ব্যবসা-বাণিজ্যে দুর্নীতিকেই প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া অদক্ষ প্রশাসন ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাও ব্যবসার অন্যতম বাধা। এসব সমস্যা বড় ব্যবসায়ীদের তুলনায় মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বেশি। পাশাপাশি যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হচ্ছে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে না, বরং বৈষম্যমূলকভাবে হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পরিচালিত বাংলাদেশ ব্যবসায় পরিবেশ-২০২১ :উদ্যোক্তা জরিপে এমন ফলাফল উঠে এসেছে। অংশ নেওয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৬৮ শতাংশ দুর্নীতিকে ব্যবসার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছে। ৬৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, প্রশাসনের অদক্ষতার কারণে ব্যবসা সমস্যায় পড়ছে এবং আর ৫৫ শতাংশ জানিয়েছে, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা তাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা। সিপিডির রাজধানীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগের জরিপগুলোতে দেখা গেছে, ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দুর্নীতি ওপরের দিকেই থাকত। এখন প্রশাসনের অদক্ষতা ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা দুর্নীতির কাছাকাছি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই তিনটি বিষয়ের সঙ্গে ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি জড়িত। ফলে বলা যায়, ত্রয়ী চ্যালেঞ্জে পড়েছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, 'দুর্নীতির কারণে বড় ব্যবসায়ীরা যত বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন, তার চেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। জরিপে অংশ নেওয়া বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ৫২ শতাংশ জানিয়েছে, দুর্নীতি তাদের কাছে প্রধান প্রতিবন্ধকতা। আর ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ১০০ ভাগই জানিয়েছে, দুর্নীতি তাদের জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা। অর্থাৎ এ থেকে বোঝা যায়, দেশে নীতিসুবিধা বাস্তবায়নে বৈষম্য রয়েছে। ফলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় টিকে থাকার চ্যালেঞ্জও বেশি। তিনি বলেন, মানবাধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে ব্যবসায় দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হবে।

জরিপ অনুযায়ী ৪৫ শতাংশ ব্যবসায়ী অবকাঠামো দুর্বলতাকে ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক সময় অবকাঠামো দুর্বলতা এক নম্বর সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করতেন ব্যবসায়ীরা। এখন এটি নেমে চার নম্বরে এসেছে। এর অর্থ, দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, 'করোনা-পরবর্তী পুনরুদ্ধার হচ্ছে। তবে যে পুনরুদ্ধার দেখা যাচ্ছে তা আংশিক। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা বলেছেন, পুরোপুরি পুনরুদ্ধারে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে। পুনরুদ্ধার সহজ ও টেকসই করার জন্য ব্যবসায়ীরা দুর্নীতি বন্ধ, কর হার কমানো, প্রণোদনা দেওয়া, অর্থায়নের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি করোনার টিকা দেওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, করোনার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১০ বছরে দেশে নতুন কী কী ব্যবসা উঠে আসবে তারও একটি ধারণা পাওয়া গেছে জরিপে। দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বলেছে, ডিজিটাল আর্থিকসেবা আরও বিকশিত হবে। দক্ষ মানবসম্পদ খাতকে দ্বিতীয় অবস্থানে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। তৃতীয় অবস্থানে আছে ডাটা ব্যবস্থাপনা। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং, ইলেকট্রিক গাড়িসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসার সম্ভাবনা দেখছেন তারা। তবে আগামী দুই বছর বিশ্ব অর্থনীতি কেমন যাবে তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। কারণ বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে গেলে বা ঋণ সংকট দেখা দিলে দেশের ব্যবসাও সংকুচিত হবে। এ ছাড়া পরিবেশগত, সামাজিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এজন্য তিনি পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, আঞ্চলিক নদী ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে না পারা নীরব চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল সেবা যাতে শহরকেন্দ্রিক না হয়, প্রযুক্তিগত সুশাসন নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন।

দেশের কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ৭৩টি প্রতিষ্ঠানের মতামতের ভিত্তিতে এ জরিপ করা হয়েছে। মূলত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল কমপিটিটিভ রিপোর্টের বা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদনের জন্য এ জরিপ করা হয়ে থাকে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এ বছর তাদের প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা বা কোনো র্যাঙ্কিং ছাড়াই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে সিপিডি। ২০২১ সালে এপ্রিল থেকে জুলাই সময়ে জরিপ করা হয়। এতে প্রধানত অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা, আর্থিক বিনিয়োগ, মানবসম্পদ, কাজের পরিবেশ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও ঝুঁকি বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। ৩৯টি বড়, ১৭টি মাঝারি, ১২টি ছোট এবং ৫টি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ফরিদপুর এলাকায় অবস্থিত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১০টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে জরিপ পরিচালনা করা হয়।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জরিপে ইতিবাচক বেশকিছু বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে খুব কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যায়নি। কর প্রদান ও সরকারি চুক্তি করার কাজে দুর্নীতি আগের তুলনায় কমেছে। তবে আমদানি ও রপ্তানি পর্যায়ে দুর্নীতি এখন চ্যালেঞ্জ। ৫০ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরকারের দীর্ঘ মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে দেশের জন্য কল্যাণকর বলে উল্লেখ করেছেন। জরিপে দেখা গেছে, ২৮ শতাংশ ব্যবসায়ী বলেছেন, করোনার প্রভাবে তাদের খরচ কমাতে হচ্ছে। আর খরচ কমাতে গিয়ে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এই কর্মী ছাঁটাই বন্ধে উদ্যোগ দরকার।