আয়কর সম্পর্কে কিছু তথ্য করদাতার অবশ্যই জানা থাকা দরকার। আয়কর দিতে হয় আগের অর্থবছরের আয়ের ওপর কর। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করদাতাদের পরের অর্থবছরে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়ে থাকে। তবে বেশিরভাগ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর দিয়ে থাকে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে। আয়কর দিতে করদাতাকে কোন কোন বিষয় জানতে হবে, তা নিয়ে লিখেছেন শেখ আবদুল্লাহ

বর্তমানে করদাতারা ২০২১-২২ কর বছরের জন্য কর দিচ্ছেন। কিন্তু করের হিসাব করা হচ্ছে করদাতার ২০২০-২১ অর্থবছরের আয়ের ওপর। করদাতাদের অনেকেই বেশ দক্ষতার সঙ্গে রিটার্ন ফরম পূরণ ও কর পরিশোধ করে থাকেন। কিন্তু অনেকেই আছেন, যাদের এ বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা নেই। আয়কর রিটার্নে কী কী তথ্য দিতে হবে, রিটার্নের সঙ্গে কোন কোন নথিপত্র জমা দিতে হবে, কোন আয় অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার- এসব বিষয়ে অনেকের জানার ঘাটতি রয়েছে। যথাযথ তথ্য রিটার্নে উল্লেখ না করা বা ভুল করায় নানা জটিলতায়ও পড়েন। বিশেষত নতুন করদাতার ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। করদাতারা যাতে সহজে সঠিকভাবে রিটার্ন ফরম পূরণ করতে পারেন, সেজন্য এনবিআর তার ওয়েবসাইটে করবিষয়ক বিভিন্ন তথ্য দিয়ে রেখেছে।

আয়কর আইন অনুযায়ী করের আওতায় পড়ে ৯ ধরনের আয়। এর একটি হলো চাকরি থেকে আয় বা বেতন। ব্যবসা এবং বাড়িভাড়া থেকে আয় করের আওতায় পড়ে। বাকিগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্পত্তি বিক্রি অথবা হস্তান্তর করে পাওয়া অর্থ, সঞ্চয়পত্র, বন্ড ও ব্যাংকে রাখা আমানতের সুদ আয়, কৃষি থেকে আয়, ফার্মের মুনাফা বা আয়ের অংশ এবং স্বামী অথবা স্ত্রী অথবা অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের আয়। এ ছাড়া আরও কয়েকটি বিষয় করদাতার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে আয়কর দেওয়ার বিধান রয়েছে। যেমন, করদাতার গাড়ি থাকলে বা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি সম্পদ থাকলে কর দিতে হবে। কর দিতে হলে একটি নির্দিষ্ট রিটার্ন ফরম পূরণ করে সেখানে করদাতার আয়ের বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করে মোট আয় নির্ধারণের পর কর পরিশোধ করতে হয়। করদাতার কিছু আয়কে এনবিআর করমুক্ত রেখেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগ থাকলে করছাড় পাওয়া যায়। আবার যেসব ক্ষেত্রে উৎসে কর কেটে রাখা হয়, করদাতাকে সেই উৎসে কর কাটার প্রত্যয়ন নিয়ে রিটার্নের সঙ্গে জমা দিতে হয়। এতে উৎসে পরিশোধ করা কর সমন্বয় করে থাকেন করদাতা।

রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি: বর্তমানে রিটার্ন দাখিলের জন্য দুটি পদ্ধতি আছে। প্রথমটি হচ্ছে সাধারণ পদ্ধতি। আর আয়কর আইনের '৮২বিবি' ধারা অনুযায়ী রয়েছে সর্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতি। এনবিআর ২০১৬-১৭ কর বছরে নতুন রিটার্ন ফরম চালু করেছে। এই ফরমে দুই ধরনের পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করা যায়। তবে করদাতা কোন পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করছেন, তা ফরমে উল্লেখ করতে হয়। এ জন্য রিটার্ন ফরমের প্রথম পৃষ্ঠায় ২ নম্বর ক্রমিকে '৮২বিবি' ধারা অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল করা হচ্ছে কিনা- এ-সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে 'হ্যাঁ' ঘরে টিক চিহ্ন দিতে হবে। এই ক্রমিকে 'না'-এর ঘরে টিক দিলে অথবা কোথাও কোনো কিছু উল্লেখ না করলে করদাতা সাধারণ পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করেছেন বলে গণ্য হবে। এ ছাড়া করদাতাদের সুবিধার্থে ২০২০ সালে এনবিআর এক পৃষ্ঠার রিটার্ন দাখিল ফরম চালু করেছে। আইটি-ঘ ২০২০ নামের ওই ফরমে রিটার্ন দাখিল করলেও তা সর্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে দাখিল বলে গণ্য হবে। করদাতার আয় ও ব্যয় দেখানোর জন্য আলাদা আলাদা ফরম রয়েছে। বিশেষত বেতন আয়, গৃহসম্পত্তির আয় এবং ব্যবসার আয়ের জন্য আলাদা ফরম আছে। করদাতাকে এগুলো পূরণ করে রিটার্নের সঙ্গে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি করদাতা যদি বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত দাবি করেন, তাহলে তাকে দাবি করা বিনিয়োগ, দান ইত্যাদির প্রমাণ হিসেবে বিভিন্ন দলিল সংযুক্ত করতে হবে। উল্লেখ্য, নতুন রিটার্নের পাশাপাশি আগের রিটার্ন ফরমগুলোও করদাতা চাইলে ব্যবহার করতে পারবেন।

সর্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতি: এ পদ্ধতিতে করদাতা আয় ও ব্যয় হিসাব করে নিজের কর নিজেই নির্ধারণ করেন। এ জন্য করদাতার অবশ্যই ১২ ডিজিটের টিআইএন নম্বর থাকতে হবে। নতুবা এ পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করা যাবে না। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে অথবা করদাতার সংশ্নিষ্ট কর অঞ্চলের উপ-কর কমিশনারের অনুমোদন করা বাড়তি সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে তা সর্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতির আওতায় পড়বে না। এভাবে দাখিল করা রিটার্নের প্রাপ্তি স্বীকারপত্রই কর নির্ধারণী আদেশ হিসেবে গণ্য হয়। রিটার্নে ভুল করলে করদাতাকে জটিলতায় পড়তে হতে পারে। তবে ভুল সংশোধনেরও সুযোগ আছে। রিটার্ন দাখিলের ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধন করতে হয়। এর পরে আর সংশোধনের সুযোগ থাকে না। তবে দাখিল করা রিটার্ন অডিটের আওতায় পড়লে ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকে না। কিন্তু কোনো করদাতা যদি আগের আয় বছরের তুলনায় কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বেশি আয় দেখান অথবা কিছু শর্ত পূরণ করেন, তাহলে তার রিটার্ন অডিটের আওতায় পড়বে না। এসব শর্তের মধ্যে মধ্যে রয়েছে- কর অব্যাহতি দাবি করলে তার পক্ষে উপযুক্ত প্রমাণপত্র দেওয়া। ওই আয় বছরে পাঁচ লাখ টাকার বেশি ঋণ নিয়ে থাকলে তার প্রমাণ জমা দেওয়া হলে। কোনো দান গ্রহণ করা না হলে অথবা কোনো ফেরত দাবি না করলে রিটার্ন অডিটের আওতায় পড়বে না।

সাধারণ পদ্ধতি: এ পদ্ধতিতে কর নির্ধারণের পর উপ-কর কমিশনার কর নির্ধারণ করেন। করদাতা রিটার্নে যে তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তা উপ-কর কমিশনারের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে না হলে করদাতাকে ডেকে তার উপস্থিতিতে কর নির্ধারণ করেন তিনি। আবার প্রদর্শিত আয়ের সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ঘাটতি থাকলেও করদাতাকে ডেকে সে বিষয়ে জানতে চাইতে পারেন।

চাকরিজীবীর কর: সাধারণত একজন চাকরিজীবী করদাতার মূল বেতন, উৎসব ভাতা, পরিচারক ভাতা, সম্মানী ভাতা, ওভারটাইম, স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিলে নিয়োগকর্তার চাঁদা এবং বিভিন্ন পারকুইজিট (সুবিধা) বাবদ আয় করযোগ্য। চাকরিজীবীর বাড়িভাড়ার পুরোটা করযোগ্য নয়। বাড়িভাড়া ভাতার ক্ষেত্রে মূল বেতনের অর্ধেক অথবা মাসিক ২৫ হাজার টাকার মধ্যে যা কম, তা করমুক্ত। একইভাবে চিকিৎসা ভাতারও পুরোটা করযোগ্য নয়। মূল বেতনের ১০ শতাংশ অথবা বার্ষিক এক লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে যা কম, তা করের বাইরে। তবে প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে টাকার পরিমাণ ১০ লাখ। হার্ট, কিডনি, লিভার, ক্যান্সার সার্জারি খরচের জন্য প্রাপ্ত অর্থ করমুক্ত। যাতায়াত ভাতা বার্ষিক ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত। যানবাহন সুবিধার জন্য ৬০ হাজার টাকা, বিনামূল্যে বা হ্রাসকৃত ভাড়ায় আবাসন সুবিধা পেলে ৯০ হাজার টাকা, এবং গ্র্যাচুইটি থেকে পাওয়া আড়াই কোটি টাকার বেশি অর্থ আয়করে হিসাব করতে হবে। তবে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর ল্যাম্প গ্রান্টসহ সরকারি ভাতা যেমন- ভাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, শ্রান্তিবিনোদন ভাতা, বাংলা নববর্ষ ভাতা করমুক্ত থাকবে।

সঞ্চয়পত্রের সুদ: ২০২১-২২ কর বছরে যে কোনো ধরনের সঞ্চয়পত্রের অর্জিত সুদের ওপর উৎসে কর্তিত কর ওই খাতের বিপরীতে চূড়ান্ত কর দায়ের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নূ্যনতম করদায় পরিশোধ হিসেবে গণ্য হবে।

গৃহসম্পত্তি থেকে আয়ের কর নির্ধারণ: কোনো করদাতা তার বাড়ি আবাসিক বা বাণিজ্যিক কাজে ভাড়া দিলে সেই আয় রিটার্নে গৃহসম্পত্তির আয়ের ঘরে উল্লেখ করতে হবে। এ ধরনের আয় নিরূপণের জন্য আলাদা তপশিল রয়েছে। বাড়ির ঠিকানা, মোট আয়তন, বাড়িতে করদাতার অংশ (যদি যৌথ মালিকানার বাড়ি হয়) উল্লেখ করতে হবে। প্রতি মাসের ভাড়া হিসেবে ১২ মাসের আয় দেখাতে হবে। যদি বছরের কোনো মাস বাসা খালি থাকে তা প্রমাণ সাপেক্ষে আলাদা ঘরে উল্লেখ করতে হবে। আবাসিক কাজে ভাড়া দেওয়া হলে ২৫ শতাংশ আর বাণিজ্যিক কাজে ভাড়া দেওয়া হলে ৩০ শতাংশ মেরামত বাবদ ব্যয় দেখানো যাবে। এ জন্য কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে হবে না। করদাতার একাধিক বাড়ি থাকলে প্রতিটি বাড়ির জন্য একই রিটার্নে আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে। মেরামত খরচ, পৌর কর, ভূমি রাজস্ব কর বাবদ করদাতা যে খরচ করবেন, তা আয় থেকে বাদ যাবে। একই সঙ্গে ওই বাড়ির জন্য কোনো ব্যাংক ঋণ থাকলে ঋণের সুদ বাবদ যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তাও বাদ যাবে আয় থেকে।

রিটার্নের সঙ্গে যেসব নথিপত্র দিতে হবে: রিটার্নের সঙ্গে বিভিন্ন উৎসের আয়ের পক্ষে প্রমাণ বা বিবরণী দাখিল করতে হয়। যেমন- বেতন খাতে আয়ে বেতন বিবরণী এবং ব্যাংকের সুদ আয় থাকলে তার বিবরণী। বন্ড বা ডিবেঞ্চার থাকলে তার ফটোকপি। ঋণ থাকলে তার ব্যাংক প্রত্যয়নপত্র। বাড়িভাড়া থেকে আয় থাকলে ভাড়ার চুক্তি, ভাড়ার রসিদ ও ব্যাংকে জমার বিবরণী দিতে হবে। পৌর কর, সিটি করপোরেশনের কর ও ভূমি রাজস্ব পরিশোধের রসিদ দিতে হবে। ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে বাড়ি নির্মাণ বা কেনা হলে ঋণের প্রমাণপত্র দিতে হবে। গৃহসম্পত্তির বীমা থাকলে প্রিমিয়ামের সনদ দিতে হবে। ব্যবসা বা পেশার আয় বিবরণী ও স্থিতিপত্র. ফার্মের আয়বিবরণী ও স্থিতিপত্র, মূলধনি লাভের বেলায় সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের প্রমাণপত্র দিতে হবে। উৎসে আয়কর জমা দিলে চালান বা পে-অর্ডারের ফটোকপি লাগবে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ থাকলে তার প্রত্যয়নপত্র লাগবে।

যেসব ক্ষেত্রে কর রেয়াত: করদাতার যদি জীবন বীমা থাকে, তার প্রিমিয়াম বাবদ পরিশোধ করা অর্থে কর রেয়াত পাবেন। ডিপোজিট পেনশন স্কিমে (ডিপিএস) বার্ষিক ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে কর রেয়াত রয়েছে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, স্টক, মিউচুয়াল ফান্ড, ডিবেঞ্চার ও ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগে কর রেয়াত রয়েছে। ভবিষ্য তহবিলে দেওয়া চাঁদা বাবদ কর রেয়াত পাওয়া যায়। সরকারি কর্মকর্তার প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা, স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিলে কর্মকর্তা ও নিয়োগ কর্তার দেওয়া চাঁদা, সুপার অ্যানুয়েশন ফান্ডে দেওয়া চাঁদা, কল্যাণ তহবিলে দেওয়া চাঁদা ও গ্রুপ বীমা স্কিমের কিস্তির জন্য কর রেয়াত সুবিধা রয়েছে। সরকার স্বীকৃত কোনো জাকাত তহবিলে দান করলেও করদাতা কর রেয়াত পাবেন। আরও কিছু ক্ষেত্রে কর রেয়াত রয়েছে।