ভরা মৌসুমেও চড়া যাচ্ছে সবজির বাজার। বগুড়ার কৃষক ২০ টাকা দরে যে কাঁচামরিচ বিক্রি করছেন, ঢাকার মানুষ তা কিনছেন ৮০ টাকায়। একইভাবে নাটোরে ১৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা শিম ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। ১৫ টাকার ফুলকপি প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকায়। উৎপাদকের হাত থেকে ভোক্তার কাছে আসতে আসতেই দাম বেড়ে যায় তিন থেকে চার গুণ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বারবার হাতবদল, অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা, পথে পথে চাঁদাবাজি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাত এবং বাজারে যথাযথ নজরদারির অভাবে বেড়েছে সবজির দাম। গ্রামের সবজি রাজধানীতে ভোক্তার ঘরে যেতে কৃষকের পর অন্তত চারটি হাত ঘোরে। কৃষকের ক্ষেতের সবজি প্রথম যায় পাইকারি ব্যবসায়ীর হাতে। এরপর যায় ঢাকার আড়তে, তারপর ছোট পাইকারি ব্যবসায়ী, এরপর খুচরা বিক্রেতা এবং সবশেষে ভোক্তার কাছে। প্রতিটি হাত বা স্তরে বাড়তি ব্যয় ও দাম যুক্ত হতে থাকে।

বগুড়ার মহাস্থানগড় ও নাটোরের হয়বতপুর পাইকারি সবজির হাট থেকে প্রতিদিন কাঁচামরিচ, শিম, ফুলকপিসহ অন্যান্য সবজি ঢাকার কারওয়ান বাজারে আসে। গত বুধবার মহাস্থানগড় হাটে গিয়ে দেখা যায়, কাঁচামরিচ মানভেদে ১৮-২০ টাকা, শিম ২০-২৫ টাকা ও ফুলকপি ২৫-৩০ টাকা কেজি (ঢাকায় পিস হিসেবে বিক্রি হয়, আকারভেদে ফুলকপি আধা কেজি থেকে এক কেজির বেশি ওজনেরও হয়ে থাকে) দরে কিনছেন পাইকাররা। এরপর তাদের ৬০ কেজি সবজি ধারণক্ষমতার একেকটি বস্তা কিনতে ২২ টাকা এবং সেলাইয়ের জন্য সুতলি কিনতে গড়ে তিন টাকা খরচ হয়। এতে কেজিপ্রতি খরচ যুক্ত হয় ৪১ পয়সা। স্থানীয় আড়তে সবজি পরিস্কার করে প্রতি বস্তায় ভরানোর জন্য শ্রমিক ৪০ টাকা (কেজিপ্রতি ৬৬ পয়সা), প্রতি বস্তা ট্রাকে তোলার জন্য শ্রমিক ৪০ টাকা (কেজিপ্রতি ৬৬ পয়সা), ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে গড়ে প্রতি কেজি সবজির ট্রাক ভাড়া তিন টাকা, ঢাকায় প্রতি বস্তা ট্রাক থেকে নামানো ও ভ্যানে আড়তে পৌঁছানো ৪০ টাকা (কেজিপ্রতি ৬৬ পয়সা), এরপর আড়তদারি বাবদ কেজিপ্রতি দিতে হয় এক টাকা। স্থানীয় পরিবহন, শ্রমিক, বস্তা-সুতলি, ঢাকায় পৌঁছানো, আড়তদারি ও চাঁদাবাজি মিলিয়ে সবজি ঢাকায় পৌঁছাতে প্রতি কেজিতে ছয়-সাত টাকা খরচ পড়ে। এরপর আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীর হাত ঘুরে তা যায় খুচরা বিক্রেতার কাছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত বুধবার সেন্টু সরকার নামের এক পাইকারি ব্যবসায়ী নাটোরের হয়বতপুর হাটে কৃষকের কাছ থেকে শিম কেনেন ১৮ টাকা কেজি দরে। রাতে কারওয়ান বাজারে আড়তদারের কাছে তিনি তা বিক্রি করেন ২৫ টাকা দরে। আড়তে অবস্থান করে দেখা যায়, ছোট পাইকারি ব্যবসায়ীরা সেই শিম কিনছেন ২৬ টাকা দরে। পরে তিনি খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে তা বিক্রি করেন ৩০ টাকা কেজিতে।

একইভাবে বুধবার মহাস্থানগড় হাটে কৃষকের কাছ থেকে ২০ টাকা দরে কাঁচামরিচ কেনেন পাইকারি ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম। তিনি ঢাকার আড়তে তা বিক্রি করেন ২৬ টাকায়। ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ী ২৭ টাকায় তা কিনে খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে ৩২ টাকায় বিক্রি করেন।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি সবজি বিক্রির স্থানের খুব কাছে ফার্মগেট এলাকার ইন্দিরা রোডের খুচরা বাজার। বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শিম ৫০ ও মরিচ ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মগবাজার এলাকার মধুবাগ কাঁচাবাজারে সেই শিম ৬০ টাকা ও মরিচ ১০০ টাকা।

ইন্দিরা রোডের সবজি বিক্রেতা শাহীন আলম সমকালকে বলেন, আড়ত থেকে ভ্যানে বা পিকআপে সবজি বিক্রির জন্য আনতে হয়। এর সঙ্গে দু-তিনজনের শ্রমের মজুরি আছে। আবার কাঁচা সবজি বিক্রি না হলে সংরক্ষণ করা যায় না, পচে যায়। সেই ক্ষতির বিষয়টিও পুষিয়ে নিতে হয়। আছে আরও 'নানা রকম' খরচ। সব মিলিয়ে আমাদের লাভ খুব বেশি থাকে না।

আরেক ব্যবসায়ী নাম না প্রকাশের শর্তে জানালেন, 'নানা রকম' খরচ বলতে মূলত চাঁদাবাজির বিষয়টিই বোঝানো হচ্ছে। নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে হলে পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিনিধিকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। সেই খরচও যুক্ত হয় সবজির দামে।

দাম বাড়ার আরও কারণ: সবজির পরিবহন খরচে যুক্ত হয় কয়েক খাতের চাঁদা। মহাস্থানগড় থেকে আসা ট্রাক বগুড়া পৌরসভার ভেতর দিয়ে যাওয়ার জন্য ৫০, শেরপুরে ৫০, সিরাজগঞ্জ ট্রাক মালিক-শ্রমিক সমিতির ৫০ ও সিরাজগঞ্জ শহরে ঢোকার জন্য ৫০ টাকা দিতে হয়। এরপর সিরাজগঞ্জ মোড়ে হাইওয়ে পুলিশকে মাসে ৫০০, যমুনা সেতু গোলচত্বর হাইওয়ে পুলিশকে মাসে ৫০০, টাঙ্গাইল মোড় হাইওয়ে পুলিশকে মাসে ৫০০, সাভারের আমিনবাজারে লাঠিয়াল বাহিনী প্রতি ট্রিপে ১০০ বা ২০০ এবং কারওয়ান বাজারে ট্রাক পার্কিং বাবদ ৫০০ টাকা দিতে হয়। প্রতি ট্রিপের সঙ্গে যমুনা সেতুর টোল যুক্ত হয় এক হাজার ৪০০ টাকা। এর সবই যুক্ত হয় পরিবহন খরচ হিসেবে।

পরিবহন খাত-সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, বগুড়ার মহাস্থানগড় হাট থেকে ঢাকায় আসা পাঁচ টনের একটি ট্রাকের তেলের দাম, পথের খরচ ও কর্মচারীদের বেতন মিলিয়ে মোট খরচ আগে ছিল প্রায় ৯ হাজার টাকা। ২০২ কিলোমিটারের এই দূরত্বে ভাড়া নেওয়া হতো ১২ হাজার টাকা, যা এখন হয়েছে ১৬ হাজার টাকা। অথচ ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে জ্বালানি খরচ বেড়েছে এক হাজার ২১২ টাকা। একটি পাঁচ টনের ট্রাক গড়ে ১০-১২ টন সবজি পরিবহন করে। সে ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় প্রতি কিলোমিটারে পরিবহন খরচ বাড়ার কথা ছয় টাকা। কিন্তু তারা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন ১৯ টাকা ৮০ পয়সা। ডিজেলের দাম বাড়ার আগে এই রুটে প্রতি কেজি সবজি পরিবহনে খরচ পড়ত গড়ে এক টাকা ৯ পয়সা। এখন তা বেড়ে এক টাকা ৪৫ পয়সা।

ঢাকায় এসে সবজির দাম বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো, কারওয়ান বাজারের আড়ত থেকে খুচরা পর্যায়ে সবজি পরিবহনেও খরচ রয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের পিকআপ কারওয়ান বাজার স্ট্যান্ডে রাখার জন্য বছরে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা দিতে হয়। প্রতি ট্রিপে শতকরা ১০ টাকা এবং মাসে ৫০০ টাকা দিতে হয় স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে। আবার পাইকারি ব্যবসায়ীদের কারওয়ান বাজারে প্রায় ৪০০ বর্গফুট জায়গার জন্য প্রতি রাতে দুই হাজার ১০০ এবং দিনে তিন হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। দিনশেষে সব খরচই গিয়ে চাপে খুচরা ক্রেতার কাঁধে।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা যা বলেন: সবজির পাইকারি ব্যবসায়ী সেন্টু সরকার সমকালকে জানান, নাটোরের হয়বতপুর ও দত্তপাড়া পাইকারি বাজার থেকে সবজি কিনে তিনি ঢাকার পাইকারি আড়তে সরবরাহ করেন। প্রতি কেজি সবজি ঢাকায় পৌঁছানোর নিয়মিত খরচের সঙ্গে যুক্ত হয় পথে পথে নেওয়া চাঁদা। সিরাজগঞ্জ মোড়, যমুনা সেতু গোলচত্বর এবং রাতে টাঙ্গাইল মোড় ও দিনে এলেঙ্গায় হাইওয়ে পুলিশ যানবাহনের আকারভেদে ১০০ বা ২০০ টাকা করে চাঁদা নেয়। না দিলে নানা রকম হয়রানির শিকার হতে হয়। কাঁচা সবজির ট্রাক বলে তা আটকে থাকলে পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ব্যবসায়ীরা যত দ্রুত সম্ভব ঝামেলা মিটিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে চান।

তিনি বলেন, গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায়ও শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদা নেওয়া হয় ১০০ টাকা। কারওয়ান বাজারে পার্কিংয়ের নামেও ২০০ টাকা নেওয়া হয়। আবার অনেক সময় সংসদ ভবনের সামনের সড়কে ট্রাক থামিয়ে পুলিশ টাকা নেয়। অর্থাৎ প্রতি ট্রাকে প্রায় এক হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। আর ট্রাক যদি যাত্রাবাড়ী আড়ত পর্যন্ত যায়, তবে সেখানে তিন জায়গায় ৭০, ৯০ ও ৩০ টাকা দিতে হয়।

বগুড়ার মহাস্থানগড় হাট থেকে সবজি এনে ঢাকার উত্তরার কামারপাড়ার স্লুইসগেট বাঁশপট্টি এলাকার আড়তে সরবরাহ করেন আশরাফুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, পথের নানা পয়েন্টে ট্রাক থামিয়ে পুলিশ চাঁদা নেয়। তবে সেই টাকা ব্যবসায়ীরা দেন না। পরিবহন ব্যবসায়ী ট্রাকের ভাড়ার মধ্যেই তা যুক্ত করে নেন। এসব চাঁদাবাজি ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ট্রাকের ভাড়াও বেড়ে গেছে, যা প্রভাব ফেলছে সবজির দামে। কিন্তু সবজির দামে সবচেয়ে বড় ফারাক হয় খুচরা পর্যায়ে। কারণ, পরিমাণে অল্প বিক্রি করেন বলে তার লাভ করতে হয় বেশি। ১০ কেজি সবজি কিনলে হয়তো তিনি পুরোটা বিক্রি করতে পারেন না। দুই কেজি পচে বা নষ্ট হয়ে গেলে সেটার দামও তিনি লাভ থেকে সমন্বয় করে নেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সমকালকে বলেন, সবজি পচনশীল হওয়ায় এটি দ্রুত বিক্রি করার তাগিদ থাকে ব্যবসায়ীদের। অনেক সময় চলতি পথেই ট্রাকে থাকা সবজি কয়েক দফায় হাতবদল হয়। আবার সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন পর্যায়ে সবজির এক-তৃতীয়াংশ নষ্ট হয়ে যায়। সেগুলোর দামও বিক্রি হওয়া সবজির সঙ্গে যুক্ত হয়। এ কারণে সবজি পরিবহনে রেফ্রিজারেশন বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা দরকার।

তিনি বলেন, পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে দামের পার্থক্য হয় সবচেয়ে বেশি। কারণ, খুচরা বিক্রেতাকে অল্প সবজি বিক্রি করেই তার জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য পাচ্ছেন না, আবার সাধারণ ক্রেতাও অনেক বেশি দামে কিনছেন। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। উৎপাদন খরচ কমলে দাম ক্রেতার নাগালের মধ্যে থাকবে।

পথে পথে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মল্লিক ফখরুল ইসলামকে মোবাইল ফোনে কল করে ও এসএমএস পাঠিয়ে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিন দিনেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি আতিকা ইসলাম এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি।