সরকারি তরল পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আওতার বাইরে রাখার নির্দেশনা দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। সম্প্র্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এ-সংক্রান্ত চিঠি দিয়েছে কমিশনকে। তবে বেসরকারি এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা থাকছে কমিশনের কাছেই।

খাতসংশ্নিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের দাম নির্ধারণ কমিশনের কাজ। গত এপ্রিল থেকে সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের এলপি গ্যাসের দাম খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। কিন্তু জ্বালানি বিভাগ এখন সেই কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ করল। এভাবে জ্বালানি বিভাগ মূলত কমিশনের ক্ষমতাকেই খর্ব করল।

বিইআরসি গত ১২ এপ্রিল ভোক্তা পর্যায়ে সরকারি এলপি গ্যাসের প্রতি সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৫৯১ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, স্বল্প মূল্যের সরকারি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার সাধারণ ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই ফুরিয়ে যায়।

প্রথমবারের মতো এলপিজির মূল্য নির্ধারণ: বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্যাস সম্পদ ও পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের সঞ্চালন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, এই খাতে ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, ট্যারিফ নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা, ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে ২০০৩ সালে জাতীয় সংসদে বিইআরসি আইন পাস করা হয়। তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ছাড়া অন্য কোনো জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করে না বিইআরসি। জ্বালানি তেলের দাম বিইআরসি করার কথা থাকলেও বরাবরই তা নির্বাহী আদেশে হয়ে আসছে। উচ্চ আদালতের আদেশে কমিশন সম্প্রতি সরকারি-বেসরকারি এলপিজির মূল্য নির্ধারণ শুরু করে।

গত ফেব্রুয়ারিতে গণশুনানি করে ১২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো সরকারি-বেসরকারি এলপিজির দর নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে যা প্রতি মাসেই সমন্বয় করে আসছে কমিশন। বেসরকারি এলপিজি ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসে আরেক দফা শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এখনও এ-সংক্রান্ত নতুন আদেশ জারি হয়নি।

জ্বালানি বিভাগের চিঠি: গত সপ্তাহে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের উপসচিব শামীমা ফেরদৌস স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বিইআরসিতে দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, এলপিজির মোট চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ সরবরাহ করে সরকারি কোম্পানি। এর দর নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল বিপিসির। এখন বিইআরসি দর নির্ধারণ করায় প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি ও জনগণের সার্বিক কল্যাণের উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় সরকারি কোম্পানিটির এলপি গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি বিইআরসির আওতাবহির্ভূত রাখা প্রয়োজন। এ দায়িত্ব বিপিসি পালন করতে পারে। তাই সরকারি এলপি গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ বিইআরসির আওতাবহির্ভূত রাখার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।

জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি বিভাগের এ সিদ্ধান্ত আইনবিরোধী। একই পণ্যের ক্ষেত্রে সরকারি দাম আর বেসরকারি দাম আলাদাভাবে নির্ধারণ করা কতখানি যুক্তিযুক্ত? এই সিদ্ধান্ত জনস্বার্থ, আইন এবং আদালতের সিদ্ধান্ত বিরোধী।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, বিপিসির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ সরকারি এলপিজি আমদানি করা হয় না। পরিমাণে কম উৎপাদন হওয়ার কারণে ব্যবহারও হয় খুবই সীমিত আকারে। বিপিসির দিক বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিপিসি চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ বলেন, বেসরকারি এলপিজি কোম্পানির সঙ্গে সরকারি এলপিজি কোম্পানির উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই এটি কমিশনের আওতার বাইরে রাখাই উচিত।

দেশে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সময় উপজাত হিসেবে উৎপাদিত এলপিজি সংরক্ষণ করে সেটা বোতলজাত করা হয়। এ ছাড়া গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত কনডেনসেট থেকে কিছু এলপি গ্যাস পাওয়া যায়। এই এলপিজি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আওতাধীন কোম্পানি 'এলপি গ্যাস লিমিটেড'-এর মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। আর বেসরকারি এলপি গ্যাসের কাঁচামাল পুরোটাই আমদানি করা হয়।

পেট্রোলিয়াম পদার্থে দাম নির্ধারণ করতে পারছে না বিইআরসি: ২০০৩ সালে করা বিইআরসি আইনের আলোকে পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের খুচরা ট্যারিফ প্রবিধানমালা-২০১২ ও পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ পরিবহন ট্যারিফ প্রবিধানমালা-২০১২ প্রণয়ন করে বিইআরসি। প্রবিধানমালা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়।

এম শামসুল আলম অভিযোগ করেন, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সেই প্রবিধানমালা আটকে রেখে এলপিজি অপারেশনাল লাইসেন্সিং নীতিমালা-২০১৭ প্রণয়ন করে। এই নীতিমালায় এলপিজি মূল্যহার নির্ধারণ পদ্ধতি ও লাইসেন্সিং নিজের হাতে রেখে দেয়। বিইআরসি আইনের সঙ্গে নীতিমালা সাংঘর্ষিক হওয়ায় কমিশনের পক্ষ থেকেও আপত্তি তোলা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় তাতে কোনো কর্ণপাত করেনি। এখন এলপি গ্যাস সমন্বিত নীতিমালা-২০২১ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সংশ্নিষ্ট সবার মতামত চাওয়া হয়েছে। ক্যাবের উপদেষ্টা দাবি করেন, এই নীতিমালাও আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।