সূচকের কথা শুনলেই আঁকাবাঁকা কোনো গ্রাফের চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কোনো কিছু সূচকে লিখে প্রকাশ করার মাধ্যমই হলো কোনো সচল লেখচিত্র। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে কোনো একটি পরিমাপক অথবা একাধিক পরিমাপকের একটি পরিবর্তনে অন্যটির পরিবর্তন তুলনা করার ক্ষেত্রেও সূচকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। বিশেষত গবেষণায় সূচকের ব্যবহার বেশি। যে কথা শত শব্দে ব্যাখ্যা করা বা বোঝানো যায় না, সূচকের মাধ্যমে তা সহজেই সম্ভব হয়। অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে সূচকের বহুল ব্যবহার রয়েছে। আজ আমরা শেয়ারবাজার সূচকের বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করব। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো মূল্য সূচক।

মূল্য সূচক কী

শেয়ারবাজারে মূল্য সূচক হলো- নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারের সার্বিক দরের প্রকাশ। সূচকের ওঠানামা দিয়ে সার্বিকভাবে ওই সূচকভুক্ত শেয়ারগুলোর দর বাড়ল, নাকি কমলো তা বোঝায়। যেমন- বাংলাদেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এ বাজারের প্রধান মূল্য সূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স, সংক্ষেপে ডিএসইএক্স। ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ৩৪৩টি হলেও ডিএসইএক্সভুক্ত শেয়ার বর্তমানে ৩১১টি। ছয় মাসের প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা শেয়ারগুলো নিয়ে এ সূচক হিসাব হয়। প্রতি ছয় মাসে সূচকটি পর্যালোচনা করা হয়। এতে সূচকে নতুন করে শেয়ার যুক্ত বা বাদ পড়তে পারে।

ডিএসইএক্স ছাড়াও ডিএসই আরও দুটি মূল্য সূচক গণনা করে। শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন ও ব্যবসা করে এমন শেয়ারগুলো নিয়ে ডিএসই শরিয়াহ সূচক বা ডিএসইএস এবং ব্লুচিপ ৩০ কোম্পানির শেয়ার নিয়ে ডিএস-৩০।

দ্বিতীয় শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) মোট ২৩টি মূল্য সূচক হিসাব করে। প্রধান পাঁচটি সূচক হলো- সিএএসপিআই (সব শেয়ারভিত্তিক), সিএসসিএক্স (বাছাই করা প্রধান সব শেয়ারভিত্তিক), সিএসই-৫০ (ব্লুচিপ ৫০ কোম্পানির শেয়ারভিত্তিক), সিএসই-৩০ (ব্লুচিপ ৩০ কোম্পানির শেয়ারভিত্তিক) এবং সিএসআই (শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানির শেয়ারভিত্তিক)।

সূচক দিয়ে কী বোঝায়

নির্দিষ্ট কোনো শেয়ারের দর ওঠানামা সংখ্যা বা গ্রাফ দিয়ে বোঝা সহজ। কিন্তু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ৩৪৩ কোম্পানির সার্বিক দর ওঠানামা বা এক কথায় আজকের শেয়ারবাজার কী অবস্থায় আছে, তা ভাষায় বোঝানো সহজ কোনো কাজ নয়। কিন্তু সামান্য লেখচিত্রের মাধ্যমে তা মুহূর্তেই বোঝানো সম্ভব। একবার চোখ রাখলেই জানা যায়, নির্দিষ্ট দিনে সার্বিকভাবে শেয়ারদর বাড়ল, নাকি কমলো।

যেমন- গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর ডিএসইএক্স সূচকের দিকে তাকালেই দেখবেন, ব্যাপক দরপতনে দিনের লেনদেন শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ অধিকাংশ শেয়ারের দর কমেছিল। কিন্তু কয়েক মিনিট পর ফের বাড়তে শুরু করে সূচক। এক পলকে বোঝা যায়, অনেক শেয়ারের দর ফের বেড়েছে। সূচক পলকেই বলে দেয় সার্বিকভাবে শেয়ারদর কেমন অবস্থায় রয়েছে।

সূচক দেখে কী লাভ

সাধারণত সহজে ও মুহূর্তে শেয়ারবাজারের গতিপ্রকৃতি বুঝে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে মূল্য সূচক ব্যবহার করা হয়। কেউ যখন শেয়ারে বিনিয়োগ করতে চান, তিনি স্বাভাবিকভাবে জানতে চান, এখন শেয়ারবাজার পরিস্থিতি কেমন চলছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তখনই শেয়ার কেনেন, যখন দেখেন সূচক বাড়ছে, অর্থাৎ সার্বিকভাবে অধিকাংশ শেয়ারের দর বাড়ছে। আবার সূচক কমতে দেখলে আরও দরপতনের ভয়ে শেয়ার বিক্রি করেন।

শুধু সূচক দেখে বিনিয়োগ করা উচিত কিনা

এটা ঠিক যে, সূচকের ওঠানামা দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির শেয়ারদর ওঠানামা বোঝার কোনো সুযোগ নেই। কারণ যে কোনো মূল্য সূচকে অনেক শেয়ার থাকে।

কোনো বিনিয়োগকারী যেহেতু একবারে সব শেয়ারে বিনিয়োগ করেন না, তাই কোনো শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে তার মৌল ভিত্তি এবং দরের ইতিহাস জানাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্য করে দেখবেন, বৃহস্পতিবার সূচক বৃদ্ধির পরও কিছু শেয়ারের দর কমেছে। আবার যেদিন সূচক কমেছিল, সেদিনও অনেক শেয়ারের দর বেড়েছিল। সূচকের ওঠানামা যেহেতু সার্বিকভাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বেশি ফেলে, তাই সার্বিক বাজার বুঝতে সূচক দেখা যেতে পারে।