গত বছরের চেয়ে এবার ধানের উৎপাদন বেশি হয়েছে। বাড়তি উৎপাদন হলেও চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকার শুল্ক্ক কমিয়ে বেসরকারি খাতে আমদানির সুযোগ দিয়েছে। সরকার নিজেও আমদানি করছে। খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কার্যক্রমসহ অন্যান্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের কোনো প্রভাব নেই বাজারে। চড়া দরেই চাল কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে গত বছরের তুলনায় চালের দাম কমেছে। এমনকি আমদানি করা চালের যে যৌক্তিক মূল্য খাদ্য অধিদপ্তর নির্ধারণ করেছে, তার চেয়ে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক মুনাফাই মূলত চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ব্যবসায়ী, সরকারের সংশ্নিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালের চড়া দামের কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত- বাজারের সিংহভাগ সরবরাহ বড় ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে। ধানের দাম বৃদ্ধিও অন্যতম কারণ। তবে ধানের বাড়তি দামের সুফল কৃষক খুব একটা পান না। এ ছাড়া প্রকৃত উৎপাদন ও চাহিদার সঠিক তথ্য নেই। সরকারি সংস্থাগুলো চাহিদা ও সরবরাহের যেসব তথ্য মাঝেমাঝে দেয় সেখানে গরমিল রয়েছে। মজুদ আইনের ফাঁকফোকর এবং মনিটরিংয়ের দুর্বলতার কারণেও সরকারের নীতি উদ্যোগ ঠিকমতো কাজ করছে না।
গতকাল রাজধানীর বাজারগুলোতে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে মোটা চাল বিক্রি হয়েছে। মাঝারি মানের প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫৬ টাকা দরে। আর বিভিন্ন জাতের সরু চাল প্রতি কেজি ৫৮ থেকে ৬৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চালের দাম বাড়তি থাকায় নিম্ন-আয়ের মানুষের সংসার চালানোর কষ্ট আরও বেড়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর সেপ্টেম্বরে ভারতে এক টন চালের দাম ছিল ৩৭৪ ডলার, যা বর্তমানে ৩৬০ ডলারে পাওয়া যাচ্ছে। থাইল্যান্ডে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৪৭৭ ডলার দিয়ে এক টন চাল কিনতে হয়েছে। যা বর্তমানে মিলছে ৩৮১ ডলারে। একইভাবে ভিয়েতনামে চালের দাম প্রতি টনে ২৫ ডলার কমে ৪২৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশের আমদানিকারকরা এসব দেশ থেকেই চাল আমদানি করছেন। সরকারও ভারত, থাইল্যান্ড থেকে চাল আমদানি করছে। খাদ্য অধিদপ্তর বলছে ভারত থেকে চাল আমদানি করলে জাহাজ ভাড়াসহ সব ধরনের খরচ ও কেজিতে এক লাখ লাভ যোগ করে বাংলাদেশের বাজারে তার দাম পড়বে ৩৩ টাকা ৫৩ পয়সা। থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করলে তার দাম পড়বে ৩৮ টাকা। কিন্তু দেশের বাজারে কোথাও এই দরে চাল পাওয়া যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থানীয় মিলের চালের দাম কমছে না বলে আমদানিকারকরা দাম কমাচ্ছে না। তবে আমদানির প্রভাবে দাম কিছুটা কমেছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুর রশিদ। তিনি বুধবার সমকালকে বলেন, আমদানির ফলে চালের দাম যেভাবে কমার কথা ছিল, সেভাবে কমেনি। তবে সামগ্রিকভাবে দাম কমছে। কিছুদিন আগে যে চালের বস্তা (৫০ কেজি) ২ হাজার ৯০০ টাকা বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে তা ২ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমদানি না হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তবে আমদানির সুফল পুরোপুরি বাজারে না পড়লে তার জন্য মনিটরিং বাড়াতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাজারে আধুনিক মেশিনের চালের চাহিদা বাড়ছে বলেই অটো রাইস মিল বাড়ছে। মিলারদের মধ্যে কোনো সিন্ডিকেট নেই।
চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে গত ৭ জানুয়ারি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে আমদানি শুল্ক্ক ১০ শতাংশ কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করে। পাশাপাশি আমদানিতে সব ধরনের নিয়ন্ত্রকমূলক শুল্ক্ক প্রত্যাহার করা হয়। তবে চাল আমদানিতে আগাম কর ৫ শতাংশ ও আগাম আয়কর ৫ শতাংশ বহাল থাকে। এক কথায় চাল আমদানিতে শুল্ক্ক ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এ সুবিধায় চাল আমদানি করা গেছে। পরে চালের দাম আরও বাড়লে সরকার পুনরায় গত ১২ আগস্ট একই সুবিধায় আমদানির সুযোগ দিয়েছে। আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত এই কম শুল্ক্কে চাল আমদানি করা যাবে। বর্তমানে চাল আমদানি চলছে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ৫ লাখ ৩৬ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ১৩ লাখ ৫৯ হাজার টন চাল আমদানি হয়।
কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, গেল বোরো মৌসুমে ২ কোটি ৮ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। এ বছর আমনের চাষ বেড়েছে ৪৩ হাজার হেক্টর। এ জন্য সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান আশা করছেন, আমনের ফলনও আগের বছরের তুুলনায় বেশি হবে। তিনি বলেন, এ বছর আমন থেকে দেড় কোটি টন ধান পাওয়া যাবে। বর্তমানে আমন কাটা শুরু হয়েছে। গত বছর ১ কোটি ৪৬ লাখ টন আমন ধান উৎপাদন হয়েছিল। এ ছাড়া ৩০ হাজার টনের বেশি আউশ উৎপাদন হয়েছে। সব মিলিয়ে গেল বছর ৩ কোটি ৬০ লাখ টন ধানের উৎপাদন আশা করা হচ্ছে।
এদিকে দেশে চালের প্রকৃত চাহিদা কত তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১৬-এ বলা হয়েছে, দেশের মানুষ দৈনিক গড়ে ৩৬৭ গ্রাম চাল খায়। এ হিসাবে দেশে ১৭ কোটি মানুষ ধরলে ২ কোটি ২৭ লাখ টন চালের প্রয়োজন পড়ে। তবে অনেকে মনে করেন, দেশের জনসংখ্যা আরও বেশি। চালের অন্যান্য ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে মুড়ি, চিড়া ও পিঠাপুলিতে চালের ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ছাড়া মাছ, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগির খাবার হিসেবেও চালের ব্যবহার হয়। ফলে মোট চাহিদা আরও বেশি। তবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, দেশে চালের চাহিদার বিভিন্ন হিসাব আছে। গবেষকদের এক হিসাবে দেখা গেছে, বছরে ৩ কোটি ২৩ লাখ টন চালের চাহিদা রয়েছে।
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চালের দাম কমলেও দেশের বাজারে পণ্যটির বাড়তি দামের কারণ জানতে চাইলে মিল মালিক, আড়তদার, পাইকারি ব্যবসায়ীদের কেউই সদুত্তর দেননি। অধিকাংশরাই এড়িয়ে গেছেন। কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, দেশে ছোট ছোট চাল ব্যবসায়ীরা ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়েছে। অনেক ছোট চালকল এখন বন্ধ। ফলে বিভিন্ন জেলার স্থানীয় সরবরাহ কমে গেছে। বড় বড় কিছু চালকল পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় বলছে, চলতি বোরো মৌসুমের সংগ্রহ সফলভাবে শেষ হয়েছে। গত ২১ আগস্ট পর্যন্ত ৩ লাখ ৬২ হাজার ৪৪৫ টন বোরো ধান এবং ১০ লাখ ৬০ হাজার ৪৬০ টন বোরো চাল এবং ৮৫ হাজার ৫০৩ টন বোরোর আতপ চাল সংগ্রহ করেছে। ১১ অক্টোবরে সরকারি গুদামে ১৪ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল মজুদ রয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ, সরবরাহ, আমদানি ও মূল্য পরিস্থিতি বিষয়ক সভায় বলা হয়েছে, বাজারের চালের কোনো সংকট নেই।
অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ দেশের চালের বাজারে বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা ও প্রতিযোগিতা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি সমকালকে বলেন, চালের বাজারে বড় রাইস মিলগুলোর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক সময় দেশে লাখ লাখ চাতাল ছিল, যা বর্তমানে অনেক কমে গেছে। চাতাল দেশব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল এবং কম পরিমাণে উৎপাদন ও সরবরাহ করত। তাতে বাজারে সরবরাহ ছিল অনেকের হাতে। এখন সরবরাহের বড় অংশ চলে গেছে গুটিকয়েক বড় মিলের হাতে। এ জন্য চালের বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে বড় অটো রাইস মিলের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। ৫০টি অটো রাইস মিল চালের বাজারের ২০ ভাগের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। অবশ্যই আধুনিক প্রযুক্তিগত উৎপাদন ব্যবস্থার দরকার আছে। কিন্তু একটা মিল সর্বোচ্চ কী পরিমাণ উৎপাদন করবে, তার মূল্যায়ন করা দরকার। পাশাপাশি মজুদ আইনে পরিবর্তন দরকার। কারণ বড় মিল উৎপাদন ও সংরক্ষণ ক্ষমতা অনুযায়ী বাজার থেকে ধান সংগ্রহ করে। এতে একটা মিলই প্রচুর ধান সংগ্রহ করে থাকে। এমনকি অনেক দূরের মোকাম থেকে ধান সংগ্রহ করে মিলগুলো। সেজন্য পরিবহন খরচ বেশি হয়। অন্যদিকে চাল পলিশ করায়ও খরচ বাড়ে। দেশে চালের দাম বেশি থাকার এগুলোও কারণ।