যামপুর সুগার মিলসের শেয়ার। এর মধ্যে সাউথবাংলা এগ্রিকালচারাল কমার্স ব্যাংক আজই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

এই তিন কোম্পানির বাইরে পেপার প্রসেসিং, জিলবাংলা সুগার, তমিজুদ্দিন টেক্সটাইল, ন্যাশনাল হাউজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ, কপারটেক, মালেক স্পিনিংয়ের শেয়ারদর ৮ থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

বিপরীতে সাড়ে ৬ শতাংশের ওপর দর হারিয়ে দরপতনের শীর্ষে ছিল নূরানী ডাইং।

৫ শতাংশের ওপর দর হারিয়ে এর পরের অবস্থানে ছিল আইসিবি এএমসিএল দ্বিতীয় মিউচুয়াল ফান্ড এবং এপেক্স ফুডস।

আজ শেষ পর্যন্ত ডিএসইতে ২ হাজার ২১২ কোটি ৮৯ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।

এর মধ্যে এককভাবে ২০০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন নিয়ে বেক্সিমকো লিমিটেড সবার ওপরে। ৯৭ কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে এর পরের অবস্থানে  আইএফআইসি ব্যাংক।

একক খাত হিসেবে ৩৩৯.৭১ কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে শীর্ষে বস্ত্র খাত, যা মোট লেনদেনের ১৫.৩৫ শতাংশ।