বেসরকারি একটি ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকার ক্ষুদ্রঋণ নেন পুরান ঢাকার দিলসাদ বেগম। দুই লাখ ২৮ হাজার টাকা পরিশোধের পর অনিয়মিত হয়ে পড়েন। ব্যাংকের মামলায় ২০১৭ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতের মাধ্যমে এক লাখ ২৪ হাজার টাকা ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। পরে কয়েক দফায় ব্যাংকের মূল ঋণ শোধ করেন। এর পরও মামলা তুলছে না ব্যাংক। মামলা তুলতে এখন আইনি খরচ বাবদ গ্রাহকের কাছে চাওয়া হয়েছে দুই লাখ ৫৩ হাজার টাকা। এর মানে চার লাখ টাকার ঋণের আইনি খরচ চাওয়া হচ্ছে আড়াই লাখ টাকার বেশি।
দিলসাদ বেগমের মেয়ে তাসনিমা শান্তা সমকালকে বলেন, তার মা ২০১০ সালে 'নকশী' নামে এসএমই ঋণ নেন। তার মা দর্জির কাজ এবং বাবা প্লাস্টিক সামগ্রী এনে অন্যদের মাধ্যমে বিক্রি করতেন। প্রথম বছর প্রতি মাসে ১৯ হাজার টাকা করে কিস্তি পরিশোধ করেছেন। তবে বাবার পুঁজি মার যাওয়ায় সংসারে টানাটানিতে দ্বিতীয় বছর ঠিকমতো কিস্তি দিতে পারেননি। তাদের পরিবারের সব সময়ই পুরো ঋণ পরিশোধের চেষ্টা ছিল। তারা ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যখন যা পেরেছেন, শোধ করেছেন। এর পরও ব্যাংকের মামলায় ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তার মাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে এক লাখ ২৪ হাজার টাকা ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ছাড়া পান। পরে কয়েক দফায় টাকা পরিশোধ করেছেন। গত ১৪ নভেম্বর ব্যাংক জানিয়েছে, আদালতে জমা দেওয়া অর্থের মাধ্যমে তাদের ঋণ পরিশোধ হয়ে গেছে। তবে মামলা তোলার জন্য এখন দুই লাখ ৫৩ হাজার টাকা দিতে হবে। এখনই এই টাকা না দিলে আবার মামলা করার হুমকি দিচ্ছে। এ কারণে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছেন।
সব ধরনের নিয়ম মেনে ঋণ পরিশোধ করেও হয়রানিতে পড়েছেন যশোরের আহাদুল ইসলাম নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি বেসরকারি একটি ব্যাংকের যশোর শাখা থেকে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আট লাখ টাকা ঋণ নেন। ঋণ নেওয়ার পরের মাসেই শুরু হয় করোনার প্রকোপ। দোকান বন্ধ থাকলেও ধারদেনা করে নিয়মিত কিস্তি দেন। সুদসহ পুরো ঋণ শোধ করেন গত ৩০ নভেম্বর। এ পর্যন্ত ঠিকই আছে। তবে এখন বন্ধক হিসেবে দেওয়া জমির দলিল ফেরত চেয়েও পাচ্ছেন না তিনি। দলিল ফেরত না দিয়ে উল্টো নতুন করে আবার ঋণ নিতে চাপ দিচ্ছে ব্যাংক। দলিল ফেরতে সহযোগিতা চেয়ে গত ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রে অভিযোগ করেছেন তিনি।
আহাদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ঋণের শেষ কিস্তি দেওয়ার সময় এক সপ্তাহের মধ্যে দলিল ফেরত দেবে বলেছিল ব্যাংক। অথচ এখনও ফেরত না দিয়ে নানাভাবে ঘুরাচ্ছে। ব্যাংক তাকে বলছে, প্রয়োজন হলে এক কোটি টাকা দেবে। তার ব্যবসা ছোট, এত টাকা নিয়ে তিনি কী করবেন। তিনি চান চলতি মূলধন ঋণ। তবে ওই ব্যাংক মেয়াদি ঋণ ছাড়া দিতে চায় না। যে কারণে দলিল নিয়ে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চান। এতদিন দলিল আটকে রাখায় সমস্যায় পড়েছেন।
ব্যাংকের ছোট গ্রাহকদের এমন হয়রানি নিত্যদিনের। আবার ঋণ পেতেও বিভিন্ন শর্তের বেড়াজাল রয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোগ ছাড়াও ছোট আকারের ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, গাড়ি-বাড়ি বা ফ্ল্যাটের ঋণ নিয়েও হয়রানির যেন অন্ত নেই। অ্যাকাউন্ট খোলার আগেই অনেক বড় উদ্যোক্তার নামে ঋণ অনুমোদনের অনেক উদাহরণ রয়েছে। অথচ ছোট ঋণের আবেদন পর্যায়েই নানা হয়রানিতে পড়তে হচ্ছে। কোনোমতে ঋণ পাওয়ার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের হিসাবের গরমিল হয়। অনেক সময় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নোটিশ ছাড়াই সুদহার বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা বৈষম্য।
ব্যাংকগুলোর সেবা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রে প্রচুর অভিযোগ আসছে। এ বছরে প্রায় পাঁচ হাজার অভিযোগ এসেছে, যার বেশিরভাগই ছোট ঋণ গ্রহীতাদের। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হচ্ছে না।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, ছোট গ্রাহকদের প্রতি ব্যাংকের আগ্রহ খুব কম। যে কারণে ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বাড়ছে। এ অবস্থার উন্নয়ন দরকার। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। কোনো ব্যাংক নিয়ম না মানলে নতুন শাখা, পুনঃঅর্থায়নসহ বিভিন্ন সুবিধা বন্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে ছোট গ্রাহকের ঋণ প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, সাধারণভাবে গ্রাহক হয়রানির সুযোগ নেই। তবে অনেক সময় ঋণগ্রহীতারা ঝামেলায় পড়েন। সত্য বটে, বড়দের তুলনায় ছোটদের ঋণ নেওয়া কঠিন। যদিও পরিস্থিতির এখন উন্নতি হচ্ছে।
হয়রানির নানা ধরন :বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, যেসব অভিযোগ আসছে তার বেশিরভাগই ছোট গ্রাহকদের। বন্ধকী দলিল ফেরত না পাওয়া, হিসাবের চেয়ে সুদ বেশি নেওয়া, স্বীকৃতি দিয়েও ঠিকমতো বিল পরিশোধ না করা এবং কার্ড নিয়ে বিভিন্ন হয়রানির অভিযোগ আসছে বেশি হারে। ছোট গ্রাহকদের প্রতি ব্যাংকের স্বেচ্ছাচারিতার একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ২০১৪ সালে একজন প্রবাসী একটি ব্যাংকের নিলামে অংশ নিয়ে বন্ধকী ফ্ল্যাট কেনার জন্য টাকা জমা দেন। প্রথমে ১৫ শতাংশ ও পরে পুরো টাকা পরিশোধ করেন। নিয়ম মেনে টাকা দিলেও আজ অবধি তাকে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। আবার তার টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে অভিযোগ আসায় এখন সুদসহ টাকা ফেরত দিতে বলবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গ্রাহক হয়রানির আরেকটি ঘটনা তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনেন একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করে আসছিলেন। তবে গত বছর করোনা শুরুর পর হঠাৎ তার বেতন অর্ধেকে নেমে যায়। তখন পরিবার রক্ষণাবেক্ষণে হিমশিম খাচ্ছিলেন। সে কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেফারেল সুবিধার আওতায় কয়েকটি কিস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর পরও গাড়িটি বিক্রি করে ঋণ সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয় ওই প্রতিষ্ঠান। বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে গাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে বলে তাকে জানানো হয়। পরে ঋণগ্রহীতা জানতে পারেন, ওই প্রতিষ্ঠানেরই একজন কর্মকর্তা বেনামে তার গাড়ি কিনে নিয়েছেন। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় তিনি গাড়িটি ফেরত পান। এর মধ্যে বেতন আগের পর্যায়ে যাওয়ায় নিয়মিত কিস্তি দিচ্ছেন।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা পর্যায়ের দু'জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড়দের মধ্যে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির প্রবণতা ব্যাপক। তবে প্রকৃত সমস্যা ছাড়া ছোটদের ঋণ পরিশোধ না করার ঘটনা নেই বললেই চলে। এর পরও ছোট উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপের বিষয়টি নিয়ে তারাও বিব্রত। সাধারণভাবে বেশিরভাগ বড় উদ্যোক্তা টাকা ফেরত না দিয়ে ঋণসীমা বৃদ্ধি বা বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে নিয়মিত দেখায়। বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা ঋণ আদায় না করেও নিয়মিত দেখানোর সুবিধা বড়রাই পাচ্ছেন। ব্যাংকের এক টাকাও ফেরত না দিয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নিয়মিত দেখাচ্ছেন। অথচ ছোটদের ঋণ নেওয়া থেকে শুরু করে পরিশোধ পর্যন্ত নানাভাবে হয়রানিতে পড়তে হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি ব্যাংক থেকে ২০১০ সালে ৩০ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুরি হয় 'প্রাসাদ নির্মাণ' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে। এর বিপরীতে ঋণ নেয় পাঁচ কোটি টাকা এবং সুদসহ ২০১৩ সালে সমুদয় ঋণ পরিশোধ করে। পরে বন্ধকী সম্পত্তি অবমুক্তির জন্য বারবার তাগাদা দিলেও আজ অবধি বন্ধক অবমুক্ত করেনি ব্যাংক। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকে।


বিষয় : ঋণে ভোগান্তি

মন্তব্য করুন