টিকা কিনতে সরকারকে বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। অন্যসব পণ্যের আমদানি ব্যাপক বেড়েছে। গ্রাহকের আগে নেওয়া বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ পরিশোধ বেড়ে গেছে। রেমিট্যান্সে পতন এবং আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম হারে বেড়েছে। সব মিলিয়ে টাকার বিপরীতে দিন দিন তেজি হচ্ছে ডলার। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের দর ৮৫ টাকা ৬৫ পয়সায় উঠেছে। গত আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছিল ৮০ টাকা ৮০ পয়সা দরে। বাজার ঠিক রাখতে গত দুই মাসে ১০১ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, গত জুলাই পর্যন্ত বাজার থেকে ডলার কিনছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আগস্ট থেকে কোনো ব্যাংক আর ডলার বিক্রির জন্য আসছে না। বরং কয়েকটি ব্যাংক নিয়মিতভাবে ডলার কিনতে আসছে। এককভাবে সবচেয়ে বেশি ডলার নিচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার রূপালী ব্যাংক। টিকা কেনার বিল পরিশোধের জন্য ব্যাংকটিকে প্রায় ২৩ কোটি ডলার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রি শুরু হয় গত ১৯ আগস্ট। ওই দিন ৫ কোটি ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকে গত বুধবার পর্যন্ত বিক্রি করা হয় ১০১ কোটি ডলার। ডলার বিক্রির ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে আবার ৪৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। গত আগস্টে রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, আগে নিয়মিত বাজারে ডলার বিক্রি করত এমন ব্যাংকগুলো বাড়তি চাহিদা তৈরির পর থেকে আর বিক্রি করছে না। যে কারণে এখন নিয়মিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ধরনা দিচ্ছে কোনো কোনো ব্যাংক। বাজার ঠিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রচুর ডলার বিক্রি করছে। তবে ব্যাংকগুলো নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য ডলার বিক্রি বন্ধ রেখেছে, নাকি দাম আরও বাড়বে এমন ধারণা থেকে ইচ্ছে করে ডলার ধরে রাখছে, তা যাচাই করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়মের ব্যত্যয় পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে বুধবার মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। অবশ্য এর আগে নৈতিক চাপ তৈরির মাধ্যমে মৌখিকভাবে ডলারের দর বেঁধে দেওয়া হতো। রেমিট্যান্স কমার প্রবণতার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, করোনার কারণে টিকা কেনায় একটা বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক দিন একটা স্থবিরতার পর বেশিরভাগ পণ্যের আমদানি বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে রপ্তানি বাড়লেও আমদানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় কম আছে। সব মিলিয়ে ডলারের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আবার বিশ্ববাজারে ভোগপণ্যের দাম বাড়তির দিকে রয়েছে। ফলে এখন ডলারের দর কমবে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দর ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় অপরিবর্তিত ছিল। তবে ৩ আগস্ট থেকে দর বাড়তে বাড়তে গতকাল উঠেছে ৮৫ টাকা ৬৫ পয়সায়। এর মানে আন্তঃব্যাংকে এ কয়েকদিনে প্রতি ডলারে ৮৫ পয়সা বেড়েছে। আন্তঃব্যাংকের পাশাপাশি আমদানি, রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও নগদ ডলারের দরও বেড়েছে। ডলারের দর বৃদ্ধির এ প্রবণতা রপ্তানিকারক ও রেমিটারদের জন্য খুশির খবর। যদিও বাংলাদেশের চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানি দিয়ে মেটানোর ফলে সামগ্রিকভাবে সুফল মেলে না। এদিকে, বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় ভ্রমণে বের হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। যে কারণে নগদ ডলারের দর ৮৯ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। মানি চেঞ্জারেও এ দরে কেনাবেচা হচ্ছে। কিছু দিন আগেও যা ৮৭ টাকার মতো ছিল।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আমদানিতে ব্যয় হয় এক হাজার ১৭২ কোটি ডলারের। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। অথচ প্রথম দুই মাসে রপ্তানি কমে শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ। অবশ্য সেপ্টেম্বরে রপ্তানিতে প্রায় ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর প্রথম তিন মাস বিবেচনায় রপ্তানি ১১ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। আর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৫৪০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় যা ১৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ কম।

বিষয় : তেজি হচ্ছে ডলার

মন্তব্য করুন