বাংলাদেশ লবণ চাষী সমিতি মাঠ ও মিল পর্যায়ে সাড়ে ৬ লাখ টন লবণ মজুদ থাকার দাবি জানালেও শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, ‘চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন’ কম হওয়ায় প্রাথমিকভাবে ৩.১৬ লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানি করতে সুপারিশ করা হয়েছে।   

লবণ চাষি সমিতি বলছে, দেশে উৎপাদিত সাড়ে ৪ লাখ টন লবণ এখনও ‘অবিক্রিত’ অবস্থায় মাঠে পড়ে আছে। পাশাপাশি উৎপাদন মৌসুম শুরু হওয়ায় মাঠে নেমেছেন লবণ চাষিরা। তাদের অভিযোগ, এ অবস্থায় দেশীয় লবণ না কিনে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির পাঁয়তারা করছে মিল মালিকদের একটি সিন্ডিকেট। 

সোমবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে লবণ চাষি ও লবণ মিল মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় শিল্প সচিব লবণ আমদানির কথা জানালে লবণ চাষিরা প্রতিক্রিয়া দেখান।

‘উৎপাদন কম, তাই আমদানি হবে’

সভায় শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘চাহিদার বিপরীতে  উৎপাদনের পরিমাণ কম হওয়ায় প্রাথমিকভাবে ৩.১৬ লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।’

তিনি জানান, মাঠ পর্যায়ে লবণের বাস্তব মজুদ নিরুপনে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে শীঘ্রই একটি কমিটি গঠন করা হবে। উৎপাদন মৌসুমের আগে মে মাসে লবণের চাহিদা অনুযায়ী বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যৌক্তিক সময়ে চাহিদা সাপেক্ষে লবণ আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করা হবে। 

উৎপাদন খরচ কমাতে প্রকৃত লবণ চাষীদের জন্য জমি বরাদ্দে বিসিককে ভূমিকা নেওয়ার আহ্বানও জানান শিল্প সচিব।

সভায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক) কক্সবাজার লবণ শিল্প অফিসের কর্মকর্তারা বলেছেন, চলতি নভেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ মজুদ আছে। এ অবস্থায়ও ঘাটতি হবে আশঙ্কা করে আমদানির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন তারা। 

বিসিক কক্সবাজার অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, গত বছর দেশে ১৬ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে আগের বছরের অবিক্রিত লবণ ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার টন। সব মিলিয়ে এই বছরে লবণের উৎপাদন ধরা যায় প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন। দেশের লবণের চাহিদা ২২ লাখ টন।

তিনি বলেন, ‘দেশে ছোটবড় মিলিয়ে ২৭০টি মিল রয়েছে। সব মিল চালু নেই। এরপরও বন্ধ মিল মালিকদের অনেকে প্রতি বছর লবণ আমদানির অনুমতি পেয়ে যায়। তারা এই অনুমতিপত্র অন্যদের কাছে বিক্রি করে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। দেশে লবণ উৎপাদনের ভর মৌসুম আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকে লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে।

‘কতিপয় মিল মালিকের স্বার্থে আমদানির সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী’

সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান লবণ চাষি ও মিল মালিকরা।

লবণ চাষিদের আরেকজন প্রতিনিধি টেকনাফের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শফিক আহমদ বলেন, ‘দেশে উৎপাদিত লবণের বর্তমান মজুদ দিয়ে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চালানো যাবে। এর উপর চলতি বছরের উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারকে ভুল তথ্য দিয়ে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির পাঁয়তারা চলছে। মিল মালিকদের একটি সিন্ডিকেটের স্বার্থে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

লবণ চাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এ এইচ এম শহিদ উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘মাঠ ও মিল পর্যায়ে সাড়ে ৬ লাখ টন লবণ মজুদ রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে প্রতি কেজি লবণ এখন ৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবুও বিগত মৌসুমে উৎপাদিত লবণ বিক্রি করতে পারেননি চাষিরা। এ অবস্থায় লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত হচ্ছে একটি সিন্ডিকেটের স্বার্থে।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘লবণ আমদানির সঙ্গে যুক্ত কিছু লবণ মিল মালিক। তারা একজোট হয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। প্যাকেটজাত করে এরা বাজারে লবণ বিক্রি করছে ৩৫-৪০ টাকায়। মাঠে খুচরা মূল্যের সাথে বাজার মূল্যের বিরাট ফারাক। দালাল-মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেট ভারী হলেও বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা। সরকার কঠোর না হলে দেশের লবন শিল্পকে বাঁচানো যাবে না।’

মহেশখালী- কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক বলেছেন, ‘সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা ঘাটতির পক্ষে বলেছেন। আমরা আগামী জুন জুলাইয়ের আগে লবণ আমদানির অনুমতি না দিতে সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জাহিদ ইকবালের সভাপতিত্বে সংসদ সদস্য কানিজ ফাতেমা আহমদ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী, বিসিক লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের ডিজিএম জাফর ইকবাল ভূঁইয়া, লবণ উৎপাদনকারি ও মিল মালিকদের প্রতিনিধি, চেম্বার অ্যান্ড কমার্স প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।